দিনের খবর সারা বাংলা সুস্বাস্থ্য

যবিপ্রবির কম খরচে কভিড-১৯ শনাক্তকরণ পদ্ধতি আবিষ্কার

সাইবারগ্রিন

মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর: যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) একদল গবেষক তুলনামূলক কম খরচে কভিড-১৯ শনাক্তে ‘সাইবারগ্রিন’ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। এ পদ্ধতিতে কভিড শনাক্ত করতে প্রতি নমুনার জন্য ১৪০ টাকার মতো খরচ হবে। এর মধ্যে আরএনএ এক্সট্রাকশন কিট ১০ টাকা, আরটি-পিসিআর কিট ১২০ টাকা, প্রাইমার তিন টাকা ও অন্য খরচ সাত টাকা। এ পরীক্ষায় সময় লাগবে মাত্র ৯০ মিনিট। একটি মাত্র টিউবে এ পদ্ধতিতে কভিডের বর্তমান ধরনগুলো শনাক্ত করা সম্ভব।

গতকাল সোমবার যবিপ্রবির প্রশাসনিক ভবনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও জিনোম সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন নতুন এ উদ্ভাবনের ঘোষণা করেন।

লিখিত বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সাইবারগ্রিন পদ্ধতিতে কভিড শনাক্তের সেনসেটিভিটি প্রচলিত অন্য কিটের সমপর্যায়ের। গবেষণাটি প্রিপ্রিন্ট আকারে ‘সবফৎীরা’ সার্ভারে পাওয়া যাচ্ছে, এটি পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের সহায়তা পেলে আমরা এ গবেষণা কাজে লাগিয়ে সহজে ও কম খরচে কভিড শনাক্ত করতে পারব।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও জিনোম সেন্টারের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ বলেন, বায়ো-ইনফরমেটিকস টুলের মাধ্যমে আমরা দেখেছি, বর্তমানে সংক্রমণশীল কভিডের নানা ধরন শনাক্ত করা সম্ভব। শতাধিক নমুনা পরীক্ষা করে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যাংক নোটে কভিডের আরএনএর উপস্থিতির বিষয়ে এক গবেষণাপত্রের সূত্র ধরে অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের গবেষক দল দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাপ্ত ব্যাংক নোটে ভাইরাসের আরএনএর উপস্থিতি পেয়েছেন। গবেষক দল ব্যাংক নোটে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত ভাইরাসের এন-জিনের উপস্থিতি ও ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত ওআরএফ জিনের স্থায়িত্ব শনাক্ত করতে পেরেছেন। গবেষণাপত্রটি ইতোমধ্যে একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

ভারতে নতুন ধরন আমাদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘যশোর সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এবং সাম্প্রতিক সময়ে কভিডের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় আমাদের গবেষক দল সাম্প্রতিক নমুনাগুলো থেকে ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টগুলো হোল জিনোম সিকুয়েন্সিং এবং স্পাইক প্রোটিনের সিকুয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে চিহ্নিত করেছেন। ইতোমধ্যে পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স জিএসআইডি ডেটাবেজে জমা দেয়া হয়েছে।’

যবিপ্রবির জিনোম সেন্টারে গত বছর ১৭ এপ্রিল থেকে কভিড পরীক্ষা শুরু করে এর মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, আমাদের গবেষকরা গত মার্চ ও এপ্রিলে এ অঞ্চলে সংক্রমণ সৃষ্টিকারী ১০০টির মতো ভাইরাসের নমুনার স্পাইক প্রোটিন সিকোয়েন্স করেছেন। বিগত দুই মাসের ভাইরাসগুলোর মধ্যে উচ্চ সংক্রমণ ক্ষমতাসম্পন্ন সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া বিগত দুই মাসের নমুনায় আমরা সাউথ আফ্রিকান, মেক্সিকান, আমেরিকান ও যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পেয়েছি। এছাড়া আমরা স্পাইক প্রোটিনে কিছু বিরল মিউটেশন পেয়েছি, যা এ অঞ্চলে এখনও দেখা যায়নি। সে মিউটেশনগুলোর প্রভাব নিয়ে আমরা কাজ করছি। এ ধরনের মিউটেশনগুলো সংক্রমণ ক্ষমতার ওপর কিংবা রোগের ভয়াবহতার ওপর কেমন প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে গবেষণা চলছে।

অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, কভিডকাল কবে শেষ হবে তা অনিশ্চিত। আমাদের দেশে যেমন কভিড শনাক্ত, চিকিৎসা ও টিকাদানের ব্যবস্থা করা জরুরি, ঠিক তেমনি পরিবর্তনশীল এ ভাইরাস নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণাও জরুরি। একটি নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নিজস্ব ল্যাবে কভিড পরীক্ষার পাশাপাশি চলমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের সৃজনশীল গবেষণা করা নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। পাশাপাশি আমি আরও জানাতে চাই, ভবিষ্যতে বিএসএল-৩ ল্যাবরেটরি স্থাপন করে ভ্যাকসিন তৈরিসহ আরও উচ্চমানের গবেষণা করতে আমাদের গবেষণা দল প্রস্তুত রয়েছে।

জানা গেছে, এ মহাদুর্যোগে যশোর ও যশোর-সংলগ্ন মাগুরা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, সাতক্ষীরার কভিড সন্দেহভাজনদের নমুনা শনাক্তের কাজ করে আমরা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। কভিডের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ যুদ্ধে শামিল হওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। এ কাজটি অগ্রসর করতে সহায়তার জন্য আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সেলিনা আক্তার, পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শিরিন নিগার, বায়ো-মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান ড. হাসান মো. আল-ইমরান, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শোভন লাল সরকার, গবেষক তনয় চক্রবর্তী প্রমুখ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..