সারা বাংলা

মোবারকগঞ্জ চিনিকলে লোকসান বাড়ার শঙ্কা

আখ চাষ নেমেছে অর্ধেকে

নয়ন খন্দকার, কালীগঞ্জ: ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে অবস্থিত মোবারকগঞ্জ চিনিকলের আওতাধীন ছয়টি সাবজোনে আখ চাষ কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে আসন্ন আখ মাড়াই মৌসুমে লোকসান বাড়ার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
সময়মতো কৃষকদের আখের দাম পরিশোধ করতে না পারা ও দীর্ঘমেয়াদি ফসল চাষে প্রান্তিক চাষিদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলাসহ বহুবিধ কারণে দিন দিন আখ চাষ কমে যাচ্ছে। ফলে চলতি মৌসুমে চাষিদের পাঁচ কোটি ৬৮ লাখ টাকার ঋণ প্রদান ও আখের দাম বৃদ্ধি করার পরও আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি। ফলে মিলটিকে আসন্ন মৌসুমেও কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হবে বলে মিলসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
মিল সূত্রে জানা গেছে, ২০১০-১১ মৌসুমে ১২ হাজার একর জমিতে আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। অর্জন হয় সাত হাজার ৪৫৪ একর। ২০১১-১২ মৌসুমে ১২ হাজার একর জমিতে আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেখান অর্জন হয় সাত হাজার আট একর। ২০১২-১৩ মৌসুমে ১১ হাজার একর জমিতে আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে অর্জন হয় আট হাজার ৫০০ একর। ২০১৩-১৪ মৌসুমে ১১ হাজার একর জমিতে আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেখান অর্জন হয় তিন হাজার ৩২৬ একর। ২০১৪-১৫ মৌসুমে মিলটি ১০ হাজার একর জমিতে আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। সেখানে অর্জন হয় চার হাজার ৮৮৩ একর।
২০১৫-২০১৬ মৌসুমে ১০ হাজার ৫০০ একর জমিতে আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে অর্জন হয় চার হাজার ৯৪১ একর। ২০১৬-১৭ মৌসুমে আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৯ হাজার একর। সেখানে অর্জিত হয় ছয় হাজার ৮০ একর। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ মৌসুমে আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১০ হাজার ৫০০ একর। সেখানে অর্জিত হয়েছে পাঁচ হাজার ৭৭২ একর। গত আটটি মাড়াই মৌসুমের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোনো মৌসুমেই আখ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
দিন দিন আখ চাষ কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে মোবারকগঞ্জ চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) নঈম সিদ্দিকী জানান, কৃষকরা মিলে যে আখ বিক্রি করছেন ঠিকমতো চিনি বিক্রি না হওয়ায় সেই টাকা কৃষকদের সময়মতো পরিশোধ করা যাচ্ছে না। তাছাড়া বর্তমানে কৃষকরা স্বল্পমেয়াদি ফসল করতে আগ্রহী হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ফসল চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এসব কারণে আখ চাষ কমে যাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও জানান, চিনিকলটিতে আগে আটটি সাবজোন ছিল। বর্তমানে সেটি কমিয়ে ছয়টি (যশোর, চৌগাছা, ঝিনাইদহ, হরিণাকুণ্ডু, মিলগেট-এ ও মিলগেট-বি) সাবজোনে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি সাবজোনে দুজন কর্মকর্তা রয়েছেন। এছাড়া ইউনিট পর্যায়ে রয়েছেন একজন সিডিএ। তারা সার্বক্ষণিক কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ, দলীয় সভা, উঠান বৈঠক, পোস্টার, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং এর মাধ্যমে কাউন্সিলিং চালিয়ে যাচ্ছেন।
আখ চাষিদের স্বার্থ বিবেচনা করে ২০১৮-১৯ আখ মাড়াই মৌসুম থেকে মিল গেট ও আখ ক্রয় কেন্দ্রে মণপ্রতি ১৫ টাকা বেশি দরে আখ কেনা হবে। গত ২০১৭-১৮ আখ মাড়াই মৌসুমে মিল গেটে আখ কেনা হয়েছে প্রতি মণ (৪০ কেজি) ১২৫ টাকা। আর বহিঃকেন্দ্রে প্রতি মণ (৪০ কেজি) ১২২ টাকা ৩৬ পয়সা দরে।
আসন্ন ২০১৮-১৯ আখ মাড়াই মৌসুমে মিল গেট এলাকায় প্রতি মণ ১৪০ টাকা দরে এবং বহিঃকেন্দ্রে প্রতি মণ ১৩৭ টাকা ৩৬ পয়সা দরে ক্রয় করা হবে। অর্থাৎ আসন্ন মৌসুম থেকে আখ চাষিরা মণপ্রতি ১৫ টাকা করে আখের দাম বেশি পাবেন।
এ ব্যাপারে মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউসুফ আলী শিকদার জানান, কৃষকদের আখ চাষে ফিরিয়ে আনার জন্য মণপ্রতি আখের দাম ১৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া পূর্জি দুর্নীতি প্রতিরোধে এখন থেকে মোবাইল ফোনে তাদের আখ বিক্রির মেসেজ দেওয়ার পদ্ধতি চালু হয়েছে। ওজনে চুরি প্রতিরোধে ওজন মাপার ডিজিটাল যন্ত্র কেনা হয়েছে। যাতে কৃষকরা ওজন স্বচোখে দেখতে পারেন। এছাড়া তাদের পেমেন্টও মোবাইল ফোনের শিউর ক্যাশের মধ্যেমে দেওয়া হবে। আখ বিক্রির টাকার নেওয়ার জন্য তাদের আর এখন থেকে মিলে আসতে হবে না। তবে ঠিকমতো চিনি বিক্রি না হওয়ায় অনেক সময় তাদের আখের দাম পরিশোধ করতে একটু দেরি হচ্ছে। তাছাড়া কৃষকরা এখন সবজি চাষের প্রতি ঝুঁকে পড়েছেন।
তিনি আরও জানান, ঝড়, বৃষ্টি, বন্যায় অন্য ফসলের ক্ষতি হলেও আখের তেমন ক্ষতি হয় না। আখ রোপণ যে লাভজনক ফসল সেটা কৃষকদের বুঝতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। আখের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। আশা করা যায় আগামী মৌসুম থেকে আখ রোপণ বৃদ্ধি পাবে।

সর্বশেষ..