প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মিথ্যা ভয় বা অলীক আশাবাদ কোনোটাই নয়

গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ধারাবাহিক স্থিতিশীলতা’ শিরোনামের খবরটি বাধাহীন উচ্ছ্বাসের প্রস্তুতিসংকেত নয়; বরং সতর্ক আশাবাদ বলা যেতে পারে। ওই প্রতিবেদনে যে তথ্য-উপাত্ত ও ঘটনাবলি উপস্থাপিত হয়েছে, সার্বিকভাবে ইতিবাচক হলেও সেগুলো নিরঙ্কুশ আনন্দবার্তা নয়। এ আশা ও হতাশা ঘিরে পাঠকদের বিভ্রান্তির সুযোগ নেই অবশ্য। কেননা ওই খবরে যা প্রকাশ হয়েছে, তা আমাদের শেয়ারবাজারের চলমান চিত্রের বাস্তব প্রতিফলনই কেবল। খেয়াল করা দরকার, গত এক মাসের মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক বেড়েছে ৩৪২ পয়েন্ট। উল্লেখ্য, মাসখানেক আগে এর অবস্থান ছিল ছয় হাজার পয়েন্টের সীমায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, ডিএসই সূচক ছয় হাজার ছাড়িয়েছে এর মধ্যে। সূচকটি বর্তমানে সাড়ে ছয় হাজারমুখী। প্রকৃতপক্ষে গত কয়েক মাসে স্থানীয় পুঁজিবাজারের চিত্র কেমন ছিল এবং তা নিয়ে কেন বিনিয়োগকারীদের অতি আশাবাদ ও কেনই-বা বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণী, তা উপলব্ধির জন্য আলোচ্য মাসের পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। আমাদের প্রতিবেদক বলছেন, গত এক মাসে মাত্র চার কার্যদিবসে সামান্য পতন ঘটে সূচকের; বাকি দিনগুলোয় টানা ঊর্ধ্বমুখী ছিল সেটি। এ অবস্থায় ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কিংবা অধ্যাপক আবু আহমেদের মতো বিশেষজ্ঞরা যে শঙ্কা প্রকাশ না করেও সতর্ক হতে বলবেন, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে!

তাহলে বর্তমান পরিস্থিতির বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ কেমন হতে পারে এবং সেখান থেকে উপযুক্ত দিকনির্দেশনা মিলবে কি? কারও কারও ধারণা, ২০১০-১১ সালে আমাদের শেয়ারবাজারে যে বিপর্যয় ঘটেছিল, তা ছিল অস্বাভাবিক বাজারেরও এক ‘এক্সট্রিম কেইস’। অবশ্য বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না, ‘স্বাভাবিক পুঁজিবাজারে’র সংজ্ঞা নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন। যা হোক, ওই বিপর্যয়ের পর বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ক্ষতি তো হয়ই, কেউ কেউ মনে করেনÑএর সর্বাধিক ধাক্কা গেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বের ওপর দিয়ে। আমাদের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সারা জীবন ফাটকা কারবার করে পুঁজিবাজার থেকে মুনাফা তুলে এসেছেন, এ কথা সবার বেলায় সঠিক নয়। পুঁজিবাজারে বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী রয়েছেন, যারা ন্যূনতম হিসাব-নিকাশ না কষে বিনিয়োগ করেন না সাধারণত। এই তারাই ২০১০ সালের শেষভাগে অবিশ্বাসের সঙ্গে লক্ষ করলেন, এতদিন যে কৌশলে বিনিয়োগ করে লাভবান হয়েছিলেনÑহাস্যকরভাবে ব্যর্থ হচ্ছে সেগুলো। আবার ১৯৯৬ সালের বিপর্যয় থেকেও তিক্ত শিক্ষা নিয়েছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। ২০১০ সালের বিপর্যয় তাদেরও হতবাক করে বৈকি। শেয়ারবাজারের নানা ঘটনায় স্পষ্ট, সেই ‘ট্রমা’ এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি এ দুই পক্ষ। ফলে বাজার যখন একটু চাঙ্গা হয়, তখন বিনিয়োগকারীরা অতি আশাবাদী হয়ে ওঠেন দ্রুত অতীত ক্ষতি পূরণের জন্য; আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা শঙ্কিত হয় বাজার আরেকটি বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে কি না ভেবে। এদিকে বাজারে সামান্য মন্দা দেখা দিলেই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন বিনিয়োগকারীরা। সে সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাও হাত গুটিয়ে নেয় অযাচিত হস্তক্ষেপ হওয়ার ভয়ে। ন্যাড়া ক’বার বেলতলায় যায়! আমরা বুঝতে পারি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এমন আচরণ মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বরং ক’বছর আগে তাদের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, তাতে এর চেয়ে ভালো আচরণ বুঝি প্রত্যাশাও করা যায় না। এখন কথা হলো, এ ট্রমা ধীরে ধীরে কিন্তু স্থিতিশীলভাবে কাটিয়ে ওঠা চাই। আর কাজটি নীতিনির্ধারকদেরই করতে হবে। অবশ্যই সেক্ষেত্রে সর্বদা সতর্ক থাকার পরামর্শ দেব আমরা। তবে খেয়াল রাখতে হবে, মিথ্যা ভয় বা অলীক আশাবাদ যেন বিনিয়োগকারী কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আচ্ছন্ন করে না রাখে।