Print Date & Time : 23 June 2021 Wednesday 5:10 pm

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অতিমুনাফা প্রবণতা কাম্য নয়

প্রকাশ: May 5, 2021 সময়- 12:28 am

এসএম নাজের হোসাইন: ব্যাংকে না গিয়েও যে আর্থিক লেনদেন সেবা মিলবে, এমন আলোচনা ১০ বছর আগেও কল্পনার বাইরে ছিল। মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সেবা (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিং যখন শুরু হয়, তখন এই সেবার গ্রাহক নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বাস্তবতা হলো বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো সেবা এখন প্রতি মুহূর্তের আর্থিক লেনদেনের অপরিহার্য অংশ। দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখন এসব সেবার গ্রাহক। সারা দেশে এসব সেবায় নিবন্ধন হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি গ্রাহক। যদিও সক্রিয় ব্যবহারকারীর হিসাব পাঁচ কোটির কিছুটা কম। এখন মোবাইল ব্যাংকিং শুধু টাকা পাঠানোর মাধ্যম নয়, এর ব্যবহার হচ্ছে এখন সব ধরনের ছোটখাটো লেনদেনে। বিশেষ করে বিভিন্ন পরিষেবা বিল পরিশোধ, স্কুলের বেতন, কেনাকাটা, সরকারি ভাতা, টিকিট কেনা, বিমার প্রিমিয়াম পরিশোধ, মোবাইল ফোন রিচার্জ ও অনুদান প্রদানের অন্যতম মাধ্যম মোবাইল ব্যাংকিং। আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা জমা করতে এখন আর এজেন্টদের কাছেও যেতে হচ্ছে না। ব্যাংক বা কার্ড থেকে সহজেই টাকা আনা যাচ্ছে এসব হিসাবে। আবার এসব হিসাব থেকে ব্যাংকেও টাকা জমা দেয়া শুরু হয়েছে, ক্রেডিট কার্ড বা সঞ্চয়ী আমানতের কিস্তিও জমা দেয়া যাচ্ছে। আর এসবের ফলে মুঠোফোনই হাতের কাছে নিজের ব্যাংক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ৩১ জানুয়ারি এ সেবার গ্রাহক ছিল ১০ কোটি পাঁচ লাখ। এর মধ্যে সক্রিয় গ্রাহক তিন কোটি ২৪ লাখ। আর দেশজুড়ে এ সেবা দিতে এজেন্ট রয়েছেন ১০ লাখ ৪৪ হাজার। জানুয়ারিতে গড়ে দৈনিক লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। এই মাসে সব মিলিয়ে ২৯ কোটি ৯২ লাখ লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে বিকাশের গ্রাহক পাঁচ কোটি ৪০ লাখ ও রকেটের গ্রাহক তিন কোটির বেশি। এর বাইরে ডাক বিভাগের সেবা নগদের নিবন্ধিত গ্রাহক তিন কোটি ৮০ লাখ। তবে সক্রিয় গ্রাহক এক কোটি ৭৫ লাখের কাছাকাছি। প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে।

মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে নতুন এই সেবা। হাতের মুঠোফোনটিই এখন দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে নগদ টাকার চাহিদা মেটাচ্ছে। তবে মোবাইলে আর্থিক সেবাগুলোর (এমএফএস) গলাকাটা ক্যাশ আউট চার্জ আদায়ের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য এই ডিজিটাল আর্থিক সেবা আশীর্বাদ না হয়ে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা ক্যাশ আউট চার্জ কমিয়ে এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে এমএফএস প্রদানকারীদের পরামর্শ দিয়েছেন। লেনদেনের উচ্চ চার্জ গ্রামাঞ্চলের মানুষের পাশাপাশি ক্ষুদ্র এবং ছোট উদ্যোক্তাদের সেবা থেকে দূরে রেখেছে। মোবাইলের ক্যাশ আউটের উচ্চ রেটের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মধ্যবিত্ত, নতুন উদ্যোক্তা ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ।

ডিজিটাল পৃথিবীতে তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনেক বিষয়ে অনেক উদ্ভাবনী প্রক্রিয়া মানুষের হাতের মুঠোয় পুরো পৃথিবী এনে দিয়েছে। মোবাইলে আর্থিক সেবা (এমএফএস) আর্থিক লেনদেনে তেমনই একটি উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহক দ্রুত অর্থ স্থানান্তর করতে পারেন। বাংলাদেশও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এ ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত করেছে। বিশ্বব্যাপী চলমান করোনা মহামারিকালে বেশিরভাগ সেক্টরে অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক হলেও মোবাইলে আর্থিক সেবা (এমএফএস) কোম্পানিগুলো ব্যাপক প্রসার লাভ করে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা একটি কার্যকর ও অতি প্রয়োাজনীয় উদ্ভাবনী পদ্ধতি। তবে এই এমএফএস মানুষকে আর্থিক লেনদেন সহজ করে দিলেও মাঝেমধ্যে ভোগান্তির মাত্রাও বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। বর্তমানে প্রতি এক হাজার টাকার ক্যাশ আউট চার্জ ১৮ টাকা ৫০ পয়সা।

তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে শুধু এসএমএস চালাচালির লেনদেনে প্রতিহাজারে ১৮+ টাকা কেটে নেয়া কতটুকু যৌক্তিক? সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এক নির্দেশনায় এমএফএস সেবায় ভ্যাটসহ কী পরিমাণ টাকা কাটা হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট করে গ্রাহকদের জানাতে নির্দেশনা দিয়েছে। সার্ভিস চার্জ হার-সংক্রান্ত বিভ্রান্তি পরিহারকল্পে বিভিন্ন গণমাধ্যম (সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন প্রভৃতি) এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণাসহ সব ক্ষেত্রে ভ্যাটসহ সার্ভিস চার্জ হার উল্লেখ করার নির্দেশনা দিয়েছে।

দেশে যখন প্রথম মোবাইল অপারেটরগুলো কার্যক্রম শুরু করে, তখন প্রতি মিনিট কথা বলার বিল ছিল প্রায় ১০ টাকা। এক মিনিট পর এক সেকেন্ড হলেও পুরো মিনিটের টাকা দিতে হতো। এছাড়া দোকানের মাধ্যমে ঢাকার বাইরে কথা বলতে গেলে দিতে হতো ১৫ টাকা করে অতিরিক্ত চার্জ। তখন কথা বলতে অনেকটাই ভয় লাগত। মনে হতো দেশটা যেন মগের মুল্লুক! তখন মোবাইল অপারেটরগুলো কিন্তু লাভ করেছে। অথচ এখন কথা বলার চার্জ পয়সায় নেমে এলেও লাভের পরিমাণ কিন্তু কমেনি,, অধিকন্তু লাভের অঙ্ক ভারী হয়েছে। সরকারের রাজস্ব জোগানের একটি বড় অংশ জোগান দিচ্ছে মোবাইল অপারেটরদের টক টাইম খাতের ভ্যাট ও ট্যাক্স।

বিচিত্র আমাদের এই দেশ। সে কারণে ভোক্তাদের পকেট যে যেভাবেই পারে, সেভাবেই কাটছে। তার অনন্য দৃষ্টান্ত হলো ব্যবসায়ীরা চাল-ডাল, আদা-পেঁয়াজের মূল্য বাড়িয়ে, গ্যাস-বিদ্যুৎ, ওষুধ-প্যাথলজি ও চিকিৎসা সেবার মূল্য বাড়িয়ে, মোবাইলে টক টাইমের খরচ ইচ্ছামতো নির্ধারণ করে ‘যে যেভাবে পারে, সেভাবেই সাধারণ জনগণের পকেট কাটছে। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোয় যারা কর্মরত, তাদের অবহেলায় সেবার মান উন্নত এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে না। অধিকন্তু ভোগান্তি ও অভিযোগের পাহাড় ক্রমাগত বাড়ছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য বিষয়টি যেন তাদের নিয়ে মজা ও তামাশা করার মতো।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমাণে তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মোবাইল আর্থিক সেবায় চার্জের একটি সীমা নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আর্থিক ও ভোক্তা খাতের বিশেষজ্ঞরা।

তুলনামুলকভাবে ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস প্রদানকারী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের এমএফএসগুলোর তুলনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে ক্যাশ আউট চার্জ অনেক বেশি।

এমএফএস সেক্টরে নতুন নগদ ক্যাশ আউট চার্জ কমানোর ঘোষণা দিলেও অন্যরা এ বিষয়ে নীরব। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বিভিন্ন সেবার চার্জ সম্পর্কে গ্রাহকদের যথাযথভাবে জানানোর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনায় মোবাইলের মাধ্যমে টাকা পাঠানো ও সংগ্রহের চার্জের হার পরিবর্তন করলে গ্রাহকের কাছে অগ্রিম নোটিস পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট থেকে এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। এতে যেকোনো পরিষেবা দেয়ার আগে তার ধরন, প্রযোজ্য সার্ভিস চার্জের পরিমাণ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সার্ভিস চার্জের তালিকা সম্পর্কে গ্রাহকদের যথাযথভাবে অবহিত করতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশে কর্মরত সব মোবাইলে আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রোভাইডারের কাছে পাঠানো ওই সার্কুলারে বলা হয়, যেকোনো পরিষেবা প্রদানের আগে পরিষেবার ধরন, প্রযোজ্য সার্ভিস চার্জের পরিমাণ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সার্ভিস চার্জের তালিকা প্রস্তুত করে সে সম্পর্কে গ্রাহকদের যথাযথভাবে অবহিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অ্যাপ্লিকেশনে প্রদর্শন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই নির্দেশনা কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে তার নজরদারি আছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। ফলে বিষয়টি অনেকটাই ‘কাজীর গরু খাতায় আছে, গোয়ালে নেই’ সে রকম।

মানুষ যদি স্বল্প ব্যয়ে ও ভোগান্তিবিহীন প্রযুক্তির ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে কি সত্যিকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব? দেশে ১৯৮৯ সালে মোবাইল ফোনের যাত্রার শুরু থেকেই কলরেট কমানোয় অতীতের কোনো সরকারের কার্যকর ভূমিকা ছিল না। মোবাইল অপারেটররা পরস্পর ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় কলরেট কমিয়েছে। পূর্বেকার সিটিসেল একচেটিয়াভাবে সেট, সংযোগ ও কথা বলার গলাকাটা রেটের চালু করে। মোবাইল ফোনের বিস্তৃতির কারণে বর্তমানে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের সীমানা ছাড়িয়ে নি¤œবিত্ত ক্ষেতমজুর, গৃহকর্মী, ফকির ও মিসকিনের হাতেও মোবাইল সেট আছে। যৌক্তিক পর্যায়ে সেবার ব্যয় রাখা না হলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এই সেবায় ধরে রাখা কঠিন হবে।

শাসন ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক চর্চার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন মহল সরকারের কাছ থেকে নানা ধরনের সুবিধা আদায় করে। অতিরিক্ত চার্জ, ভোগান্তি আর প্রতারণার অভিযোগে জর্জরিত মোবাইল আর্থিক সেবাগুলো। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসি থেকে ক্যাশ আউট চার্জ কমানোসহ নানা নির্দেশনা দেয়া হলেও এগুলো বাস্তবায়ন অগ্রগতি তদারকি মাঠপর্যায়ে করা না হলে তার সুফল ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাবে না, যা মোবাইল ব্যাংকিং সেবার পরিধির মানোন্নয়ন ও বিস্তারে বড় প্রতিবন্ধক। তবে দেশ যখন ডিজিটাল ইকোনমির দিকে এগিয়ে চলছে, ঠিক সে সময়ে মোবাইলে কথা বলা ও মোবাইলে আর্থিক সেবায় ক্যাশ আউটের উচ্চ রেটের বোঝা কোনোভাবেই দেশের অর্থনীতির জন্য শুভ হবে না। উচ্চ সার্ভিস চার্জ দরিদ্র মানুষের জন্য অসহনীয় হওয়া ছাড়াও ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই সময় এমএফএস সেক্টরে চলমান ধারাকে অব্যাহত রাখতে এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ক্যাশ আউট চার্জ কমানো, ভোগান্তি নিরসন ও প্রতারণা বন্ধে প্রয়োজন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, এমএসএফ সেবাপ্রদানকারী ও ভোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ।

ভাইস প্রেসিডেন্ট

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

[email protected]