খবর

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার অনিশ্চয়তার অন্ধকারে

সিন্ডিকেটের কালো থাবা

## সক্রিয় বেস্টিনেট, নেপথ্যে একাধিক প্রভাবশালী

## শ্রমবাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা

## ফুঁসে উঠছে বৈধ ১২শ এজেন্সি

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘ প্রতিার পর অবশেষে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার যখন প্রায় খোলার পথে, তখন ফের তা অনিশ্চয়তার অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে সিন্ডিকেটের ভয়াবহ দৌরাত্ম্য। এ সিন্ডিকেটের হোতা বলা হয়ে থাকে বেস্টিনেটকে। ঢাকা ও কুয়ালালামপুরে দেদার চলছে প্রতিষ্ঠানটির অপতৎপরতা। এ হীনকর্মে নেপথ্য থেকে মদদ দিচ্ছেন বাংলাদেশেরই বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যারা জনশক্তি সেক্টরে কোনভাবেই জড়িত নয়। জনশক্তি রপ্তানিকারী এজেন্সির মালিকরা বরাবরই এ অভিযোগ করে আসছেন। তারা বলছেন, বিপুল পরিমান রেমিটেন্সের সম্ভাবনাময় এ শ্রমবাজার বন্ধও হয়ে গিয়েছিল এ সিন্ডিকেটের অপতৎপরতার কারণেই।

গুটিকয়েক এজেন্সি মিলে করা এ সিন্ডিকেট এ খাতে খুবই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এমন সিন্ডিকেট গঠন প্রবাসী শ্রমিকের স্বার্থ ও দেশের সুনাম ক্ষুন্ন করবে। বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিসহ পুরো খাতকেই খাদে ফেলবে আশংকায় উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সিন্ডিকেট হলে ফের অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি নানা ধরনের অনিয়ম হবে। শুধু তাই নয়, অর্থপাচারেরও আশঙ্কা রয়েছে। এেেত্র বাংলাদেশের উচিত নেপালকে অনুসরন করা।

নেপালে প্রায় ১৬শ রিক্রুটিং এজেন্সি সম্মিলিতভাবে মালয়েশিয়ায় দেশটির কর্মী পাঠানোর েেত্র একটি মডেল হিসেব নজির স্থাপন করেছে স্বচ্ছতা ও স্বল্প-ব্যয়ের। বাংলাদেশের লাইসেন্স নবায়নকৃত ১২শ এজেন্সিও সম্মিলিতভাবে এগিয়ে এলে শ্রমিক তথা পুরো দেশই লাভবান হবে। লাইসেন্স সংখ্যা যত বেশি হবে শ্রমিক তত বেশি প্রেরন করা যাবে এবং খরচ তত কম হবে, কিন্তু লাইসেন্স সংখ্যা যত কম হবে শ্রমিক তত কম প্রেরন হবে উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ে। আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর বিপরীতে গুটিকয়েক এজেন্সি এ দায়িত্ব পেলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বরং কুগিত হয়ে পড়বে; বাড়বে প্রবাসীকর্মীদের অর্থব্যয় ও লাঞ্ছনা-বঞ্চনা। কাজেই কতিপয় এজেন্সির হাতে শ্রমবাজার তুলে দিয়ে স্রেফ তাদের স্বার্থ রা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।

এদিকে বৈধ সব রিক্রুটিং এজেন্সি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলছে, সিন্ডিকেটের হাতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার তুলে দেওয়া হলে তারা আন্দোলনের জন্য রাজপথে নামবে, স্থগিত করতে হাইকোর্টে যাবে এবং এমনকি আইনী লড়াই চালিয়ে যাবে এতে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। যাতে ব্যাপকভাবে তিগ্রস্থ হবে দেশের অর্থনীতি, কমে যাবে রেমিটেন্স প্রবাহ। উল্লেখ্য মালয়েশিয়া অভিবাসন সেক্টরে কোন প্রকার সিন্ডিকেট করা যাবেনা এই মর্মে আপিল বিভাগ রায়ও প্রদান করেছে। কেস নম্বর- ঈরারষ চবঃরঃরড়হ ঋড়ৎ খবধাব ঞড় অঢ়ঢ়বধষ ঘড়. ৮৮২ ২০১৭ ।

নেপালের নজির তুলে ধরে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো আরও বলছে, বিশ্বব্যাপী যখন প্রতিযোগিতামূলক খোলাবাজার নীতির জয়জয়কার, তখন সীমিত সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির হাতে শ্রমবাজার তুলে দেওয়া হবে মারাত্মক আত্মঘাতী; অশান্ত হয়ে উঠবে শ্রমবাজার।

সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যেই এক সময় বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার। সে সময় কর্মী প্রেরণে বেস্টিনেট যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল, তাতে করে কর্মীদের কাছ থেকে ধাপে ধাপে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি হয়। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে একপর্যায়ে মালয়েশিয়ার সরকার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আমদানি বন্ধ করে দেয়। সম্ভাবনাময় এ শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ সরকার সচেষ্ট হয় ফের তা চালু করার। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি দুদেশের মন্ত্রী পর্যায়ে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একদিনের সেই বৈঠক দুদিনে গড়ায়।

কিন্তু এর পরও কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই তা শেষ হয়। কারণ কুয়ালালামপুরের প থেকে ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সি ও বিতর্কিত বেস্টিনেট কোম্পানির মালিকানাধীন এফডব্লিউসিএমএস প্রযুক্তির মাধ্যমে কর্মী নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রমিক ও খাত-সংশ্লিষ্টদের কথা তথা দেশের কথা বিবেচনায় রেখে ঢাকা এর বিরোধিতা করে সব বৈধ এজেন্সিকে সমান সুযোগ দেওয়ার দাবি জানায়। এ নিয়ে মতানৈক্যের কারণে শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় বৈঠক। ঢাকার এ ভূমিকাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সিগুলোর মালিকরা। বিশেষ করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ও একই মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারা বলছেন, ২০১৭-২০১৮ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এটাই প্রমানিত যে, সিন্ডিকেটের কারণে অভিবাসন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়, নানা ধরনের অনিয়মের পথ তৈরি হয়, শ্রমিকরা নানা হয়রানির শিকার হয় এবং হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমান অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যায়।

তৎপর সেই হোতারা- মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার খোলার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ার পর থেকে তৎপর হয়ে উঠেছে সেই পুরনো হোতা আমিন-স্বপন সিন্ডিকেট। সরকারের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির এতে মদদ রয়েছে বলে তারা নিজেরাই বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ফায়দা নেয়ার অপচেষ্টা করছে। তাদের নানা অপতৎপরতা, অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রে সরকারের ভাবমুর্তি ও সুনাম দেশের অভ্যন্তরে ও অন্তর্জাতিকভাবে ুন্ন হচ্ছে।

সরকারের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে আমিন-স্বপন চক্রটি সিন্ডিকেটের ২৫টি লাইসেন্সের এর নাম অন্তর্ভুক্তির নামে ইতোমধ্যেই লাইসেন্স প্রতি ২ থেকে ৫ কোটি টাকা করে বিপুল পরিমান অর্থের লেনদেন ও মানি লন্ডারিং করেছে বলে একাধিক মাধ্যম থেকে শোনা যাচ্ছে। যা দ্রুত সরকারের গভীর নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।

আমিন-স্বপন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মী পাঠাতে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) থেকে বেস্টিনেট (বাংলাদেশ) লিমিটেড নামে অনুমোদন নিয়েছে, যেখানে কোম্পানি চেয়ারম্যান হিসেবে আমিনুল ইসলাম বিন আবদুল নূর (দাতো শ্রী আমিন) ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে মো. রুহুল আমিন স্বপনের নাম রয়েছে। আমিনুলের নামে ১০ হাজার ও রুহুল আমিনের নামে ২ হাজার শেয়ার রয়েছে। আশঙ্কার বিষয়, এফডব্লিউসিএমএস-কে ব্যবহার করে বাংলাদেশের জনশক্তি বাজার মুষ্টিবদ্ধ করার অপতৎপরতায় লিপ্ত আমিন-স্বপন সিন্ডিকেট।

নেপাল সরকার বেস্টিনেটের বিরুদ্ধে ১৮৫ মিলিয়ন রিঙ্গিত দুর্নীতির অভিযোগ এনে দেশটিতে এর সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এ বেস্টিনেট কোম্পানির এফডব্লিউসিএমএস জালে মালয়েশিয়ায় নেপাল ও বাংলাদেশের শ্রমিক রপ্তানিতে মেডিক্যাল ও সিকিউরিটি কিয়ারেন্সের আড়ালে লুটে নেয় হাজার কোটি টাকা। এফডব্লিউসিএমএস -এর মাধ্যমে কলিং ভিসার আবেদন করার প্রক্রিয়ার তদন্তে উঠে আসে বিস্ময়কর সব তথ্য। কর্মীর মেডিক্যাল ও আইএসসি বাবদ ৩০৫ রিঙ্গিত নিয়োগকর্তা সিনারফাক্স অ্যাকাউন্টে জমা করলেও তথ্য গোপন করে আবার বায়োমেডিক্যাল ও আইএসসি ফিঙ্গার প্রিন্টের নামে জোরপূর্বক হাতিয়ে নিত আরও অতিরিক্ত অর্থ। বিগত দেড় বছরে ১০ লাখ মালয়েশিয়ায় অভিবাসনপ্রত্যাশীর কাছ থেকে শুধু এ খাতেই হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

এই ‘বেস্টিনেট’ দাতো শ্রী আমিন এবং রুহুল আমিন স্বপনের যৌথ মালিকানাধীন একটি আইটি প্রতিষ্ঠান, যা মূলত বিভিন্ন ধরনের মনোপলি ব্যবসার ডিজিটাল দুর্নীতির নকশার বাস্তব রূপ দেয়। বেস্টিনেটের এ ডিজিটাল দুর্নীতির সর্বশেষ শিকার নেপাল ও বাংলাদেশ। ওয়েব বেজড অপারেটিং সিস্টেম এফডব্লিউসিএমএস -এর জালে নির্দিষ্ট কিছু রিক্রুটিং এজেন্টকে নামমাত্র উপস্থাপন করে সিস্টেম ফি নামে মোটা অঙ্কের অর্থ বাগিয়ে নেয়, যার ফলে অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। সাধারণভাবে মনোপলি এ সিস্টেমের সব দায়িত্ব ও দোষ রিক্রুটিং এজেন্টের কাঁধে চাপলেও সিংহভাগ অর্থ চলে যায়। এমনকি প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করার নামে শ্রমিক প্রতি ১৫হাজার টাকা হারে জোরপূর্বক আদায় করা হত। বিপুল পরিমান এই অর্থের পুরোটাই আমিন-স্বপন ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয় করে। নেপাল ও মালদ্বীপ সরকার একটু দেরিতে হলেও বুঝতে পেরে দ্রুত বেস্টিনেটকে কালো তালিকাভুক্ত করে দেয়।

এদিকে বাংলাদেশের অন্যতম এ শ্রমবাজার সিন্ডিকেটমুক্ত করতে জিটুজি প্লাসের সিস্টেম বাতিল করে মাহাথির সরকার। ব্যাপক দুর্নীতি আর অনিয়মে অভিযোগে গত ২০১৮সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে মালয়েশিয়ান কোম্পানি বেস্টিনেট ও সিনারফাক্সের সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। দাতো শ্রী আমিন এ দুটি কোম্পানির মালিক। ডিজিটাল দুর্নীতির কারণে ৩ দেশে (নেপাল, মালদ্বীপ ও মালয়েশিয়া) কালো তালিকাভুক্ত হয় বেস্টিনেট। এবার একই পদ্ধতি কাজে লাগাতে অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে দাতো শ্রী আমিন-স্বপন চক্র।

এবিষয়ে জানতে চাইলে জনশক্তি রপ্তানিকারক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো-কম খরচে নিরাপদ অভিবাসন। সুতরাং লাইসেন্সের সংখ্যা কমিয়ে সেটা করা সম্ভব না। যা গত ২০১৬ থেকে ১৮ তে যে পদ্ধতি ছিলো যেখানে সিমীত সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে করা হয়েছিলো, তাদের একটা কমিটমেন্ট ছিলো তারা মাত্র ৩৫ হাজার টাকায় কর্মী পাঠাবে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা গেছে, সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয়ে কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছে। তাহলে এটা প্রমাণীত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা সীমিত করলে অভিবাসন ব্যয় কমানো সম্ভব নয়।

বেসরকারি সংস্থা ব্রাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুর হাসান বলেন, সিন্ডিকেট করা কোনওভাবেই ঠিক হবে না। বৈধক সকল রিক্রিুটিং এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়া উচিৎ। ২৫ থেকে ৩০ টি এজেন্সিকে সুবিধা দেওয়া কোনভাবেই যৌক্তিক হবে না। এতে অভিবাসন ব্যয় কম হওয়ার সুযোগ থাকবে না। বরং অনিয়মের আশঙ্কাই থেকে যাবে পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়।

এদিকে অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা রেফিউজি অ্যান্ড মিগ্র্যাটরি মোভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) পরিচালক মেরিনা সুলতানা বলেন, বৈধ লাইন্সেধারী সব রিক্রুটিং এজেন্সির অধিকার রয়েছে কর্মী পাঠানোর। কিন্তু গুটি কয়েকটি এজেন্সিকে সুবিধা দেওয়া আর অন্যদের বঞ্চিত করা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য না।

তিনি বলেন, কয়েকটি এজেন্সিকে অনুমোদন দিলে ওই সব এজেন্সিগুলো একারা কাজ করবে না, তারা অন্যদের দিয়েই কাজ করাবে এক্ষেত্রে জবাবদিহীতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন আসবে। কোনভাবেই প্রক্রিয়াটা স্বচ্ছ হবে না। কর্মী পাঠানোর পরে কোন ধরণের সমস্যা হলে কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..