বাণিজ্য সংবাদ

মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব চার কোটি ছাড়িয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: দ্রুততম সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা পাঠানোর অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম এখন মোবাইল ব্যাংকিং। বর্তমানে এ সেবা ব্যবহার করে মানুষ পরিবার-পরিজন ও নিকটাত্মীয়ের কাছে বেশি টাকা পাঠাচ্ছেন। এছাড়া এ সেবার মাধ্যমে রেমিট্যান্সের অর্থ, বেতন-ভাতা ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ সবই বাড়ছে। দেশে বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবধারীর সংখ্যা চার কোটি ছাড়িয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শুধু ডিসেম্বর মাসেই দৈনিক গড়ে ৭৭৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। পুরো মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ২৩ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিসেম্বর মাসে মোবাইলে বেতন পরিশোধ করা হয়েছে ২৩৪ কোটি টাকা। এ সময় ইউটিলিটি বিল পরিশোধ প্রায় ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৮১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। আগের মাসে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হয়েছিল ১৯৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবমতে, গত বছর বছরের ডিসেম্বর মাস শেষে দেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে চার কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার দাঁড়িয়েছে, যা আগের মাসের চেয়ে প্রায় ১৪ লাখ ৫৮ হাজার বেশি। এর আগে ২০১৩ সালে দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা এক কোটির মাইলফলক অতিক্রম করে। গত বছরের এপ্রিল মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক সাড়ে তিন কোটি অতিক্রম করে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’ এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ‘রকেট’ মোবাইল ব্যাংকিং এ সেবায় এগিয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ক্যাশইন ট্রানজেকশন হয়েছে ১০ হাজার ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এ সময়ে ক্যাশ আউট ট্রানজেকশন হয়েছে ৯ হাজার ৪৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। নভেম্বর মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ক্যাশইন ট্রানজেকশন হয়েছে ৯ হাজার ২৯৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ওই মাসে ক্যাশ আউট ট্রানজেকশন হয়েছে আট হাজার ৫৫৫ কোটি ৯২  লাখ টাকা। ফলে এক মাসের ব্যবধানে ক্যাশইন ও ক্যাশ আউট ট্রানজেশন বেড়েছে ৭ দশমিক ৭২ শতাংশ ও ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ডিসেম্বর মাসে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে ট্রানজেকশন হয়েছে তিন হাজার ৩৬৮ কোটি ২১ লাখ টাকা, যা আগের মাসে ছিল তিন হাজার ১৯৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এক মাসে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে লেনদেন বেড়েছে ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

অন্যদিকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ডিসেম্বর মাসে ২৩৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বেতন পরিশোধ করা হয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় ২৭ দশমিক ১৮ শতাংশ কম। আগের মাস নভেম্বরে বেতন পরিশোধ করা হয়েছিল ৩২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এ সময় ইউটিলিটি বিল পরিশোধ প্রায় ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৮১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। আগের মাসে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হয়েছিল ১৯৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এছাড়া ডিসেম্বর মাসে অন্যান্য বিল বাবদ লেনদেন হয়েছে ৩৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, যা আগের মাসে ছিল ৩৫১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সক্রিয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যাও কিছুটা বেড়েছে। নভেম্বর পর্যন্ত সক্রিয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল এক কোটি ৫১ লাখ, যা ডিসেম্বরে বেড়ে হয়েছে এক কোটি ৫৮ লাখ। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে টানা তিন মাস কোনো ধরনের লেনদেন না হলে তা ইন-অ্যাকটিভ বা নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। আর তিন মাসের মধ্যে একটি লেনদেন হলেও তা সক্রিয় হিসেবে বিবেচিত। অবশ্য বড় কোনো অনিয়ম না পাওয়া গেলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে না ব্যাংক। ব্যাংকগুলো সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিং করতে পারে না বিধায় এ কার্যক্রমের জন্য এজেন্ট নিয়োগ করে। নির্ধারিত কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এজেন্ট নিয়োগ দেয় ব্যাংকগুলো। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংকগুলোর মনোনীত এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাত লাখ ১০ হাজার ২৬ জন। নভেম্বর পর্যন্ত এজেন্টর সংখ্যা ছিল ছয় লাখ ৯৪ হাজার ৬২৯ জন।

এদিকে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে বেশ কিছু নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে একজন যে কোনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় একটি মাত্র হিসাব রাখতে পারবেন। যাদের একাধিক মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব চলমান রয়েছে, তা দ্রুত বন্ধ করে দিতে হবে। সম্প্রতি জারি করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, কোনো গ্রাহকের একই জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্টকার্ড বা অন্য কোনো পরিচয়পত্রের বিপরীতে একাধিক মোবাইল হিসাব থাকলে ওই গ্রাহকের সঙ্গে আলোচনা করে তার বেছে নেওয়া যে কোনো একটি মোবাইল হিসাব চালু রেখে অন্য হিসাবগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে আলোচনা করে এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ দুরূহ হলে, যে হিসাবটিতে সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে, তা চালু রেখে অন্য হিসাবগুলো বন্ধ করতে হবে।

জানা গেছে, দেশে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রথম শুরু হয় ২০১০ সালের ৩১ মার্চ। এরপরের বছরে এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত গাইডলাইন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবশ্য পরবর্তী সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনে ঝুঁকি মোকাবিলায় আরেকটি নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেশের ২০টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং করার অনুমোদন পেলেও ১৮টি ব্যাংক বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং চালু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘বিকাশ’, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ‘রকেট’, মার্কেন্টাইল ব্যাংকর ‘মাই ক্যাশ’, ওয়ান ব্যাংকের ‘ওকে ব্যাংকিং’, ব্যাংক এশিয়ার ‘হ্যালো ব্যাংকিং’ যমুনা, কমার্স ও রূপালী ব্যাংকের ‘শিওর ক্যাশ’, আইএফআইসির ‘বাংলায় মোবাইল ব্যাংকিং’, প্রাইম ব্যাংকের ‘ইজি ক্যাশ’, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ‘ইউ ক্যাশ’, ইসলামী ব্যাংকের ‘এম ক্যাশ’, এক্সিম ব্যাংকের ‘এক্সিম ক্যাশ’, ট্রাস্ট ব্যাংকের ‘মোবাইল মানি ব্যাংকিং’, সাউথ-ইস্ট ব্যাংকের, ‘টেলিক্যাশ’। এছাড়া আরও কয়েকটি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে।

জানা গেছে, বর্তমানে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের মাধ্যমে সাত ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স, ক্যাশইন ট্রানজেকশন, ক্যাশ আউট ট্রানজেকশন, পিটুপি ট্রানজেকশন, বেতন বিতরণ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ।

এছাড়া আরও কিছু সেবা আছে, যেগুলো সরাসরি উল্লিখিত ছয়টি ক্যাটাগরির কোনোটার অন্তর্ভুক্ত নয়, এ ধরনের সেবাসমূহকে অন্যান্য ক্যাটাগরির আওতায় বিবেচনা করা হয়। যেমনÑস্কুল-কলেজের টিউশন ফি পরিশোধ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সাল নাগাদ দেশে মোবাইল ব্যাংকিং বিল পেমেন্ট সুবিধা গ্রহণকারীর সংখ্যা দাঁড়াবে দুই কোটি ২০ লাখ। এ সময়ে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় পাঁচ কোটি, যা দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৪৭ শতাংশ। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শুধু টাকা পাঠানো বা উওানো নয়, কেনাকাটা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, বেতনভাতা বিতরণ, সরকারি অনুদানপ্রাপ্তি, মোবাইলে তাৎক্ষণিক ব্যালান্স রিচার্জসহ বিভিন্ন সেবাও এখন হাতের মুঠোয়। এসব কাজ করতে যেতে হবে না ব্যাংকের কোনো শাখায় অথবা অন্য কোথাও। মোবাইল ব্যাংকিং এখন দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে অতি পরিচিত একটি প্রক্রিয়া হিসেবে স্বীকৃত। এর মাধ্যমে আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে দেশের কোটি মানুষ।

কমানো হয়েছে লেনদেনের সীমা। এদিকে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দৈনিক ও মাসিক লেনদেনের সীমা আরও কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার অজুুহাতে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট এ-সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুসারে, একজন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক একবারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। আগে এ হার ছিল ২৫ হাজার টাকা। এখন থেকে গ্রাহক দৈনিক দুবার এবং মাসে ১০ বার এ সেবা নিতে পারবেন, যা আগে ছিল দৈনিক তিনবার এবং মাসে ১০ বার। একই সঙ্গে দৈনিক জমার সীমাও পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে এখন থেকে দিনে সর্বোচ্চ দুই বারে ১৫ হাজার টাকা করে পাঠানো যাবে, যা মাসে সর্বমোট ২০ বারে এক লাখ টাকার বেশি হতে পারবে না। আগে দিনে পাঁচ বারে ২৫ হাজার টাকা এবং মাসে সর্বোচ্চ ২০ বারে দেড় লাখ টাকা করে জমা করা যেত। এছাড়া একটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে টাকা জমার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই হিসাব থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকার বেশি নগদ উত্তোলন করা যাবে না। পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি হিসাব থেকে অন্য ব্যক্তির হিসাবে আগের মতো প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা এবং মাসে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা স্থানান্তরের সীমা বলবৎ রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অপব্যবহার রোধে এবং এ সেবার সুশৃঙ্খল ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতেই লেনদেনের সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারে সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও হুন্ডিদের দৌরাত্ম্য রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যাংক কর্মকর্তারা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারে হুন্ডি হওয়ার অভিযোগ করেন। এতে করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় লেনদেনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে হুন্ডি কমানোর চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..