এসএমই

‘মেয়ে এখন আমার মতো হতে চায়’

পরিবারের বড় মেয়ে মাকসুদা খাতুন স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। আর দশজন সাধারণ বাঙালি মেয়ের মতোই বড় হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে কাজের প্রতি আগ্রহ ও কঠোর পরিশ্রম তাকে অন্যদের চেয়ে কিছুটা হলেও আলাদা করে তুলেছে। কেননা, তিনি নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন ‘শাবাব লেদার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। হয়েছেন স্বাবলম্বী। তার ব্যক্তিগত জীবন ও সফল নারী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শুনেছেন শিপন আহমেদ

প্রথমেই পড়ালেখা নিয়ে কিছু বলুন…

মাকসুদা খাতুন: রাজধানীতে বড় হয়েছি। গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ থেকে স্নাতক, মিরপুর বাংলা কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ও আশা ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেছি।

পড়ালেখা সম্পন্ন করে চাকরি পেয়েছিলেন। চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় এলেন কেন?

মাকসুদা খাতুন: স্নাতক প্রথম বর্ষে থাকতেই একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। অল্প বয়সের কারণে পারিপার্শ্বিক প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম করতে না পেরে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। পরে পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয় আমার। পড়াশোনা ও সংসার সামলে অলস সময় পার করতে কল্যাণপুর রিয়াজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। ব্যাংকে চাকরির জন্য চেষ্টা করতাম। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল অন্যদিকে। একটি বায়িং হাউসে এক্সিকিউটিভ অ্যাকাউনটেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করি। ধীরে ধীরে কর্মদক্ষতা বাড়াতে থাকি। বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরির অফার আসতে থাকে। পরে বিগ বস করপোরেশন নামের একটি বায়িং হাউসে ওয়েলফেয়ার অফিসার হিসেবে যোগ দিই। এরই মধ্যে সংসার আলো করে আসে নতুন অতিথি। তাকে ঠিকমতো সময় দিতে না পারার কষ্ট ও
সকাল-সন্ধ্যা অফিসের কাজকর্মে মনোযোগ দিতে না পারায় চাকরিটি ছেড়ে দিই। অন্যদিকে স্বামীর ছিল পার্টনারশিপে চামড়াজাত পণ্যের এক্সপোর্ট বিজনেস। কিন্তু পার্টনারের একচেটিয়া সিদ্ধান্তের কারণে ব্যবসায় লোকসান হতে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি একসময় বন্ধ হয়ে যায়। তবে স্বামীর ব্যবসার প্রতি ভালোবাসা ছিল আমার। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুত ও ই-কমার্সসহ ব্যবসায় উন্নয়নবান্ধব কারিগরি প্রশিক্ষণ নিই। এরপর কিছু জমানো অর্থ ও গয়না বিক্রির টাকা দিয়ে স্বামীর ব্যবসার হাল ধরি। ২০১৬ সালে রাজধানীর হাজারীবাগে প্রতিষ্ঠা করি ‘শাবাব লেদার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

এখানে কী কী পণ্য তৈরি হয়? আর কাঁচামাল কোথা থেকে সংগ্রহ করেন?

মাকসুদা খাতুন: এখানে অনেক ধরনের চামড়াজাত পণ্য তৈরি করি। এর মধ্যে রয়েছে অফিশিয়াল ব্যাগ, ওয়ালেট, ফাইল, লেডিস ব্যাগ, ম্যাসেঞ্জার ব্যাগ, লেডিস পার্টস, ব্যাকপ্যাক, বেল্ট, মাউস প্যাড, চাবির রিং, করপোরেট গিফট আইটেম, পেন হোল্ডার, পেন স্ট্যান্ড, ডায়েরি কভার, জ্যাকেট প্রভৃতি। হেমায়েতপুর থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করি। পাশাপাশি আরও কয়েকটি স্থান থেকে কাঁচামাল আনি।

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব…

মাকসুদা খাতুন: ব্যবসা মানেই প্রতিযোগিতা। তাই প্রতিনিয়ত পণ্যের মান নিয়ে গবেষণা করি। ক্রেতার পছন্দ ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিই। আমার পণ্য শতভাগ চামড়ার। কোনো আর্টিফিশিয়াল লেদার বা সিনথেটিক নেই। তবে কিছু পণ্যের বেলায় ভিন্নতা আনার জন্য জুট ও ডেনিম ফেব্রিকস ব্যবহার করছি। নিজেই ডিজাইন করি। এটাই আমার প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব।

কোথায় বিক্রি করেন? কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

মাকসুদা খাতুন: ঢাকাসহ প্রায় সব জেলায় বিক্রি করছি। সুইজারল্যান্ড, জাপান, নেপাল, গ্রিসসহ কয়েকটি দেশে রফতানিও করছি। বিভিন্ন অনলাইন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছি। আমিও অনলাইনে পণ্যের অর্ডার নিয়ে থাকি। এখন বেশ সাড়া পাচ্ছি। শুরুর দিকে একটা কাজ শেষ না হতেই চিন্তায় পড়ে যেতাম। তবে এখন কাজের চাপে ক্রেতাদের কাছ থেকে সময় বাড়িয়ে নিতে হয়।

একজন নারীর উদ্যোক্তা হওয়া কতটা চ্যালেঞ্জিং?

মাকসুদা খাতুন: নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা বা সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই বৈষম্যের শিকার হয় নারীরা। বিশেষ করে ব্যাংক ঋণ পাওয়া বেশ কঠিন। সামাজিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি পরিবার থেকেও বাধা আসে।

নতুন উদ্যোক্তার প্রতি আপনার পরামর্শ…

মাকসুদা খাতুন: ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। ধৈর্যশীল ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। কথায় ও কাজে মিল থাকতে হবে। ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের জন্য পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখতে হবে। নিজেকে সৎ ও যোগ্যরূপে তুলে ধরতে হবে। ব্যবসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পণ্যের বাজারজাতকরণ। কথায় আছে, প্রচারেই প্রসার। তাই বাজারজাতকরণের কৌশল জানতে হবে। ক্রেতা কী চান, তা বুঝতে হবে। জীবনে উন্নতির জন্য পরিশ্রমী ও সৎ হতে হবে। কাজকে ভালোবাসতে হবে তা যত ছোট হোক না কেন। সময়ের মূল্য বুঝে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

প্রত্যেক মানুষের সফলতার পেছনে কেউ না কেউ থাকেন। আপনার সফলতার পেছনে কারা রয়েছেন?

মাকসুদা খাতুন: মা আমাকে স্বপ্ন দেখাতেন। সব সময় বলতেন, কিছু একটা করো। আর স্বামীর কারণেই এ ব্যবসায় এসেছি। তাদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় আজ এ পর্যন্ত এসেছি। এছাড়া ‘এসএমই ফাউন্ডেশন’, ‘বিডিওএসএন’, ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব’, বি‘ইয়া’রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এ উদ্যোগের জন্য ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব’ গ্রুপের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ‘উদ্যোক্তা সম্মাননা ২০১৮’ দেওয়া হয়। আমার মেয়ে এখন আমার মতো হতে চায়। মনটা ভরে যায়। এটা আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রেরণা দেয়। এটাই অনেক বড় পাওয়া।

ব্যবসার পাশাপাশি আর কী করেন?

মাকসুদা খাতুন: বর্তমানে ‘উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর বাংলাদেশ’, ‘উইমেন অ্যান্ড ই কমার্স ফোরাম’, ‘নতুন প্রজন্ম’, ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব’, ‘যুব উন্নয়ন অধিদফতর’, ‘বিসিক’, ‘এসএমই ফাউন্ডেশন’, বি‘ইয়া’র-সহ নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে এমন কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত আছি।

আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা স্বপ্ন…

মাকসুদা খাতুন: পাঁচ কর্মী নিয়ে উদ্যোক্তা জীবনের যাত্রা শুরু। বর্তমানে আমার অধীনে ২৫ কর্মী রয়েছেন। সংখ্যাটি বাড়াতে চাই। অনেক কর্মসংসস্থান সৃষ্টি করা, অদক্ষদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা এবং কাজ শিখতে আগ্রহী এমন মানুষদের ইন্টার্নির সুযোগ করে দিতে চাই। সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে চাই।

 

 

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..