দুরে কোথাও

ম্যানিয়াংপাড়ার পথে

আট-দশ কদম যেতে না যেতেই পায়ের উরুর মাংসপেশিতে টান পড়ল (ক্র্যাম্প করল)। প্রথমে ডান পায়ে। এরপর বাঁ পায়ে। সাড়ে ৬টা কি ৭টার মতো বাজে, দিনের আলো মিলিয়ে গেছে ঢের আগে। জ্যোৎস্নার আলোয় গাইড পালে মুরংসহ আমরা পাঁচ পর্যটক পাহাড়ের নিস্তব্ধতার চাদর ভেদ করে হাঁটছিলাম ম্যানকিউপাড়ার পোড়া জুম ক্ষেতের মধ্য দিয়ে। চারপাশে ধোঁয়া। মাঝেমধ্যে কিছু গাছে তখনও আগুন জ্বলছিল। চারপাশ থেকে ঠিকড়ে বেরিয়ে আসছিল লাল আভা, কেমন যেন একটা অপার্থিব পরিবেশ। উপায় না দেখে পথেই শুয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছিল আমি আর এক পাও সামনে এগুতে পারব না। মাসল ক্র্যাম্পের বাজে অভিজ্ঞতা যাদের রয়েছে, শুধু তারাই বুঝতে পারবেন এ ব্যথার তীব্রতা কতটা হতে পারে।
১৩ কিলো থেকে রওনা দেওয়ার পর প্রথম যে পাড়ায় আসি, তার এক কারবারি ম্যানপই মুরং। ৫ পরিবারের ছোট্ট একটা পাড়া। পাড়ার মুখেই ম্যানপই মুরংয়ের সঙ্গে দেখা হয়। ম্যানকিউপাড়ার রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, আমরা ঠিক রাস্তাতেই আছি। আমাদের খাবার পানি প্রায় শেষ হয়ে আসছিল। তার কাছে জানতে পারি পাশেই একটা ছড়া আছে। সেখানে পাই পালে মুরংকে। তিনি জানালেন, তার আবাসস্থল ম্যানকিউপাড়ায়। তিনি সেদিকে যাচ্ছেন। আমরা মনে সাহস পেলাম। এ রকম পাহাড়ি নির্জন পথে একজন স্থানীয় সঙ্গী পাওয়াটা সৌভাগ্যই বটে।
ছড়ার শীতল পানিতে হাত-মুখ ধোয়ার পর আমরা পথের সব ক্লান্তি ভুলে গেলাম। সকাল থেকে আমরা কেউই তেমন কোনো ভারী খাবার খাইনি। তাই সঙ্গে থাকা খেজুর ও মোয়া খেয়ে গাইডের সঙ্গে অগ্রসর হলাম ম্যানকিউপাড়ার পথে। পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ। একবার পাহাড়ের মাথায় ওঠো, পরক্ষণে আবার নিচে। তবে পথিমধ্যে বেশ কয়েকটি ছড়া থাকায় প্রয়োজনমতো পানি সংগ্রহ করা যাচ্ছিল। আর ছড়ার শীতল পানির পরশ ছিল পথের ক্লান্তি দূর করার মহৌষধ। পাড়ায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকাল হয়ে গেল।
৩০ পরিবারের বেশ বড়সড় পাড়া এ ম্যানকিউ। পাহাড়ের ঢালে ঢালে একেকটি পরিবার। যত্রতত্র কিছু আবর্জনা দেখা গেলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো কমতি নেই। চোখ জুড়িয়ে যায় নিমিষে। পাশেই একটা মাঠ। আমরা চাচ্ছিলাম, আজ রাতে এখানেই তাবু ফেলব। পাড়ায় থাকার জন্য অনুমতি নিতে পালে মুরংসহ গেলাম পাড়ার কারবারি লংনান মুরংয়ের কাছে। লংনান মুরং তার নাতনি তুং মুরংসহ এগিয়ে এলেন। আন্তরিকভাবে কথা বললেন আমাদের সঙ্গে। খেজুর, মোয়া ও খুরমা দিয়ে লংনান মুরংসহ সেখানেই আমরা বৈকালিক নাশতা সারলাম।
জানতে পারলাম, এখান থেকে ম্যানিয়াংপাড়া চার ঘণ্টার পথ। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার একটি স্থান এ ম্যানিয়াং পাড়া। প্রথমে একটা ঝিরি আছে। এরপর আর কোনো ঝিরি নেই। তাই যত বেশি সম্ভব পানি বহন করতে হবে। দিনের বেলা রোদের মধ্যে এ পথে ট্রেকিং করা বেশ কষ্টসাধ্য। পালে মুরংও রাজি আছেন গাইড হিসেবে আমাদের সঙ্গে ম্যানিয়াংপাড়া পর্যন্ত যেতে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ম্যানিয়াংপাড়া যাওয়ার পথে নামার।
পুরো তিন মাস দুই দিন পর পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করছি। তার ওপর তাঁবু। পাঁচ দিনের খাবার, পানি ও অন্য প্রয়োজনীয় জিনিসসহ ৩০ কেজির চেয়ে বেশি ওজনের ব্যাগ পিঠে। সময় যত গড়াচ্ছিল আমরা তত ক্লান্ত হয়ে পরছিলাম। পা যেন অসাড় হয়ে আসছিল। আমাদের গন্তব্য এক হাজার ৯৫০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত ম্যানিয়াং পাড়া। খাড়া পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে হচ্ছিল। পরক্ষণেই আবার খাড়া ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আবার ওপরে ওঠা। কোনোক্রমে পা পিছলালে একদম খাদের নিচে। এর মধ্যে সূর্য অস্ত গেল। আকাশে দেখা দিল রুপালি থালার মতো চাঁদ। আমাদের বারবার বিশ্রাম নিতে হচ্ছিল। পথের মাঝে বাঁশের তৈরি বসার জায়গা পেয়ে সবাই বসে সঙ্গে থাকা খাবার ও স্যালাইন খেলাম। ঠাণ্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে আসছিল, ওখানেই শুয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। উঠে পা বাড়াতেই বুঝলাম শরীর ঠাণ্ডা হওয়ায় পা উঠতে চাচ্ছে না, মাসল ক্র্যাম্প করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ওয়ার্ম আপ করে, স্ট্রেচিং করে পা বাড়ালাম।
এ সময় ভয়ংকর সে যন্ত্রণাদায়ক ঘটনাটা ঘটল। পায়ের উরুর মাংসপেশিতে টান ধরল। প্রথমে ডান পায়ে, পরে বাঁ পায়ে। কিছুতেই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না। আমরা হাঁটছিলাম ম্যানকিউ পাড়ার পোড়া জুম ক্ষেতের মধ্য দিয়ে। চারপাশে ধোঁয়া। মাঝেমধ্যে কিছু গাছ তখনও জ্বলছিল। উপায় না পেয়ে পথে শুয়ে পড়লাম। আর একপাও সামনে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল না। নিজের অজান্তে ব্যথায় চোখের কোনা দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল পোড়া জুম ক্ষেতে। চাঁদের আলোয় তা কারও চোখে পড়ল কি না জানি না। পড়লেও কারও কিছু করার ছিল না।
দীর্ঘ ট্রেকিংয়ে সবাই ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত। একবার ভাবলাম, আমি আর পারব না। পরক্ষণে মুষ্টিবদ্ধ হাতে পরাজিত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। নিজেই ম্যাসেজ, এরপর স্ট্রেচিং, অতঃপর ভলিজেল মেখে পা বাড়াই আমার জীবনের সবচেয়ে ব্যথাময় ও কষ্টকর ট্রেকিংয়ে। প্রতি পদক্ষেপে কী পরিমাণ ব্যথা সহ্য করতে হয়েছে, তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। চোখের জল ও গায়ের ঘামে দেহ ভিজিয়ে, পোশাক ভিজিয়ে, অতঃপর পথ ভিজিয়ে অগ্রসর হই সামনের দিকে। সে চোখের জলের সঙ্গে কত অগণিত জাগতিক ভ্রান্ত কষ্ট যে পথে ফেলে এসেছি, তা আর ফিরে দেখতে চাই না। (চলবে)

শাহ জামাল চৌধুরী রেয়ার

সর্বশেষ..