মুগদা হাসপাতালে পরীক্ষায় অনীহা

নজরুল ইসলাম: সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের চিকিৎসকরা বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে দেন। সরকারি হাসপাতালে সাধারণত গরিব রোগীরাই বেশি আসেন, কারণ এখানে কম খরচে টেস্ট করানো যায়। কিন্তু রোগীদের অভিযোগ, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগসহ রোগ নির্ণয়ে নিয়োজিত অন্যান্য বিভাগ চরম অনীহা দেখায়। টেস্টের জন্য কাউন্টারে টাকা জমা দিতে গেলে বলা হয়, এগুলো বাইরে থেকে করাতে হবে। এছাড়া বেলা ১১টার পর আর টাকা জমা নেয়া হয় না। অনেক চিকিৎসক চেম্বারে আসেন ১১টায়। অনেক সময় বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দেয়া হয়। ব্যবস্থাপত্রে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম ও মোবাইল ফোন নম্বরও লিখে দেয়া হয়। এভাবেই চলছে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের ৩ নম্বর ইউনিট থেকে দিলারা বেগম নামের এক রোগীকে ‘ইউএসজি (আলট্রাসনোগ্রাফি) অব গাইডেড এফএনএসি মাস ইন লিভার’ নামের একটি টেস্ট করাতে বলা হয়। চিকিৎসকরা জানান, ওই হাসপাতালে টেস্টটি করানো হয় না। পরে রোগীর এক স্বজন হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ইমিওলজি ও রেডিওলজি বিভাগে গিয়ে খোঁজ নেন। সেখানে জেরিন নামের এক চিকিৎসক জানান, আগ্রহী হয়ে কখনও কখনও কোনো চিকিৎসক এ টেস্টটি করে থাকেন। সব সময় করানো হয় না। তার পরও দিলারা বেগম যে বিভাগে ভর্তি আছেন, সে বিভাগ এগিয়ে এলে করা যেতে পারে। তাদের কাছে টেস্টটি করার মতো প্রয়োজনীয় উপাদান নেই। ওই বিভাগে কথা বলতে তিনি পরামর্শ দেন।

গতকাল রোগীর ওই স্বজন মেডিসিন ওয়ার্ডের ৩ নম্বর ইউনিটে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। চিকিৎসকরা তাকে জানান, এখানে সম্ভব নয়। এ টেস্টটি বাইরেই করাতে হবে। এ টেস্ট সবচেয়ে ভালো করানো হয় গ্রিন রোডের ড্রিমস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে।

রোগীর স্বজনরা জানান, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিট-৩-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রারের সিল-সংবলিত একটি কাগজে টেস্টটির অ্যাডভাইজ করা হয়। সেখানে ডায়াগনস্টিক সেন্টারটির নাম লিখে দেয়া হয়।

এ প্রতিবেদক ড্রিমস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে গিয়ে জানতে পারেন, সেখানে জাতীয় কিডনি ও ইউরোলজি হাসপাতালের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন চিফ কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন। রিসিপশন থেকে জানানো হয়, ‘ইউএসজি (আলট্রাসনোগ্রাফি) অব গাইডেড এফএনএসি মাস ইন লিভার’ নামের টেস্টটি করাতে সাড়ে সাত থেকে ১২ হাজার টাকা লাগবে। তিন দিন পর রিপোর্ট দেয়া হবে।

গ্রিন রোডের ল্যাবএইড সাড়ে পাঁচ হাজার ও ল্যাবসায়েন্স সাড়ে ছয় হাজার টাকায় এ টেস্টটি করে থাকে।

এ বিষয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. নিয়াতুজ্জামানের বক্তব্য জানতে তার দপ্তরে গেলে তার সঙ্গে এ প্রতিবেদককে কথা বলতে দেয়া হয়নি। পরিচালকের পিও এ প্রতিবেদককে উপপরিচালক ডা. মুহাম্মদ নুরুল ইসলামের কাছে নিয়ে যান। সেখানে উপপরিচালক বিষয়টি জানতে চান। শেয়ার বিজের প্রতিবেদক বলা শুরু করলে সেখানে উপস্থিত মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক রুবিনা ইয়াসমিন নিজের পরিচয় দিয়ে তার কাছে বিষয়টি বলতে বলেন। তাকে বিস্তারিত বলা হলে তিনিও টেস্টটি করানো হয় না বলে জানান।

রোগীদের অভিযোগ অন্য অনেক টেস্টও এ হাসপাতালে করানো হয় না, বাইরে থেকে করাতে বলা হয়। এখানে কম খরচের টেস্টগুলো করানো হয়। বেশি খরচের টেস্টগুলো বাইরে থেকে করতে বলা হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যাপক রুবিনা ইয়াসমিন বলেন, এত দিন কভিডের জন্য ডেডিকেটেড ছিল। এখন বহির্বিভাগে রোগী ভর্তি শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব শুরু হবে।

ইমিওলজি ও রেডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাবিনা ইয়াসমিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, প্যাথলজি ও আমাদের বিভাগ মিলে এ পরীক্ষাটি করতে হয়। এটি সবসময় করা হয় না। মেশিনও নষ্ট।

দিলারা বেগমের স্বজনেরা জানান, ২৪ অক্টোবর বহির্বিভাগে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (মেডিসিন) ডা. ফারজানা ইসলামের চেম্বারে যান দিলারা বেগম। তখন তিনি কয়েকটি টেস্ট করতে দিয়েছিলেন। সেগুলোর প্রতিবেদন দেখে ২৫ অক্টোবর দিলারা বেগমকে হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেন আবাসিক মেডিকেল অফিসার। ভর্তির পর চিকিৎসকরা পর্যায়ক্রমে অনেক টেস্ট করতে দেন, যার বেশিরভাগ হাসপাতালের বাইরে করতে হয়েছে। একই রকম বক্তব্য অন্য রোগীদেরও। তারা জানান, যেসব টেস্টে খরচ বেশি সেগুলো বাইরে করাতে বলা হয়।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক রুবিনা ইয়াসমিন জানান, ‘ইউএসজি অব গাইডেড এফএনএসি মাস ইন লিভার’ পরীক্ষাটি ক্যানসার শনাক্ত করার জন্য করানো হয়ে থাকে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিনের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫০ টাকা দিয়ে এ টেস্টটি করা যায়। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।

জানতে চাইলে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউ অব ল্যাবরেটরি মেডিসিনের রেডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শহীদুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, এখনও আমরা এ টেস্টটি চালু করতে পারিনি।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিনের পরিচালক এহছানুল হক বলেন, লোকবল নেই, তাই এ টেস্টটি করানো হয় না। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি চালু হলেও এখনও এ টেস্টটি চালু করা যায়নি।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক কাজী মোসতাক জানান, সেখানে ‘ইউএসজি অব গাইডেড এফএনএসি মাস ইন লিভার’ পরীক্ষাটি করা যাবে। সেজন্য আগে আউটডোরে এসে সিরিয়াল নিতে হয়। তবে তিনি ফিয়ের বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি।


সর্বশেষ..