মত-বিশ্লেষণ

মাহে রমজান

সিয়ামের ফারসি প্রতিশব্দ হলো রোজা। এ মাসে মুসলমানরা রোজা রাখার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ব্রতী হয়।
রোজার বিধানের উদ্দেশ্য: রোজা ফরজ করার উদ্দেশ্য বলতে গিয়ে আল্লাহ সুরা বাকারার ১৮৩নং আয়াতের শেষে বলেন, ‘লা’আল্লাকুম তাত্তাকুন,’ যার অর্থ যেন তোমরা আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে পার।
অর্থাৎ এ মাসে রোজা রেখে যেন মুসলমানরা সব ধরনের পাপাচার, মিথ্যাচারিতা, প্রভৃতি থেকে বিরত থেকে আল্লাহভীতি অর্জন করতে পারে।
রোজার ফজিলত: কোরআন ও হাদিসে রোজার অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানি চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে পরকালে প্রতিদান পাওয়ার আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার অতীত জীবনের সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি শরিফ: ১ম খণ্ড, ২৫৫ পৃ., মুসলিম শরিফ)
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ‘আল্লাহ তা’আলা বলেন, রোজা আমার জন্য, আমি নিজেই তার প্রতিদান দেব।’ (হাদিসে কুদসি, বুখারি শরিফ, ১ম খণ্ড, ২৫৪ পৃ.)।
এছাড়া এ মাসের যে কোনো ইবাদতের ফজিলত অন্য যে কোনো মাস অপেক্ষা অনেক বেশি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এ মাসে যে ব্যক্তি নফল নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করবে, সে ওই ব্যক্তির মতো হবে যে রমজান ছাড়া অন্য সময় একটি ফরজ আদায় করল। আর যে ব্যক্তি এই মাসে একটি ফরজ আদায় করবে, সে যেন অন্য মাসের ৭০টি ফরজ আদায় করল। (মিশকাত শরিফ: ১৭৩ পৃ.)।
সুতরাং প্রত্যেক মু’মিন মুসলমানের উচিত এই মাসে দান, সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজসহ বেশি বেশি ইবাদত করা। বিশেষত এই চারটি কাজ বেশি করাÑ১. বেশি বেশি কালিমা পড়া, ২. ইস্তেগফার বেশি বেশি করে পাঠ করা, ৩. জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য দোয়া করা, এবং ৪. জান্নাতে প্রবেশের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা।
রোজা শরিয়তভুক্ত হওয়ার হিকমত: ১. আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়ন ও শরিয়তের বিধানাবলি অনুসরণ করে তাকওয়া অর্জন করা। ২. সবর ও ধৈর্যের অভ্যাস গড়ে তোলা ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে শানিত করা। ৩. দরিদ্র ও নিঃস্বদের প্রতি দয়া ও মমতা প্রদর্শনের প্রতি মানুষকে অভ্যস্ত করে তোলা।
এছাড়া চিকিৎসকদের অভিমত অনুযায়ী বছরের একটি মাস রোজা পালন করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
রোজা শুধু আল্লাহর জন্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজের সঙ্গে রোজার সম্পর্ক ঘোষণা করেছেন। এমনিভাবে তিনি সব ইবাদত-বন্দেগি থেকে রোজাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছেন।
যেমন এক হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য। কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম তা শুধু আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান দেব।’ (মুসলিম: ২৭৬০)
এ হাদিস দ্বারা আমরা অনুধাবন করতে পারি, নেক আমলের মাঝে রোজা রাখার গুরুত্ব আল্লাহর কাছে কত বেশি।
তাই সাহাবি আবু হুরাইরা (রা.) যখন বলেছিলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে অতি উত্তম কোনো নেক আমলের নির্দেশ দিন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমি রোজা রাখো। কারণ এর সমমর্যাদার আর কোনো আমল নেই।’ (নাসায়ি: ২৫৩৪)
রোজার এত মর্যাদার কারণ কী, তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ভালো জানেন। তবে আমরা যা দেখি তা হলো, রোজা এমন একটি আমল, যাতে লোকদেখানো ভাব থাকে না। এটি বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার একটি অতি গোপন বিষয়। নামাজ, হজ, জাকাতসহ অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগিকে সম্পাদন করলে তা দেখা যায়, পরিত্যাগ করলেও বোঝা যায়। কিন্তু রোজার ক্ষেত্রে লোকদেখানো বা শোনানোর সুযোগ থাকে না। ফলে রোজার মধ্যে ইখলাস, আন্তরিকতা বা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা নির্ভেজাল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
রোজাদার বিনা হিসাবে প্রতিদান লাভ করে থাকেন। কিন্তু অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগি ও সৎকর্মের প্রতিদান বিনা হিসাবে দেওয়া হয় না। বরং প্রতিটি নেক আমলের পরিবর্তে আমলকারীকে ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত প্রতিদান দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানবসন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, কিন্তু রোজার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা, রোজা শুধু আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান দেব।’ (মুসলিম: ১৫৫১)

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..