মত-বিশ্লেষণ

মায়ের দুধ পানে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ

 

কাঞ্চন দত্ত: সদ্য প্রথম সন্তানের মা হয়েছেন রাইমা। রাইমার সন্তান হয়েছে মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। এখানে তিনি নিয়মিত চেকআপ করিয়েছেন, ডাক্তার দেখিয়েছেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার ও নার্সদের কাছে নবজাত শিশুর লালনপালনের বিষয়ে অনেক কিছুই জেনেছেন। রাইমা আরও জেনেছেন শিশুকে শালদুধ খাওয়ানো কতটা জরুরি। এখানে প্রসূতি মায়েদের বুকের দুধ খাওয়াতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর নিয়মকানুন এবং ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি শিশুকে কৌটার দুধ বা গুঁড়োদুধের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বলা হয়।
শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি লক্ষণীয়। ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার ৬৪ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। সবার সচেতনতায় এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসের পর এটি একটি নতুন সাফল্য। মাতৃমৃত্যু হার প্রতি লাখে ১৪৩-এ নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ব্রেস্ট ফিডিং ট্রেন্ডস ইনিশিয়েটিভ (ডব্লিউবিএফটিআই) ও বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের তথ্যে দেখা যায়, শিশুর জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ খাওয়ালে মৃত্যুঝুঁকি ৩১ শতাংশ হ্রাস করা যায়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর ১ থেকে ৭ আগস্ট ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’ পালিত হয়ে থাকে। জনগণের মধ্যে মাতৃদুগ্ধপানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৭০টি দেশে ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’ পালন করা হয়। এ বছর ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০১৯’-এর প্রতিপাদ্য বিষয় ‘এমপাওয়ার প্যারেন্টস, এন্যাবল বেস্ট ফিডিং: নাউ অ্যান্ড ফর দ্য ফিউচার’।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে (এসডিজি) প্রাধান্য দিয়ে এ বছর পালিত হচ্ছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। এ বারের বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য বিষয়টি মূলত শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো কার্যক্রমকে টেকসই করার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা, যা বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জন করবে বলে লক্ষ্য স্থির করেছে, সেগুলোকে নির্দেশ করছে। ১৯৮১ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ইন্টারন্যাশনাল কোড অব ব্রেস্ট সাবস্টিটিউট অনুমোদিত হয়। এর পর থেকে মায়ের দুধের গুরুত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে বিকল্প খাদ্যের প্রচার বন্ধে সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়। বাংলাদেশে ১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছর ১ আগস্ট থেকে ৭ আগস্ট ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’ পালিত হয়ে আসছে।
প্রতিটি মায়ের জন্য সন্তান জন্মদান একটি বিশেষ মুহূর্ত। মায়ের জন্য সবচেয়ে মানসিক প্রশান্তির মুহূর্তটিও হলো যখন তিনি সন্তানকে বুকের দুধ পান করান। এর মধ্য দিয়ে মা ও শিশুর মধ্যে একটি শক্তিশালী বন্ধন তৈরি হয়। যদিও এখনও কিছু মা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে অনাগ্রহ দেখান। জন্মের পর থেকে শিশুকে ফিডার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন। এটা শিশুর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
সন্তানের সুস্বাস্থ্যের জন্য মাতৃদুগ্ধ কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, এ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। জšে§র পর থেকে যেসব শিশু বিকল্প দুধ পান করেছে, মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুর তুলনায় তাদের ডায়রিয়ার আক্রান্তের হার ২৫ গুণ বেশি এবং শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশনে মৃত্যুর আশঙ্কা চারগুণ বেশি। অন্য এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৪৩ শতাংশ নবজাতক জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ পান করে। অথচ বছরে জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার নবজাতক বিভিন্ন জটিলতায় মারা যায়। এ ছাড়া প্রতিবছর জন্মের প্রথম চার সপ্তাহের মধ্যে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার নবজাতক মারা যায়। পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, জন্মের পর শিশুর জন্য মায়ের দুধ কতটা জরুরি।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, সন্তানকে মায়ের দুধ না খাওয়ানোর কারণে শিশুর স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন জটিলতায় প্রতিবছর বিশ্বে দুই লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশে এই ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা উন্নয়নশীল দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতে (জিডিপি) বড় ধরনের নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি যেসব শিশু মায়ের দুধ খাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি সাধারণ শিশুর চেয়ে ১৪ শতাংশ বেশি। এসব শিশু ডায়রিয়া, আমাশয়, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভোগে। একটি স্বনির্ভর জাতি গঠনে ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
সন্তান জš§দানের পর প্রথম হলুদ ঘন যে দুধ আসে, এটাই শালদুধ। পরিমাণে এটি অত্যন্ত কম হলেও নবজাতকের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। শালদুধে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধক সব ধরনের উপাদান রয়েছে। শালদুধ পানে শিশুর অপরিণত অন্ত্র পরিপক্ব হয়, শিশুর জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। তাই শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোয় অবহেলা করা যাবে না। পরিবারের সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। চাকরিজীবী থেকে শুরু করে গৃহিণী প্রত্যেক মাকে তাদের সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে আগ্রহী ও সচেতন করে তুলতে হবে।
মাতৃদুগ্ধ শিশুর জন্য একটি সম্পূর্ণ খাবার। এতে শিশুর দেহের উপযোগী উপাদানগুলো যে পরিমাণে থাকে, তাতে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত অন্য কোনো খাবার এমনকি পানিরও প্রয়োজন হয় না। মায়ের দুধের সব উপাদান শিশুর দেহে সহজে হজম ও শোষিত হয়। এটি শিশুর মস্তিষ্কের গঠন ও বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। মায়ের বুকের দুধ পানকারী শিশুদের জš§-পরবর্তী নানা ধরনের ইনফেকশন হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে; শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। মায়ের দুধে ভিটামিন ‘এ’ থাকায় শিশু অন্ধত্বের শিকার হয় না। এটি শিশুর শরীরে ক্যালসিয়ামের শোষণ বাড়িয়ে দিয়ে হাড়ের গঠন মজবুত করে। বুকের দুধ খাওয়ার ফলে শিশুর মুখমণ্ডলের হাড় ও মাংসপেশি সুগঠিত হয়। মায়ের দুধে রয়েছে বিশেষ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা শিশুর বুদ্ধিদীপ্ততা ও চোখের জ্যোতি বাড়ায়। মায়ের দুধ শৈশবে লিউকোমিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং ডায়াবেটিস টাইপ-১ এবং উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কাও কম থাকে। মায়ের দুধে প্রায় ১০০ ধরনের উপাদান রয়েছে, যার প্রতিটি উপাদানই শিশুর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো মায়ের জন্যও বিশেষ উপকারী। সন্তান প্রসবের পরপরই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হলে গর্ভফুল তাড়াতাড়ি পড়ে; এতে মায়ের জরায়ু খুব তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং প্রসব-পরবর্তী ব্লিডিং কম হয়, ফলে মায়ের রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় না। শিশুকে বুকের দুধ পান করালে স্তন ক্যানসার ও জরায়ু ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস পায়। ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হলে শতকরা ৯৮ ভাগ ক্ষেত্রে তা জš§নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়। বুকের দুধ খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে মা ও শিশুর মধ্যে একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, শিশু অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করে।
মায়ের দুধের বিকল্প কোনো দুধের অসুবিধা হলো বিকল্প দুধ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের বোতলে খাওয়ানো হয়, প্লাস্টিক স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর। বোতলের নিপল ও দুধ তৈরিতে ব্যবহার করা পানির সঙ্গে রোগজীবাণু থাকার আশঙ্কা থাকে, ফলে শিশু ঘন ঘন অসুখে পড়ে। বেশিরভাগ সময়ই তাড়াহুড়োর কারণে বোতল ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয় না, শিশু অসুখে আক্রান্ত হয়। টিনজাত দুধ বা গরুর দুধ পান করলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়, ফলে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিকল্প দুধে লৌহজাতীয় পদার্থ (আয়রন) কম থাকায় শিশু রক্তস্বল্পতায় ভোগে। বুকের দুধ অপেক্ষা বিকল্প দুধের পুষ্টি উপাদানগুলো শিশুর শরীরে সহজে শোষিত হয় না। পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির ফলে শিশু অপুষ্টির শিকার হয়। গরুর দুধ সহজে হজম না হওয়ায় শিশু কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগে। বিকল্প দুধের বড় অসুবিধা হলো এটি ব্যয়বহুল হওয়ায় সঠিক নিয়মে খাওয়াতে হলে মাসে প্রচুর টাকা খরচ হয়। এতে অনেক মা-ই নির্দেশিত নিয়ম অনুযায়ী শিশুকে খাওয়ায় না। ফলে শিশুর পুষ্টির ঘাটতি থেকে যায়। ব্রেস্ট ফিডিংয়ের ক্ষেত্রে সন্তানের সঙ্গে মায়ের যে বন্ধন তৈরি হয়, বিকল্প দুধ খাওয়ালে সে বন্ধন তৈরি হয় না।
বর্তমান সরকার মাতৃ ও শিশুপুষ্টি উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে গত ১০ বছরে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বেতনসহ ছয় মাসে উন্নীতকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অফিসে ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল থেকে কর্মজীবী মায়েদের ভাতা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রতি জেলায় একজন করে পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। পরে প্রতিটি হাসপাতালে একজন করে পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেওয়া হবে। এরই মধ্যে ৫৯৪টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে শিশুবান্ধব হাসপাতাল করার জন্য প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে।
মাতৃদুগ্ধ শুধু পুষ্টির উৎস নয়। এটি শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনই মায়ের শরীরের পক্ষেও সমান উপকারী। শিশুর সুস্বাস্থ্য ও রোগমুক্ত জীবনের জন্য মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই। প্রতিটি মায়ের জন্য তাই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো অত্যন্ত জরুরি।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..