মত-বিশ্লেষণ

মিসইনভয়েসিং এবং অর্থ পাচার

আন্তর্জাতিক ব্যবসায় চালানের গড়মিলের মাধ্যমে যখন অর্থ পাচার করা হয়, তাকে মিসইনভয়েসিং বলে। এতে করে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়। একই সাথে বিরাট অংকের টাকা বিদেশে পাচার করা হয়ে থাকে।

মিসইনভয়েসিং দুই ধরনের হয়ে থাকে। পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং (কম মূল্য দেখানো) ও আমদানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিংয়ের (বেশি মূল্য দেখানো)। প্রকার যাই হোক, উদ্দেশ্য হলো অর্থ পাচার।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘‘অর্থ বা সম্পত্তি পাচার’’ অর্থ— (১) দেশে বিদ্যমান আইনের ব্যত্যয় ঘটাইয়া দেশের বাহিরে অর্থ বা সম্পত্তি প্রেরণ বা রক্ষণ; বা (২) দেশের বাহিরে যে অর্থ বা সম্পত্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রহিয়াছে যাহা বাংলাদেশে আনয়ন যোগ্য ছিল তাহা বাংলাদেশে আনয়ন হইতে বিরত থাকা; বা (৩) বিদেশ হইতে প্রকৃত পাওনা দেশে আনয়ন না করা বা বিদেশে প্রকৃত দেনার অতিরিক্ত পরিশোধ করা।

মিসইনভয়েসিং আন্তজার্তিক ক্ষেত্রে একটা মহামারী আকার ধারণ করে চলেছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো বিপুল অংকের কর রাজস্ব হারাচ্ছে। তথ্য মতে, মিসইনভয়েসিংয়ের কারণে কোনো কোনো দেশ ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রফতানি আয় থেকে বঞ্চিত হয়।

২০০০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে স্বর্ণ রফতানির ক্ষেত্রে আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মোট পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৮২০ কোটি ডলার, যা মোট স্বর্ণ রফতানির ৬৭ শতাংশ। ১৯৯৬-২০১৪ সময়ে নাইজেরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল রফতানির ক্ষেত্রে আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৯৮০ কোটি ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রে মোট তেল রফতানির ২৪ দশমিক ৯ শতাংশের সমপরিমাণ।

জাম্বিয়ার সরকারি নথিপত্রে ১৯৯৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সে দেশ থেকে সুইজারল্যান্ডে ২ হাজার ৮৯০ কোটি ডলারের তামা রফতানির উল্লেখ রয়েছে। তবে সুইজারল্যান্ডের কোনো নথিতে এর উল্লেখ নেই। ১৯৯০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে চিলির সরকারি নথিপত্রে নেদারল্যান্ডসে ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের তামা রফতানির কথা উল্লেখ রয়েছে।

তবে নেদারল্যান্ডসের কোনো নথিতে এসব তামা আমদানির কথা উল্লেখ নেই। ১৯৯৫-২০১৪ সময়ে আইভরিকোস্টের নথিতে নেদারল্যান্ডসে ১ হাজার ৭২০ কোটি ডলার মূল্যের কোকো রফতানির তথ্য দেখা গেছে। কিন্তু আইভরিকোস্টের এ রফতানির ৩১ শতাংশ নেদারল্যান্ডসের আমদানি নথিপত্রে অনুপস্থিত।

শুধুমাত্র আইন করে মিসইনভয়েসিং এর মাধ্যমে অর্থ পাচার বন্ধ করা কি সম্ভব? ধরুণ, আপনি আমদানিকারক। আপনি ১০ টাকা মূল্যমানের জিনিস ১০ টাকা দিয়েই কিনলেন কিন্তু বিদেশে অবস্থিত রপ্তানিকারকের সাথে বোঝাপোড়ার মাধ্যমে ২০ টাকার দালিলিক প্রমাণপত্র প্রদর্শন করে, ২০ টাকা বিদেশে পাঠিয়ে দিলেন। অর্থাৎ, ১০ টাকা বেশি পাঠিয়ে দিলেন। এরকম হলে, আইন করে অর্থ পাচার আটকানো কঠিন। তবে অপরাধীদের আইনের আওতায় দ্রুত নিয়ে আসতে পারলে, মিসইনভয়েসিং এর প্রভাব কমে আসবে। একই সাথে, দেশের স্বার্থে দেশপ্রেমটা অত্যন্ত জরুরী।

লেখক-রিয়াজুল হক, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..