প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মূল্যস্ফীতির কারণ, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের উপায়

মেহেদী হাসান বিপ্লব: মূল্যস্ফীতি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর্থিক সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ দশমিক ১ শতাংশ, যা গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থনীতিবিদরা মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে গণ্য করেন। কারণ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, মধ্য ও নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়িয়ে দেয় এবং ভোক্তাদের জীবনমানকে দুর্বিষহ করে তোলে। মানুষ একসময় হতাশায় নিমজ্জিত হয় এবং সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে যায়। অর্থনীতিবিদরা বিভিন্নভাবে মূল্যস্ফীতির সংজ্ঞা দিয়েছেন। কুলবর্নের মতে, মূল্যস্ফীতি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে অত্যধিক পরিমাণ অর্থ অল্প পরিমাণ দ্রব্যসামগ্রীর পেছনে ধাবিত হয়। কেইন্সের মতে, পূর্ণ নিয়োগ ক্ষেত্রে উৎপাদনের পরিমাণ স্থির থেকে মোট চাহিদা বৃদ্ধির দ্বারা যদি দামস্তর বাড়ে, তবে তা হবে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি। ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধিই হলো মূল্যস্ফীতি, অর্থাৎ কোনো দেশে মোট অর্থের জোগান তার চাহিদার তুলনায় বেশি হলে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।

মূলকথা হলো অর্থের মান কমে যাওয়া, অর্থাৎ অল্প কোনো দ্রব্য বা সেবার পেছনে অধিক অর্থ ধাবিত হওয়াটাই হলো মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতির বৈশিষ্ট্য হলো: দামস্তর ক্রমাগত বাড়তে থাকে, অর্থের মূল্য তথা অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকে, অধিক অর্থ দিয়ে কম পরিমাণে পণ্যসামগ্রী ও সেবা ক্রয় করতে হয় এবং সামগ্রিক জোগানের  তুলনায় সামগ্রিক চাহিদা বেশি হয়। মূল্যস্ফীতি একটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় অভিশাপ। মূল্যস্ফীতি নামক অভিশাপটি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। যেমন: অর্থের জোগান বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, কর হ্রাস, উৎপাদন হ্রাস, ট্রেড ইউনিয়নের প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত, যুদ্ধব্যয় নির্বাহ, বৈদেশিক ঋণ, সাহায্য ও অনুদান বৃদ্ধি, মজুতদার ও চোরাকারবারি, বেতন কাঠামোর পরিবর্তন, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ইত্যাদি। তবে বাংলাদেশে মজুতদার ও চোরাকারবারি, বৈদেশিক ঋণ, সাহায্য ও অনুদান বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য বেশি মূল্যস্ফীতি সংঘটিত হয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশের রাজনীতিতে অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করলে এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ফলে সামগ্রিক জোগান হ্রাস পাওয়ায় দামস্তর বেড়ে মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হয়। মূল্যস্ফীতির ফলাফল বা প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ ও দুর্বিষহ আকার ধারণ করে। মূল্যস্ফীতির জন্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব পড়ে, যেমনÑদাম বৃদ্ধি ফটকা ব্যবসায়ীকে উৎসাহিত করায় মজুত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রকৃত উৎপাদন বিঘ্নিত হয়, দাম বৃদ্ধির দরুন জনগণের সঞ্চয় হ্রাস ও ভোগ বৃদ্ধি পায় ফলে পুঁজি গঠন বিঘ্নিত হয়,  মূল্যস্ফীতির ফলে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শিল্পে অসন্তোষ সৃষ্টি হলে উৎপাদন হ্রাস পায়, মূল্যস্ফীতিতে কালোবাজারি প্রসারিত হয় বলে বিনিয়োগ ও উৎপাদন হ্রাস পায়। এছাড়া মূল্যস্ফীতির কারণে বণ্টনের ওপর প্রভাব পড়ে। ফলে শ্রমিক শ্রেণি, কৃষক শ্রেণি, বিনিয়োগকারী, উৎপাদক শ্রেণি, করদাতা, ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূল্যস্ফীতির ফলে অন্যান্য পণ্যসহ রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন খরচ ও দাম বৃদ্ধি পায়। ফলে রপ্তানি পণ্যের বৈদেশিক চাহিদা কমে রপ্তানির পরিমাণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। স্বল্পমাত্রার মূল্যস্ফীতিতে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়ে সামাজিক সমৃদ্ধি দেখা দেয়। কিন্তু অতিমাত্রায় ও অব্যাহত মূল্যস্ফীতি বিরাজ করলে ধীরে ধীরে সমাজে আয়বৈষম্য সৃষ্টি হয় এবং শ্রেণিগত বিরোধ ও অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করে। জীবনযাত্রার ব্যয় অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় মজুরি বৃদ্ধির দাবি ওঠে, শ্রমিক-মালিক বিরোধ প্রকট হয় এবং সার্বিকভাবে সামাজিক অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। কালোবাজারি, দুর্নীতি ও অবৈধ পথে আয় বাড়ানোর চেষ্টা চলতে থাকে এবং সামগ্রিকভাবে সমাজে একটি অসুস্থ পরিবেশ বিরাজ করে।

অতএব, দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ ও গতিশীল রাখতে হলে অবশ্যই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিকল্প নেই। মূল্যস্ফীতি প্রশমনে সরকারকে তিনটি পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। এগুলো হলোÑবৈদেশিক মূল্যর বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, ব্যাংক খাতের ঋণের সুদ হারের নির্ধারিত সীমা তুলে দেয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘নীতি সুদহার’ বাড়ানো।

এসব পদক্ষেপ নিলে মূল্যস্ফীতি সহনীয় হবে এবং সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে বলে মত দেন তারা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখানে আরেকটি বিষয় যোগ করতে হবে, যেটা ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবেই না, বরং মূল্যস্ফীতি প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

আর সেটা হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কেননা কোনো দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করলে সেই দেশে মূল্যস্ফীতি অনেকাংশেই বেড়ে যায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। যদি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়, দেশ যদি রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে ধাবিত হয়, তবে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে, দেশের অর্থনীতিতে ধস নামবে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। ফলে দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি পাবে। ফলে মধ্য ও নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষ ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। শেষমেশ সাধারণ মানুষ ভোগান্তির সম্মুখীন হবে ইত্যাদি, যা এরই মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সুতরাং সরকারের উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করার পাশাপাশি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য দল-মত নির্বিশেষে সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। সবার পরামর্শ ও সহযোগিতায় দেশ এগিয়ে যাক। দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হোক। দেশের সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে বা শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ লাভ করুক, এটাই আমাদের কাম্য। আমাদের সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায় একদিন বাংলাদেশ সোনার বাংলায় পরিণত হবে বলে আশা করি।

শিক্ষার্থী

দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়