দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

মোহসেন ফাখরিজাদেহ হত্যা যুদ্ধের উসকানি

জিকে সাদিক: আরব দেশগুলো ও মুসলিম বিশ্ব ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান বাদে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে নাÑমধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে এমন র‌্যাডিকেল ধারণা বিশেষজ্ঞ মহলে ছিল। এখন সে ধারণায় পরিবর্তন আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আগে কমোন শত্রু ছিল ইসরাইল। এখন আরব দেশগুলোর কমোন শত্রু হচ্ছে ইরান। ভাবা হতো আরব দেশগুলো হয়তো কখনোই ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান না হলে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে না। কিন্তু এখন ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিকে পাশ কাটিয়ে আরব দেশগুলো ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি আরব দেশগুলো ফিলিস্তিন-ইসরাইল সমস্যা নিয়ে চিন্তিত নয়। তারা এখন দেশের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক জাগরণ ও ইরানের প্রভাবকে ভয় করছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও আরব দেশগুলোর সাধারণ শত্রু হচ্ছে ইরান। দেশটির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো অস্বস্তিতে আছে এবং ইসরাইল তার অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তিত। তেমনি ইরানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিকরণ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার রোধ করা না গেলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকেও নীতিনির্ধারকের ভূমিকা থেকে বিদায় নিতে হবে। তাই আরব-ইরসাইল-মার্কিন স্বার্থ রক্ষার অন্যতম উপায় হচ্ছে ইরানের প্রভাব খর্ব করা, সামরিক দিক থেকে ইরানকে শক্তিহীন করা এবং দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পতন ঘটানো।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে। আগামী জানুয়ারি মাসেই তাকে হোয়াইট হাউস ছাড়তে হবে। পুরো মেয়াদ জুড়ে তিনি ইসরাইলের নানা অন্যায্য দাবির স্বীকৃতি দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিরীতিকে তোয়াক্কা না করে তিনি গুলান মালভূমিতে ইসরাইলের দখলদারিত্বের স্বীকৃতি দিয়েছেন, জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তর করেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে ‘ডিল অব সেঞ্চুরি’র মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে ইসরাইলের স্বার্থকে সমুন্নত করেছেন এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার দাবিকে অর্থনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চেষ্টা করেছেনÑযার ফল ভোগ করবে আরব, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রভাব হ্রাস করতে, দেশটির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি হ্রাস করতে এবং অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনদের পতন ঘটাতে ২০১৫ সালে দেশটির সঙ্গে স্বাক্ষরিত ছয় জাতির পরমাণু চুক্তি থেকে একতরফাভাবে নিজেদের প্রত্যাহার করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ও আরব দেশগুলো ট্রাম্পের সেই উদ্যোগকে স্বাগত জানান। ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধানোর চেষ্টাও করেছেন। এ বছরের শুরুতেই ট্রাম্পের নির্দেশে ইরাকের এক বিমানবন্দরে হামলা করে ইরানের অন্যতম সমরবিদ কাসেম সুলাইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। জেনারেল কামেস সুলাইমানি ছিলেন ইরানে খামেনির পর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তিনি নিজের কাজের জন্য সরাসরি খামেনির কাছে জবাবদিহি করতেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক প্রভাব বৃদ্ধির মূল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী ছিলেন সুলাইমানি। ট্রাম্প তাকে হত্যার মাধ্যমে ইরানের সমরশক্তির বৃদ্ধির লাগাম টানতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সুবিধা করতে পারেননি। বরং এই হত্যাকাণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাই সমর্থন করেনি। ইরান এই হত্যাকাণ্ডের কড়া জবাব দেয়ার কথা বললেও এখনও সে রকম কিছু করেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন চাচ্ছে ইরানকে উসকানি দিয়ে যুদ্ধে জড়াতে, যার ফলে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা ট্রাম্প প্রশাসনকে সহায়তা করবে। ট্রাম্প ন্যাটোকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করারও সুযোগ পাবেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের প্রতি মদত এবং মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করার যে অভিযোগ ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন করে আসছে, সেটাও হালে পানি পাবে। কিন্তু ইরান তাৎক্ষণিকভাবে সে ফাঁদে পা দেয়নি।

অনেক বিশ্লেষক বলছেন, গত ২৭ নভেম্বর ইরানের অভ্যন্তরে পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ হত্যাও ইরানকে যুদ্ধে জড়ানোর উসকানি। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেন জয়ী হয়েছেন। ইরান ইস্যুতে বাইডেন ট্রাম্পের নীতির বিরোধী। অনেকে ভাবছেন বাইডেন হয়তো আবার ছয় জাতির সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তির প্রতি সমর্থন দেবেন বা এরকম কিছু একটা করবেন। ইরানও বাইডেনের প্রতি আশাবাদী। এর ফলে ইসরাইল ও আরব দেশগুলো বেশ উদ্বিগ্ন। আরব দেশগুলো তাদের ‘একচেটিয়া সমর্থক মিত্র’ ট্রাম্পকে হারাচ্ছে। অন্যদিকে কট্টর ইরানবিদ্বেষীয় মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিধর রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে লম্বা সময় ধরে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে আন্দোলন চলছে। তার প্রতি নেসেটে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়েছে। ফলে নেতানিয়াহুকেও ক্ষমতা ছাড়তে হবে। হয়তো ইসরাইলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ইরান ইস্যুতে আরব দেশগুলো নেতানিয়াহুর মতো একচেটিয়া সমর্থন পাবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন, ইসরাইল প্রশাসন ও আরব দেশগুলোর জন্য এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করা প্রয়োজন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ও ইসরাইল প্রধানমন্ত্রী তাদের পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করেন। আগামী জানুয়ারির মধ্যে এত ত্বরিত গতিতে বিশেষ কৌশল করে ইরানকে ফাঁদের ফেলতে ঠাণ্ডা মাথার কোনো পদক্ষেপ নেয়া যতটা সহজ, তার চেয়ে অনেক বেশি সহজ একটা যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়া।

সমরবিদ কাসেম সুলাইমানিকে সরাসরি ট্রাম্পের নির্দেশে হত্যা করা হয়েছিল। সুলাইমানি হত্যার জন্য সিআইএ’কে মোসাদের বিশেষ সহযোগিতার কথা তখন ইরানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছিল। কিন্তু পরমাণু বিজ্ঞানী ফাখরিজাদেহ হত্যার দায় এখনও কেউ স্বীকার করেনি। তবে ইরানের দাবি ইসরাইল এই হত্যার সঙ্গে জড়িত। ২০১৮ সালে নেতানিয়াহু এক অনুষ্ঠানে মোহসেন ফাখরিজাদেহর ছবি দেখিয়ে তাকে ‘স্মরণ রাখার’ কথা বলেছিলেন। এর আগে ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ইরানের বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী হত্যার সঙ্গে ইসরাইলের সংশ্লিষ্টতা ছিল। ইসরাইল এসব হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে একদিকে যেমন ইরানকে যুদ্ধের উসকানি দিচ্ছে, তেমনি ইরানের সমরশক্তি বৃদ্ধি ঠেকাতে চেষ্টা করছে। ইরান যুদ্ধে না জড়ালেও তাদের সামরিক শক্তি ঈর্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি করে চলছে।

গত ২৭ নভেম্বর পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ হত্যার পেছনে ইরানকে যুদ্ধের উসকানি দেয়া ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ঠেকানোর চেষ্টা কাজ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে বাইডেন প্রশাসন ও নেতানিয়াহু-পরবর্তী ইসরাইল প্রশাসন ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা থেকে সরে এসে যেন আলোচনার টেবিলে বসতে না পারে, তা বাস্তবায়ন করা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সমঝোতা আলোচনা ইসরাইল ও আরব দেশগুলোর কাছে অসন্তুষ্টির বিষয়। ইসরাইল চাচ্ছে আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে ফিলিস্তিনকে ট্রাম্পের ‘ডিল অব সেঞ্চুরি’ মেনে নিতে বাধ্য করা, কিন্তু ইরানের জন্য সেটা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে আরব দেশগুলো ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তারা ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব নিয়ে বেশি শঙ্কিত। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে ইসলামকে দেশে দেশে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের অন্যতম সমর্থক হচ্ছে ইরান। আরব দেশগুলো এই রাজনৈতিক ইসলামকে তাদের বর্তমান ক্ষমতা কাঠামোর অস্তিত্বের জন্য ভয় করছে, কারণ এর ফলে গণতান্ত্রিক জাগরণের মাধ্যমে বর্তমানের রাজতন্ত্র বিলোপ হবে। তাই আরব দেশগুলো ইরানকে যেভাবে হোক মোকাবিলা করতে মরিয়া। আরব দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইইউ) সবচেয়ে বেশি অস্ত্র কিনে থাকে। প্রযুক্তিতেও উন্নতি করছে। সৌদি আরব পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকেও হাঁটছে। এত সব আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ইরান।

আরব-ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন মিলে ইরানকে যেভাবে চেপে ধরে যুদ্ধের উসকানি দিচ্ছেÑইরান সেক্ষেত্রে কতটা ধৈর্যের পরিচয় দিতে পারে এবং কতটা কৌলশগতভাবে এর জবাব দিতে পারে, সেটার ওপর নির্ভর করছে দিন শেষে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরান টিকবে, নাকি আরব-ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র টিকবে।

ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..