মেঘনার পাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তুতি!

চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

মাসুম বিল্লাহ: চাঁদপুরে খরস্রোতা নদী মেঘনায় বিলীন হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানেই চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য সাড়ে ৬২ একর ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরিবর্তন করে সদর উপজেলার অন্য স্থানে এটি স্থাপনের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রস্তাবিত স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাট করার সুযোগ পাবে বলেও বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর ‘চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১৯’-এর খসড়া চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। এরপর ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বিল জাতীয় সংসদে বিল পাস হয়। বিশ্ববিদ্যালয় আইনে জেলার সদর উপজেলার যে কোনো স্থানে এটি স্থাপনের নির্দেশনা রয়েছে। আইন পাস হওয়ার পর চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি ড. মো. নাছিম আখতারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়োজিত সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটি জেলার সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের চর বহরিয়ায় স্থান নির্বাচন করে। এই চর বহরিয়া মেঘনা নদীর ভাঙনপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলে স্থানীয় মানুষ জানান। যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এলাকাটি বেশ পিছিয়ে। নির্ধারিত স্থানটি জলাভূমি এবং প্রস্তাবিত চত্বর থেকে খরস্রোতা মেঘনা নদীর দূরত্ব মাত্র ৭০০ মিটার। ওই স্থানের কয়েক মাইল উজানে চাঁদপুর শহর এমনিতেই ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পর যে কোনো সময় নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। তা সত্ত্বেও সেখানেই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। এ স্থানটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও এ বিষয়ে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এ সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণসহ সার্বিক উন্নয়নকাজকে ঘিরে মোটা অঙ্কের অর্থ উপার্জনের কৌশল আঁটছেন প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি। কিন্তু এ বিষয়ে কেউই মুখ খুলতে রাজি নন।

নির্ধারিত স্থানে কম দামের জমি জালদলিল করে বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দাম দেখানোর পাঁয়তারা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবে অধিগ্রহণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের ছক কষছে একটি মহল। তারা জোটবদ্ধ হয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বেশকিছু জমি আগেই ক্রয় করে তা বাড়তি মূল্য দেখিয়ে দলিল করিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ভরাট করার মাধ্যমে জমির শ্রেণিও পরিবর্তন করা হবে, যা আইনের পরিপন্থি। তাছাড়া সরকারের নির্দেশনা ছিল জেলার পুরান বাজার এলাকা থেকে হাইমচর উপজেলা পর্যন্ত বৃহৎ কোনো প্রকল্প গ্রহণ না করার বিষয়ে। সে নির্দেশনা অমান্য করেই স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণের কর্মযজ্ঞ চলছে বলে জানা গেছে।

এদিকে চর বহরিয়া ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে ছাড়পত্র দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের চাঁদপুর জেলা কার্যালয়। গত ২ মে ডিসি অফিস বরাবর পাঠানো ছাড়পত্রে উল্লেখ করা হয়, ওই স্থানটি মেঘনা নদীর ৭০০ মিটার পূর্বদিকে চাঁদপুর সেচ প্রকল্প এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অভ্যন্তরে অবস্থিত। বর্তমানে নদীর প্রতিরক্ষামূলক কাজ চলমান থাকায় এলাকাটি এই মুহূর্তে মেঘনার ভাঙনকবলিত নয়। তবে নদীর মরফোলজিক্যাল পরিবর্তনের কারণে নদীর গতিপথ যে কোনো মুহূর্তে পরিবর্তন হতে পারে।

জানা গেছে, নদীর হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যাল কোনো স্বাধীন সমীক্ষা না করেই এ স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নদীর মরফোলজি পরিবর্তন হলে সেখানকার স্থাপনাগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। তা জানা সত্ত্বেও পাউবো ছাড়পত্র দিয়েছে! ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে কেন ছাড়পত্র দেয়া হলো, সে বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবোর চাঁদপুর জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম রেফাত জামিল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সমীক্ষা করলেই যে নদীভাঙন প্রবণতার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। তা ছাড়া যে স্থানটি নির্বাচন করা হয়েছে, তা বর্তমানে প্রতিরক্ষামূলক বাঁধের আওতায় রয়েছে এবং চর পড়ে গেছে। আর নদীর তীর রক্ষা কাজ এখনও চলমান। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। আমরা কোনো মহল কর্তৃক প্রভাবিত হইনি।’

কোন নদী কতটা ভাঙনপ্রবণ, তা যাচাই করার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশকিছু স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান সমীক্ষা পরিচালনা করে। কিন্তু মেঘনার মতো এত শক্তিশালী এক নদীর এত কাছ ঘেঁষে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা স্থাপনের প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমীক্ষা করা হয়নি। তাছাড়া এমন শক্তিশালী নদীর ক্ষেত্রে বাঁধ কখনো ভাঙন ঠেকানোর নিশ্চয়তা দেয় না। অনেক বড় বড় বাঁধ ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার উদাহরণ দেশে অসংখ্য। এমনকি চাঁদপুর জেলায়ও অসংখ্যবার বাঁধ বিলীন হয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। তা সত্ত্বেও ভাঙনপ্রবণ নদীর উপকণ্ঠেই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির বাস্তবায়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি লিয়াজোঁ অফিস খোলা হয়েছে। সেখানে খোঁজ নিয়েও চর বহরিয়ায় ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়ে এখনো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত হয়নি। ফলে এক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়নি।

জানা যায়, ভূমি অধিগ্রহণে কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হতে পারে, তার একটি প্রাক্কলন ডিসি অফিস থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালকে সরবরাহ করা হবে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবিত ডিপিপি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে জমা দেবে। সেখান থেকে পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়টি বাস্তবায়নের মূল কাজ শুরু হবে।

এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নাছিম আখতার ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া কতদূর অগ্রসর হয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চাঁদপুরের ডিসি অঞ্জনা খান মজলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা ওই এলাকার ভূমির দাম নির্ধারণের বিষয়ে সাবরেজিস্ট্রি অফিসসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। সেখান থেকে জবাব আসার পর ভূমি অধিগ্রহণে কী পরিমাণ অর্থ লাগবে, সে-সংক্রান্ত প্রাক্কলন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হবে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বরাদ্দ করা হলে ভূমি অধিগ্রহণের মূল কাজ শুরু হবে।’ এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থান কেন নির্বাচন করা হলো, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত সংশ্লিষ্ট কমিটি সম্ভাব্যতা যাচাই করে এ স্থান নির্বাচন করেছে। স্থান নির্বাচনের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কোনো ভূমিকা নেই।’ 

সর্বশেষ..