সম্পাদকীয়

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠানে চাই সুবিবেচনা

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান মিমি চকোলেট লিমিটেড বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখার ব্যাপারে ন্যূনতম আগ্রহও নাকি নেই সংশ্লিষ্টদের। দীর্ঘদিন ধরে এ প্রতিষ্ঠান থেকে মুনাফা না আসা ও কোম্পানির মেশিনারির বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত সময়োচিত বলা যায়। এতে পুরোনো মেশিন মেরামতে কোম্পানির অযাচিত অপব্যয় বন্ধ হবে স্থায়ীভাবে। বস্তুত এ ট্রাস্টের অধীনে বর্তমানে চালু অপর দুই প্রতিষ্ঠান পূর্ণিমা ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস স্টেশন ও চট্টগ্রাম ইস্টার্ন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজেও তেমন সুখবর নেই। এসবের ভবিষ্যৎ নিয়ে শোনা যাচ্ছে নানা শঙ্কা। এ অবস্থায় স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, আয় সৃষ্টিকারী সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে ট্রাস্টটি চলবে কীভাবে?

২০০৯ সালে মূলধনের অভাব ও বকেয়া ঋণের কারণে আরও একবার অস্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। সমস্যা সমাধানপূর্বক পুনরায় চালু করা হলেও লাভে চলতে পারে মাত্র এক বছর। পরবর্তী বছরে সে ধারা বজায় থাকেনি। প্রতিযোগিতামূলক বাজার পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এমন প্রতিষ্ঠান আরও বেশি মেয়াদে চালু রাখার কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। বন্ধের সিদ্ধান্তে এসব বিবেচনা যে অগ্রাধিকার পেয়েছে, তা বলা বাহুল্য। এর মধ্যেও ইতিবাচক খবর হলো, প্রতিষ্ঠানটির কোনো ব্যাংক ঋণ বা মূলধন ঘাটতি নেই। এ অবস্থায় আমরা চাইবো, প্রতিষ্ঠানটির জমি ল্যান্ড ডেভেলপারকে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা হোক। সেখানে এমন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হোক, যা বর্তমান বাজারে টিকে থাকতে সক্ষম হয় দীর্ঘ মেয়াদে। কাক্সিক্ষত আয় জোগাতে সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা এজন্য জরুরি যে, প্রয়োজনীয় আয়ের নিশ্চয়তা না থাকলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ট্রাস্টে। মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে যে ট্রাস্ট গঠিত হয়েছে, তার সংকটময় অবস্থা কারও কাম্য নয়। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই, নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে এসব বিষয় বিবেচনায় রাখবেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চকোলেটের বাজার যখন বাড়ছে, তখন মিমি চকোলেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর স্বভাবতই চিন্তা উদ্রেককারী। এ থেকে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতিও হালনাগাদ করতে হবে। পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রান্তিক উৎপাদন ব্যয় যেমন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়, তেমনি এসবের রক্ষণাবেক্ষণও কোনো কোনো সময় প্রতিষ্ঠানকে ফেলে বেকায়দায়। আমরা আশা করি, অন্যান্য কারখানাও এ থেকে শিক্ষা নেবে। সমমানের পণ্যবাজার দেশি প্রতিষ্ঠানের দখলে রাখার জন্যও এটি করা জরুরি।

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে চালু অপর দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে আমরা জানি না। এসব প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছিল ট্রাস্টের আয় বর্ধনে; প্রকৃতপক্ষে যা ব্যয় হবে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে। বর্তমান বাস্তবতায় কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কাক্সিক্ষত আয় জোগাতে সক্ষম না হয়, তাহলে সেগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত যথাদ্রুত সম্ভব নেওয়া উচিত। তাহলে ট্রাস্টটিকে যেমন অর্থ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে না, তেমনি বিদ্যমান জনবল ও অবকাঠামোর সদ্ব্যবহার সম্ভব হবে। এজন্য পূর্ণিমা ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস স্টেশন ও চট্টগ্রাম ইস্টার্ন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণার্থে নয়, জাতীয় অর্থনীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েও এটি করা দরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত যেসব প্রতিষ্ঠানের জমি ও অবকাঠামো উৎপাদনমুখী কাজে লাগানো সম্ভব, সেগুলো অনুৎপাদনশীল অবস্থায় ফেলে রাখা সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। আশা করি, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এসব বিষয় বিবেচনায় রাখবেন নীতিনির্ধারকরা। এও মনে রাখতে হবে, এর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বার্থ যুক্ত। দেশকে স্বাধীন করার জন্য পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে যারা কুণ্ঠাবোধ করেননি, তাদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত ট্রাস্টের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাই দেরি করা উচিত নয়।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..