মত-বিশ্লেষণ

মেস-সংক্রান্ত ঝামেলা: বোঝার ওপর শাকের আঁটি

মো. তৌহিদুজ্জামান বাবু: আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, যা কোনো মক্তব, মাদরাসা, স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করতে হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে শুরু করতে হয় অন্যরকম এক যাত্রা, যেখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে পাড়ি দিতে হয় দুর্গম পথ। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা স্নাতক স্তরের শিক্ষার্থীদের জীবনের দীর্ঘ একটা সময় মা-বাবা, ভাই-বোন কিংবা পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের মায়া ত্যাগ করে মানিয়ে নিতে হয় একটা অচেনা-অজানা পরিবেশকে।

শিক্ষা অর্জনের তাগিদে মায়ের আঁচল ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয় অচেনা শহরে। অবস্থান করতে হয় কোনো ছাত্রাবাস কিংবা ছাত্রী নিবাসে। তখন সবাইকে ছেড়ে এসে শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়েন অসহায়। আর এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের খেলায় মেতে ওঠেন মেস মালিক নামক একশ্রেণির লোভী মানুষ, যারা সময়ে-অসময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্নভাবে মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকেন। কখনও কখনও শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হতে হয় এসব শিক্ষার্থীকে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তাদের আচরণ এমন হলেও মহামারির সময়টায় মেস মালিকদের মানবিকতা আশা করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু প্রাণঘাতী করোনার বিশাল থাবাও তাদের মনে সহানুভূতি জাগাতে পারেনি, পারেনি তাদের নিষ্ঠুরতা দমাতে। বরং মহামারির সময়টাকেও ব্যবসার পুঁজি হিসেবে গ্রহণ করেছেন তারা। এসব মেস মালিক যে কতটা নিষ্ঠুর হতে পারেন, তার কিছু বাস্তব চিত্রÑ

২০২০ সালের ২ জুলাই বা?ড়িভাড়া দিতে বিলম্ব হওয়ায় শিক্ষার্থীর সারাজীবনের অর্জন তার সার্টিফিকেট, মূল্যবান জিনিসপত্র, বইসহ সবকিছু সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িতে তুলে দেন বাড়িওয়ালা। যখন জানতে পারল সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকা চলে এসে দেখে জিনিসপত্র কিছুই নেই, বাড়িওয়ালা সব ফেলে দিয়েছেন। নিজের এত বছরের অর্জিত সব সার্টিফিকেটের সঙ্গে মূল্যবান সব জিনিসপত্র হারিয়ে কেঁদে ওঠেন ঢাকা কলেজের স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মাদ সজীব। দীর্ঘ চার বছর ধরে থাকতেন রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকার ৪/এ, ওয়েস্ট অ্যান্ড স্ট্রিটের রুবী ভবনের নিচতলায়। শুধু সজীবই নয় মেসে থাকার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, ল্যাপটপসহ শিক্ষাজীবনে অর্জিত মূল্যবান সব সার্টিফিকেট হারিয়েছেন একই ফ্ল্যাটে থাকা আরও আট শিক্ষার্থী। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোন ধরনের নোটিস না দিয়েই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর জিনিসপত্রসহ ফ্ল্যাটে ব্যবহƒত সবকিছু বাসা থেকে বের করে তুলে দেয়া হয়েছে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িতে। আর কাজটি করেছেন বাড়িওয়ালা মুজিবুল হক ওরফে কাঞ্চন। খবর পেয়ে ওইসব শিক্ষার্থী নিজ নিজ এলাকা থেকে ফ্ল্যাটে এলেও তাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। আর পাননি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও।

২০২০ সালের ১৫ জুলাই পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সিফাতুল করিম ও ফাহিম আহমেদের তত্ত্বাবধানে ১২-১৩ শিক্ষার্থী মিলে একটি মেস বাসা ভাড়া করেন। তিনি বলেন, লকডাউনের এক মাস পর থেকেই বাসার মালিক ফোন দিয়ে ভাড়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করেন এবং সবাই পেমেন্ট দিয়ে দেন। কিন্তু মহামারি প্রকট হওয়ায় মেসের সদস্যরা দীর্ঘদিন বাড়িতে অবস্থান করায় টিউশন, খণ্ডকালীন চাকরি থেকে সবাই বিচ্যুত হয়ে পড়েন এবং মেসভাড়া দেয়ার অবস্থা থাকে না। এদিকে বাড়িওয়ালা বাসা থেকে মালপত্র বাইরে ফেলে দেয়ার হুমকি দেন বারবার, শিক্ষার্থীরা অর্ধেক ভাড়া পরিশোধের প্রস্তাব দিলেও মেস মালিক তা প্রত্যাখ্যান করেন। একপর্যায়ে মেস মালিকের হুমকি অনেকগুণ বেড়ে যায়। কোনো উপায় না পেয়ে শিক্ষার্থীরা ঢাকায় চলে যান। যদিও সেই মুহূর্তে ঢাকায় যাওয়া মানেই মৃত্যুর দিকে পা বাড়ানোর মতো অবস্থা, তবুও নিজেদের শিক্ষাসনদপত্র-সহ যাবতীয় মূল্যবান জিনিসগুলো সংরক্ষণের জন্য বেছে নিতে বাধ্য হন এই ভয়ানক সিদ্ধান্ত এবং মেস মালিককে গুনে গুনে দিতে হয় শত ভাগ ভাড়া।

২০২১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের অন্য এক শিক্ষার্থী ফারজানা হোসেন ছবি বিনোদপুর (মির্জাপুর) মাইলস্টোন স্কুলের পাশে এক ছাত্রীনিবাসে এক বছর ধরে থাকেন। কভিড মহামারিতে অন্য সবার মতো মেসের সব ভাড়া চুকিয়ে সিট ছেড়ে দেন ফারজানা হোসেন ছবি এবং নিজের বইপত্র ও অন্যান্য আসবাবপত্র রেখে যান ওই মেসে অবস্থানরত এক বান্ধবীর রুমে। কিন্তু মেস মালিক জোর করে সেই জিনিসপত্রগুলো নিজের কাছে নিয়ে যান। দীর্ঘ ১৮ মাস পর পরীক্ষার রুটিন পেয়ে রাজশাহীতে ফিরে এসে নিজের জিনিসপত্র ফিরে চাইলে মেস মালিক তার বিনিময়ে টাকা দাবি করেন, টাকা দিতে না চাইলে শিক্ষার্থীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন সেই লোভী মেস মালিক।

২০২১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রকিবুল ইসলাম রাজশাহী নগরীর বিনোদপুর (মণ্ডলের মোড়) এলাকার সুজন ম্যানশন নামে মেসে সিট বুকিং দেন এবং রুমে ওঠার কয়েক দিন পর মেস মালিক অন্য আরেকজনকে একই সিট বুকিং দেন এবং রকিবুলকে সিট ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। মালিকের এমন কথায় রাজি না হওয়ায় তার সঙ্গে অনেক দুর্ব্যবহার শুরু করেন এবং একপর্যায়ে শিক্ষার্থীকে কিল-ঘুষি মারতে শুরু করেন সেই নিষ্ঠুর মেস মালিক।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বড় অংশই নি¤œ ও নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের অনেকেই টিউশনি ও খণ্ডকালীন চাকরি করে পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার ব্যয় নির্বাহ করেন।

সজীব, ফাহিম, ছবি, রকিবুলের মতো হাজারো শিক্ষার্থী মেস মালিকের আগ্রাসনের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। স্কুল, কলেজ এমনকি বিশ্বের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও দিনের পর দিন পিষ্ট হচ্ছেন অমানবিকতা ও নির্যাতনের জাঁতাকলে। একে পড়াশোনার চাপ, তার ওপর প্রতিনিয়তমেস-সংক্রান্ত ঝামেলা এ যেন ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’।

মেস মালিকের অসাধু মনোভাব ছাত্রছাত্রীদের মনে ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব। ফলে সবসময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী। অথচ এসব শিক্ষার্থীই নিজেকে সঠিকভাবে গড়ে তুলে আসন তৈরি করছেন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয়, যেখানে বসে দেশের ভাগ্য নির্ধারণকারীর দায়িত্ব পালন করছেন নির্বিঘ্নে। তারাই দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

দেশকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষার্থীদের প্রতি। মেস মালিকেরা যেন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হন, সে ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে এমন আচরণ করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসন ওইসব ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই দূর হতে পারে এই নির্মম চিত্রগুলো। তাহলেই শিক্ষার্থীদের মুক্ত চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটবে এবং উজ্জীবিত হবে ভবিষ্যৎ। ফলে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে বিশ্ব মানচিত্রে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..