প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মূল্যস্ফীতি বনাম দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র

 

ফরহাদ জাকারিয়া: অর্থশাস্ত্রের ‘দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র’ তত্ত্বটি কমবেশি অনেকেরই জানা। এ তত্ত্বের প্রবক্তা অধ্যাপক র‌্যাগনার নার্কসের মতে, দরিদ্র বলেই একজন মানুষের দারিদ্র্য ঘোচে না। কারণ দরিদ্র হওয়ার কারণে সে আয় করে কম, এজন্য সঞ্চয় করাও দুষ্কর হয়ে ওঠে তার জন্য। এটি করতে পারে না বলেই পুঁজি গঠন করাও তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। আর পুঁজি থাকে না বলে ওই ব্যক্তি বিনিয়োগ করতে পারে না। এ বিনিয়োগহীনতার কারণে তার আয় বাড়ে না। ফলে সে দরিদ্রই থেকে যায়। অধ্যাপক নার্কসের মতে, এ অবস্থা ব্যক্তির জীবনে চক্রাকারে আবর্তিত হয়। এজন্য দারিদ্র্যের কবল থেকে বের হওয়া দরিদ্র ব্যক্তির পক্ষে হয়ে ওঠে বেশ কঠিন।

আমাদের সমাজে নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ আছে, যাদের সেই অর্থে ‘দরিদ্র’ বলা যায় না। মাসে যে আয় তারা করে, তা দিয়ে দিন তাদের চলে যায় মোটামুটিভাবে। তারা ভালো খায়, ভালো পরেও। কষ্ট করে মাস শেষে ব্যাংকে, পোস্ট অফিসে, বেসরকারি সংস্থায় (এনজিও), সমবায় সমিতি কিংবা কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে কিছু সঞ্চয়ও করতে দেখা যায় তাদের। কিন্তু গোল বাধে তখন, যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। এতে তাদের জীবনে বেড়ে ওঠে ভোগান্তি; অবস্থা কখনও কখনও হয়ে পড়ে শোচনীয়। এ অবস্থায় নিত্যদিনের বাজার চাহিদামতো করা কঠিন হয়ে পড়ে তাদের জন্য। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তারা প্রথমে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ খরচগুলোকে বাদ দেয় তালিকা থেকে। এতেও কুলিয়ে উঠতে না পারলে প্রয়োজনীয় বাজারও কিছু কাটছাঁট করে। তাতেও যদি পেরে ওঠা না যায়, তখন তারা হাত দেয় মাস শেষে সঞ্চয়ের জন্য নির্ধারিত অর্থে।

সাধারণত মানুষের মধ্যে প্রবণতা দেখা যায় সচ্ছলভাবে জীবনযাপনের পর যা বাকি থাকে, সেটুকু সঞ্চয়ের। নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এ প্রবণতা দেখা যায় আরও বেশি। তাতে হয় কি, মূল্যস্ফীতির কারণে স্বাভাবিক ধারায় জীবনযাপনে সমস্যা হলে তারা সঞ্চয়ের জন্য নির্ধারিত অংশটুকুও খরচ করে ফেলে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে ব্যক্তির সঞ্চয়ে। এমন অবস্থা দীর্ঘ সময় অব্যাহত থাকলে, সমসময়ে ব্যক্তির আয় না বাড়লে ও চাহিদা অপরিবর্তিত থাকলে সঞ্চয়ের মাধ্যমে পুঁজি গঠন তার পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে বিনিয়োগের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধিও হয়ে ওঠে অসম্ভব। এ অবস্থায় ব্যক্তির আয় নির্ধারিত থাকলেও প্রকৃতপক্ষে কমে যায় তার ক্রয়ক্ষমতা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার মানও হয় নি¤œমুখী।

এখন দিন বদলেছে। তাই সময়ের সঙ্গে বদলেছে আয় ও সঞ্চয়-সম্পর্কিত ধারণা। আগে বলা হতো আয় বুঝে ব্যয় করো। এর পরিবর্তে এখন অনেককে বলতে শোনা যায়Ñ‘ব্যয় বুঝে আয় করো’। অবশ্যই সেটা হতে হবে সৎভাবে, বৈধ উপায়ে। আর সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে বলা হতো জীবিকা নির্বাহের পর যা অবশিষ্ট থাকে, অপচয় না করে তা সঞ্চয় করো।’ কিন্তু এখন বিশ্বের অন্যতম ধনী ওয়ারেন বাফেটের এ কৌশল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, ‘মাসের শুরুতে সঞ্চয়ের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা খরচ করো।’ নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের মানুষকে যদি এ ধারায় বিবেচনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে, ব্যয় অনুযায়ী আয় করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। কারণ তাদের উপার্জন নির্দিষ্ট। আর মাসের শুরুতে সঞ্চয়ের পর পরবর্তী দিনগুলোয় অবশিষ্ট অংশ খরচের মতো সিদ্ধান্তও তারা নিতে পারে না মূল্যস্ফীতির কারণে সংকটে পড়ার শঙ্কায়।

বস্তুত এমন পরিস্থিতিতে যে ক্ষতি হয়, এটা শুধু ব্যক্তির নয় জাতীয় অর্থনীতির। নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের মানুষ যখন ব্যাপকভাবে মূল্যস্ফীতির কারণে সঞ্চয় করতে পারে না, তখন তার প্রভাব পড়ে জাতীয় সঞ্চয়ে। তাতে পুঁজি গঠন হয় না। এ কারণে ব্যক্তিবিনিয়োগও কমে যায়। এ থেকে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট, মূল্যস্ফীতি শুধু ব্যক্তির জীবনে নয়, টানাপড়েন সৃষ্টি করে জাতীয় অর্থনীতিতে। অনেকে হয়তো বলবেন, এরপরও জাতীয় সঞ্চয় তো ক্রমে বাড়ছে। সেক্ষেত্রে বিবেচ্য হলো, এ বৃদ্ধির পেছনে কোন শ্রেণির মানুষের অবদান বেশি।

বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্যে বলা হয়েছে, সর্বশেষ প্রান্তিকে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এটি ছিল ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ ও তৃতীয় প্রান্তিকে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। সার্বিকভাবে বিদায়ী অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এ সময়ে ব্যাংক খাতে আমানতের মুনাফার গড় হার ছিল সাড়ে ৫ থেকে ৫ শতাংশের নিচে। ব্যাংক খাতের মুনাফা গড় মূল্যস্ফীতির নিচে নেমে আসায় তাও আলোচনায় রয়েছে অনেকদিন ধরে। এ প্রবণতা রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সার্কুলার জারি করলেও তা তেমন কাজে আসেনি। আমানতের বিপরীতে ব্যাংকের মুনাফার হার নি¤œমুখী রয়েছে আগের মতোই। ওই সার্কুলারে এ শঙ্কা করা হয়েছিল, এতে অপচয়মূলক ভোগব্যয় বেড়ে উঠতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে জাতীয় সঞ্চয়ে।

বিনিয়োগের আগে পুঁজি গঠনকালে ক্ষুদ্র সঞ্চয় থেকেও উৎসাহজনক মুনাফা প্রত্যাশা করে মানুষ। অনেকে আবার বাড়তি ব্যয় বহনের জন্য নির্ভর করে এ সঞ্চয় থেকে প্রাপ্ত মুনাফার ওপর। দেশে সঞ্চয়ের যেসব মাধ্যম উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো উৎসাহব্যঞ্জক মুনাফা দিচ্ছে, তা কিন্তু বলা যাবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর হার নেমে এসেছে গড় মূল্যস্ফীতির নিচে। এ কারণেও অনেকটা নিরুৎসাহিত হয়ে সঞ্চয়বিমুখ হচ্ছে মানুষ। বাড়ছে ভোগব্যয়। এর প্রভাব দেখা গেছে বিবিএস প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে। তাতে দেখানো হয়েছে, জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে ব্যক্তি-ভোগব্যয়ের অবদান বেড়েছে আগের তুলনায়। এ ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির নেতিবাচক দিক হলো, এর একটা অংশ স্বভাবতই অপচয় হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ ধরনের অপচয় যেমন ঠেকানো যাবে না, তেমনি ব্যক্তির সঞ্চয়ও প্রভাবিত হবে নেতিবাচকভাবে।

উন্নয়নের ধারায় থাকা কোনো অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের গুরুত্ব অপরিসীম, তা হয়তো কেউই অস্বীকার করবেন না। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির বর্তমান যে অবস্থা তাতে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট ও নি¤œ আয়ের মানুষের সঞ্চয় কি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না? এ পরিস্থিতি কি প্রভাব ফেলছে না ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগে? খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির কারণে যেসব মানুষ নিত্যদিনের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সঞ্চয়ের বিষয়টি তাদের মাথায় সেভাবে থাকার কথা নয়। প্রশ্ন হলো, এ কারণে ব্যক্তি যদি পুঁজি গঠন ও বিনিয়োগ বাড়াতে না পারে, তাহলে এ পরিস্থিতি কি তার দরিদ্র অবস্থাকে আরও প্রকট করে তুলবে না? এ অবস্থায়ও কিছু মানুষের আয় বাড়বে। তবে তাদের সঙ্গে বৈষম্য বাড়বে সঞ্চয়ে ব্যর্থ নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের মানুষের। অধ্যাপক নার্কস ব্যক্তির দরিদ্র থাকার পেছনে তার দারিদ্র্যকে দায়ী করেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতির কারণে ‘ভালো আয়’সম্পন্ন মানুষকেও বরণ করতে হচ্ছে একই পরিণতি। দৃশ্যত তারা ভালো অঙ্কের আয় করছে বটে; তবে সব চলে যাচ্ছে খাওয়া খরচে। তাদের সঞ্চয় বলতে তেমন কিছু নেই। এটা করার মতো বাস্তবতাও নেই তাদের।

প্রতিবছর কত মানুষ দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠছে, সে তথ্য পাওয়া যায় হরহামেশাই। সরকারের পক্ষ থেকেও এটি প্রচার করা হয় উৎসাহসহকারে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে কত মানুষ প্রত্যাশিতভাবে সঞ্চয় করতে পারছে না, কত মানুষ আবদ্ধ হয়ে পড়ছে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে, সে তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক পরিসংখ্যানে দেখানো হয়, জাতীয় সঞ্চয় বাড়ছে। সে সঞ্চয় কাদের? পরিস্থিতি বিচারে অবশ্য বুঝতে কষ্ট হয় না, এর সিংহভাগ ক্ষেত্রেই অবদান ধনীদের। মূল্যস্ফীতি তাদের জীবনে তেমন একটা প্রভাব ফেলে না। তবে মনে রাখতে হবে, কাঠামোগত কারণে মানুষ যদি দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে তথ্যগতভাবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও সার্বিকভাবে দারিদ্র্র্য মোচন হবে না। বরং ক্ষেত্রবিশেষে দারিদ্র্য বাড়লেও সেটা কোনো পরিসংখ্যানে আসবে না। কোনো জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা পরিসংখ্যান যদি না থাকে, তারা থেকে যায় সরকারের পরিকল্পনার বাইরে। তাহলে এমন সব মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে কীভাবে? বলা ভুল হবে না, অনিবার্যভাবেই তারা আটকে পড়বে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে।

অর্থশাস্ত্রে বলা হয়, অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে আয় বাড়লে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটে; ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে তার আকাক্সক্ষার। বাস্তবতা হলো, মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হয়ে গেলে আয় বাড়লেও সেটা ব্যক্তির জীবনে তেমন একটা প্রভাব ফেলে না। এজন্য নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের মানুষের সঞ্চয়প্রবণতা স্বাভাবিক রাখতে শুরুতেই দরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ; যাতে মানুষ তার সামর্থ্যরে মধ্যে প্রত্যাশিত সঞ্চয় করতে পারে। অন্যদিকে পুঁজি গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে উৎসাহজনক রিটার্নের ব্যবস্থাও করতে হবে তাদের জন্য। তাহলে ব্যক্তিখাতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে। এতে কাঠামোগত কারণে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে সহজে আটকে পড়বে না মানুষ। একই সঙ্গে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। যে কোনো ধরনের বিনিয়োগেই ঝুঁকি থাকে। কিন্তু সেটা যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়, তাহলে পুঁজি থাকলেও মানুষকে উৎসাহিত করা যাবে না এ কাজে। এতে হাতে অর্থ থাকলেও তা সহায়ক হবে না আয় বৃদ্ধিতে। অর্থাৎ সে পরিস্থিতিতেও নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের মানুষ আটকে পড়বে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে।

 

ব্যাংক কর্মকর্তা

fzakariabdÑgmail.com