প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মেঘের দেশে

আদিবাসী ও বাঙালির সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত সাজেক ভ্যালি। পথের দুই ধার ঘেঁষে এখানে গড়ে উঠেছে জনবসতি। দৃষ্টিনন্দন সাজেক থেকে ফিরে তার রূপের বিবরণ তুলে ধরেছেন সানজিদা রহমান

চোখ বুজে কল্পনার রাজ্যে যে অজস্র তারকার মেলায় নিঃশেষে হারিয়ে যাওয়া যায় সেই স্বর্গভূমি সাজেক। বাংলাদেশের দার্জিলিংখ্যাত সাজেক যেন মেঘরাজ্য, যেখানে লালকমল পঙ্খিরাজে চড়ে উড়ে আসতো কাঞ্চনমালার খোঁজে! রাশি রাশি মেঘের ভেলায় অনবরত ডুবসাঁতারের খেলা। উপচে ভেসে যাওয়া পূর্ণিমার রাতে আকাশটা বিলীন! সরু পিচঢালা পথ প্রতিনিয়ত বাঁক নেয় ওপর-নিচ অথবা ডানে-বাঁয়ে! সেই পথ ধরে হেঁটে যেতে যেতে বারবার মনে হয়েছে, আমার আকুল করা প্রাণ, সখা, বাঁধো তোমার একতারাটির সুরে।

চটজলদি পরিকল্পনার কারণে তেমন কোনো আয়োজন ছাড়াই ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিলাম আমরা ক’জন প্রকৃতিপ্রেমী। পরিপূর্ণ আনন্দ নিয়ে পরিতৃপ্ত মনে ফিরে এসেছি আরও অনেক কর্মব্যস্ত দিনের জন্য শক্তি সঞ্চয় করে। সত্যি, কি অপূর্ব এ মায়ানগরী সাজেক। স্বর্গের চেয়ে কি কম সুন্দর! মেঘের ভেলায় চড়ে রাত পোহাতেই পুবের আকাশে নয়নাভিরাম সূর্যোদয় অথবা পশ্চিমে হেলে পড়া রক্তিম সূর্যাস্ত যে আজীবন  ভোলার নয়!

আদিবাসীদের অবস্থানের কারণে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এ অঞ্চলে মাঝেমধ্যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাই সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে যে কোনো ট্যুরিজম ইনফরমেশন অফিস অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে কিছুটা খোঁজ-খবর নিয়ে যাওয়াই ভালো।

দর্শনার্থীদের থাকার জন্য যে হোটেলগুলো আছে তার প্রায় সবকটাই পাহাড়ের ঢালে, আর তাই জানালা খুলে হাত বাড়াতেই  মেঘেরা এসে অভিবাদন জানায়, করমর্দন করে পরম ভালোবাসায়। পাহাড়ের ঢাল কেটে সরুপথে হেঁটে যেতে যেতে চোখে পড়ে মন্দির, মসজিদ আর গির্জার অপূর্ব মেলবন্ধন। শিশুদের জন্য তৈরি করা স্কুলগুলোও ঘরের ধার ঘেঁষে বানানো হয়েছে যতœ সহকারে।

সাজেকে রয়েছে আধুনিক বিদ্যুৎব্যবস্থা। সোলার পাওয়ার ব্যবহার করে শহরটাকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মতও করে তোলা হয়েছে, যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

রাত যত গভীর হতে থাকে তারকাখচিত আকাশে যেন শুরু হয় রুপালি হোলি খেলা। দু’চোখ ভরে দেখতে গিয়ে বারবার আপ্লুত হয়েছি আবেগে, মনে হয়েছে সার্থক আমার দু’চোখ। নিজের অজান্তেই আনন্দাশ্রু চুপিচুপি নেমে এলো চিবুক জুড়ে। প্রকৃতি যেন কানে-কানে বলে গেল, ‘নির্মল হও নিস্বর্গ প্রেমে, সুন্দর হও ভাবনালোকে…’।

সাজেকের আরেক আকর্ষণ কমলাবাগান। সারবাঁধা এ কমলা বাগানটা সাজেক ভ্যালির শেষ প্রান্তে অবস্থিত। পাহাড়ের মাটি কাটা রাস্তা ধরে সতর্কতায় গাড়ি নিয়ে এগিয়ে যেতে হয় বাগানের দিকে, তারপর আবার কিছুটা পথ পায়ে হাঁটা। প্রতিটি মুহূর্তই মনে হচ্ছিলো এ এক পরম পাওয়া, চোখজুড়ানো মনোমুগ্ধকর এ দৃশ্য মানব জš§কে দিলো সার্থকতা।

সাজেক যাওয়ার বিভিন্ন ধরনের যাত্রী সেবা আছে। তবে পরিবার নিয়ে ঘুরতে গেলে নিজস্ব গাড়িই ভালো। যে উচ্চতায় উঠতে হয় তার জন্য অকটেন চালিত মাইক্রোবাস ও সুদক্ষ ড্রাইভার সঙ্গে থাকা চাই। সাজেক বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর সুদক্ষ কর্মীদের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা একটি সাজানো শহর, যা চট্টগ্রামের উত্তর পূর্ব কোণে, ফেনীর পূর্ব প্রান্তে এবং বান্দরবান জেলার সর্ব উত্তরে অবস্থিত। খাগড়াছড়ি থেকে আনুমানিক ৭২ কিলোমিটার উত্তরে বাংলাদেশ ও ভারতের মিজোরাম সীমান্ত নিকটবর্তী এ স্বর্গভূমি। দর্শনার্থীর অনবরত পদচারণে মুখর এ পর্যটন স্থানটিতে যেতে হলে আগে থেকে হোটেল বুক করে যাওয়া ভালো। বিভিন্ন ধরনের হোটেলের সুব্যবস্থা রয়েছে সেখানে, যা মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সবার চাহিদাই মেটাতে সক্ষম।