দুরে কোথাও

মেঘের রাজ্য মেঘালয়ে আমরা

মেঘের সঙ্গে খেলার মজাই আলাদা। অনেকের কাছে স্বপ্ন পূরণের মতো এ খেলা। তবে চাইলেই তো আরÑমেঘের সঙ্গে খেলাটা সহজ নয়। এজন্য যেতে হবে মেঘেদের রাজ্যে। ভারতের মেঘালয় তেমনই একটি রাজ্য। পাহাড়ের কোলে মেঘের নিত্যখেলা দেখতে চাইলে কিংবা জলপ্রপাতের গর্জন শুনতে চাইলে মেঘালয় যেতে পারেন। সেখান থেকে বেরিয়ে আসা একদল সৌন্দর্যপ্রেমী ভ্রমণপিপাসুর অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন নাবিল তাহমিদ রুশদ ও হাতেম আলী

ভারতের সেভেন সিস্টার্সের অন্যতম মেঘালয়। মেঘা অর্থ মেঘ আর আলয় অর্থ নিবাস; অর্থাৎ মেঘালয় হচ্ছে মেঘের নিবাস। এটি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের পাহাড়ঘেরা একটি রাজ্য। আমরা সিলেট ও ময়মনসিংহ থেকে ভারতে যেসব বড় পাহাড় দেখতে পাই, কিন্তু যেতে পারি না, সেগুলো সবই মেঘালয়ের। সিলেট ও ময়মনসিংহ বেড়াতে গিয়ে ওই পাহাড়গুলো দেখে আফসোস হতো খুব। ইচ্ছা হতো পাহাড়ে উঠে মেঘকে ছোঁয়ার। সে ইচ্ছাটা পূরণ করতে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে পাড়ি জমিয়েছিলাম মেঘালয়ে।

মেঘালয় যাওয়ার জন্য আগস্ট মাস উপযুক্ত সময়। তাই আগস্টের মাঝামাঝি এক রাতে আমি হাতেম আলী ও আমার তিন বন্ধু (মানী, পুলক ও ইমরান) রাজধানী থেকে রওনা হই সিলেটের উদ্দেশে। পরদিন সকাল ৬টায় সিলেটে পৌঁছাই। পরে সেখান থেকে তামাবিল সীমান্ত দিয়ে মেঘালয়ের ডাউকি বর্ডারে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষে ডাউকি বাজারের দিকে হাঁটা শুরু করি। বাজারে যাওয়ার সময় বড় পাহাড়গুলো স্মরণ করিয়ে দিল যে আমরা মেঘালয়ে পা রেখেছি। তখন মনের মধ্যে অন্যরকম এক শিহরণ কাজ করছিল। সকালের হালকা নাস্তা শেষে টাকাকে ইন্ডিয়ান রুপি করে একটা গাড়ি ঠিক করে রওনা হই আমাদের প্রথম স্পট ‘লিভিং রুট’ ব্রিজ দেখতে।

পথিমধ্যে মেঘালয়ের মেঘ যেন বিনা আমন্ত্রণে কাছে এসে আমাদের ছোঁয়া দিয়ে গেল। পরিচয়ের শুরুটা বেশ ভালোই হলো। এরপর চলে যাই লিভিং রুট ব্রিজে। দুটো জীবন্ত গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি এ ব্রিজের নিচে দিয়ে বয়ে চলেছে ঝরনা। ঝরনার পানিতে কিছুক্ষণ খেলে চলে যাই এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাওলিনংয়ে। পূর্ব খাসি পাহাড়ের এ গ্রামকে বলা হয় ‘ঈশ্বরের নিজস্ব বাগান’। এ গ্রামে বাঁশের তৈরি একটা ঘর রয়েছে, যা বাংলাদেশের ভিউ নামে পরিচিত। এখান থেকে বাংলাদেশের চমৎকার দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

এরপর যাত্রা করি মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের উদ্দেশে। রাত ৮টায় আমরা সেখানে পৌঁছাই। সেখানে অপেক্ষায় ছিল আমাদের আরেক বন্ধু আকিব ও তার ছোট ভাই অভি। তারা আগেই কলকাতা হয়ে শিলং গিয়েছিল। রাত্রীযাপন শেষে সকাল ৬টার আগে বের হয়ে যাই শিলংয়ের সৌন্দর্য দেখতে। প্রথমে যাই উমিয়াম লেকে। স্থানীয় ভাষায় একে বড় পানি বলা হয়। পানির ওপরে সকালের আকাশের প্রতিবিম্ব আর পাহাড়ের ওপর সাদা মেঘÑসব মিলিয়ে এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয় এখানে।

পরের যাত্রা শুরু হলো ডন ভস্কো মিউজিয়াম দেখার জন্য। একটি মিউজিয়াম যে কতটা আধুনিক ও তথ্যবহুল হতে পারে তা এটি না দেখলে বোঝাই যেত না। সেভেন সিস্টার্সের ইতিহাস ও কৃষ্টি সুন্দরভাবে সাজানো আছে এখানে। সাততলার এ মিউজিয়ামের ছাদে উঠলে পুরো শিলং শহরটাকে দেখা যায়। এক বাঙালি হোটেলে খাবার খেয়ে আমারা চলে যাই লাইটলুশে। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে লাইটলুশের সৌন্দর্য আমাদের আর উপভোগ করা হলো না। এতে সবারই মন খারাপ হয় সেদিন। চলে যাই এলিফ্যান্ট ফলস দেখতে। এটি তিন স্তরের একটি ঝরনা। দেখে সবার মন আনন্দে ভরে যায়। খাওয়া-দাওয়া শেষে যাত্রা করি চেরাপুঞ্জির উদ্দেশে, মানে বৃষ্টির শহরে।

সেখানে গিয়ে প্রথমে থাকার জন্য একটা ‘হোম স্টে’ ভাড়া করি। এরপর ফ্রেশ হয়ে চলে যাই চেরা বাজারের দিকে। বৃষ্টিস্নাত রাত। আমরা সবাই রেইনকোট পরে চেরা বাজারে ঘোরাফেরা শেষে খাওয়া-দাওয়া ও কেনাকাটা করি। তবে এ বৃষ্টি আমাদের দেশের বৃষ্টির মতো নয়। এতে এক ধরনের অদ্ভুত মাদকতা রয়েছে, যা শরীরে অন্যরকম পরশ বুলিয়ে দেয়।

পরদিন সকাল ৬টায় আমরা চলে যাই সেভেন সিস্টার্স ঝরনা দেখতে। কিন্তু তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও এ ঝরনা দেখতে পারিনি শুধু মেঘের জন্য। ঝরনার পানির কলকল শব্দ শুনেছি। না দেখার আফসোস মনে পীড়া দিচ্ছিল। দেখতে না পেয়ে আমরা হতাশ হয়ে চলে যাই মসমাই গুহা দেখতে। ১৫ মিনিটের ভয়ংকর যাত্রার পরে গুহার দেখা পাই। এরপর যাই নোহকালিকাই ঝরনা দেখতে। প্রকৃতি যে এত সুন্দর হতে পারে, এখানে না এলে আমরা বুঝতেই পারতাম না। পরের গন্তব্য ছিল দাইনথল ঝরনা। বিধাতা যেন অনেকটা সময় নিয়ে গড়ে দিয়েছেন এখানকার সব ঝরনাকে। এরপর যাই উইসুড়ং ঝরনার কাছে। এটি দেখতে একটু কষ্ট করতে হয়েছিল। ২০ মিনিট পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না যে পাহাড়ের নিচে এত সুন্দর ঝরনা থাকতে পারে। ওপরে ওঠার সময় সঞ্চিত সব শক্তি শেষ। শরীর ক্লান্ত হলেও মন তো মানছে না। চোখ বলছে আরও দেখব।

তাই ‘ওয়াকাবা’ দেখতে চলে গেলাম। খাসিদের ট্রেডিশনাল ড্রেস পরি। যোদ্ধা সাজি আমরা। এরপর রওনা হলাম ডাউকির উদ্দেশে। এবারের গন্তব্য ‘সোনমপোডং’। এটি একটি গ্রাম যা ‘উমগট’ নদীর তীরে অবস্থিত। এখানে এসে ঠিক করলাম নদীর তীরে তাঁবুতে থাকব। নদীর কলতানে মাতোয়ারা আমরা। সকালে ঘুম থেকে উঠে উমগঠের যে সৌন্দর্য দেখি, তা ছিল বড়ই অদ্ভুত ও মায়াবী। নদীর পানি পাথরের ওপরে আছড়ে পড়ছিল, আর আমরা অপলক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম। এরপর ‘উমগঠ ঝুলন্ত ব্রিজ’ দেখে কাংছড়িতে এসে আমরা সবাই ঝরনার পানিতে গোসল করি। এভাবে শেষ হতে থাকে মেঘালয় ভ্রমণ।

মেঘালয়ের জার্নি শেষ হচ্ছে বলে সবার মনে একটা চাপা কষ্ট অনুভূত হচ্ছিল। তবু তো ফিরতে হবে, আমাদের চিরচেনা নীড়ে। এই কদিনের স্মৃতি আমাদের জীবনে স্মরণীয় হয়ে রবে। মেঘালয়ের ট্যুরিজম খাত বেশ পরিকল্পিত। সাজানো-গোছানো তাদের সব দর্শনীয় স্থান। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বাংলাদেশ সরকার ইচ্ছা করলেই আমাদের দর্শনীয় স্থানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে পারে। এতে আমাদের পর্যটন খাত আরও উন্নত হবে। আর্থিকভাবে উপকৃত হবে দেশ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..