এসএমই

যমুনার ঘাট এখন যেন লালগালিচায় সাজানো

লাল মরিচ ঘাটটিকে অপরূপ করে তুলেছে। নবসৌন্দর্যে সুন্দর হয়ে উঠেছে চারপাশ। দূর থেকে দেখে মনে হয়, ঘাঁটটিতে লালগালিচা বিছানো রয়েছে। কাছে গিয়ে দেখা যায় লাল মরিচ!

বগুড়ায় যমুনার পানি নেমে যাওয়ার অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে চরাঞ্চলের মরিচচাষি। যমুনার বুক খালি হলে যেন কপাল খুলে যায় নদীভাঙনের শিকার মানুষগুলোর। পানি নেমে যাওয়া মাত্র চরের উর্বর মাটিতে পা রাখেন তারা। তোড়জোড় শুরু করে দেন মরিচ চাষে। প্রতিবছরই মরিচ ফলানোর কাজটি করেন চরাঞ্চলের চাষিরা। এবারও এর ব্যত্যয় হয়নি। যমুনার বিভিন্ন এলাকা ও দুই কূল ঘেঁষে জেগে ওঠা চরের উর্বর মাটিতে তাই দেশীয় জাতের মরিচ চাষ করছেন তারা। বিশাল এলাকাজুড়ে চাষ করেছেন দেশীয় জাতের মরিচ।

লাল মরিচের চোখ ঝলসানো দৃশ্য এখন বগুড়ার চরাঞ্চলের মাঠে মাঠে শোভা পাচ্ছে। স্থানীয় কয়েক হাজার কৃষক এখন লাল স্বপ্নে বিভোর। মাঠের মরিচ এখন কৃষকের গোলায় উঠতে শুরু করেছে। মাইলের পর মাইল

যমুনার পাকা বাঁধে শুকানো হচ্ছে এসব মরিচ। কৃষকের এ লাল স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন জেলার প্রায় ১০ হাজার নারী শ্রমিক। তাদের চোখে-মুখে আনন্দের আভা। এমন দৃশ্য দেখে যে কারও মন জুড়াবে নিমিষেই।

বগুড়ার লাল মরিচ এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখানকার মরিচ বিশ্বজুড়ে নন্দিত। সবুজ কাঁচা মরিচ ও লাল শুকনো মরিচÑদুই-ই রপ্তানি তালিকার বড় স্থানজুড়ে রয়েছে। বগুড়ার মরিচের তীব্র ঝাল এখন সর্বজনীন। দেশের গুঁড়ো মসলা প্রস্তুতকারক অনেক প্রতিষ্ঠান মরিচ আবাদস্থলে ক্রয়কেন্দ্র খুলেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বগুড়ার যমুনা তীরবর্তী গ্রামগুলো। মরিচ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মাঠ পর্যায়ের চাষিকে আগাম বায়না দিচ্ছেন। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মরিচ বিশ্বের সব দেশের গুঁড়ো মসলা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে অতি প্রয়োজনীয়। আর বগুড়ার মরিচের ঝালের আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

বগুড়ায় মরিচ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় স্থান যমুনা তীরবর্তী সারিয়াকান্দি, গাবতলী উপজেলার কলাকোপা, ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়ী, সোনাতলা উপজেলার

রানীরপাড়া, হরিখালী ও আশপাশ এলাকা। এ স্থানগুলোয় মরিচের আবাদ অনেক বেড়েছে। সারিয়াকান্দিতে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক কৃষকের বাড়ির আঙিনা ও চাতালে বিশেষ ব্যবস্থায় মরিচ শুকানো হচ্ছে। মরিচের বাজার গত বছরের তুলনায় এবার কম হলেও মাঠ পর্যায়ের কৃষক মরিচের আবাদ করেছে। মুনাফার আশায় তারা মরিচ চাষ করে।

বগুড়া কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আ ক ম শাহরিয়ার বলেন, গত বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার ৩৫ হেক্টর জমি, আবাদ হয়েছিল ১০ হাজার ৩৩৫ হেক্টরে। গড় ফলন ছিল ১০ দশমিক ১৮ মেট্রিক টন। এবারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৫৫৫ হেক্টর; আবাদ হয়েছে ১০ হাজার ৩৭৫ হেক্টরে। এখন পর্যন্ত গড় ফলন ১৩ দশমিক আট টন।

চলতি মৌসুমে বগুড়ায় মরিচ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় সাত হাজার হেক্টরে। লক্ষ্য ছিল, এ পরিমাণ জমিতে আবাদ করে ফলন মিলবে প্রায় ৮০ হাজার টন। আবাদ মৌসুমে দেখা যায়, মরিচচাষি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আবাদ করেছেন। যেসব স্থানে আগে কখনও মরিচের আবাদ হয়নি, সেখানেও আবাদ হচ্ছে।

নানা জাতের মরিচের মধ্যে লাল ও টোপা মরিচের চাহিদা বেশি। টোপা মরিচ মাঠে পেকে যাওয়ার পর সংরক্ষণে সহায়তা করেন নারীরা। শুকনো মরিচ সংরক্ষণ ও বস্তায় ভরার কাজ সহজ নয়। এক ধরনের তীব্র ঝাঁঝ প্রায়ই অসহনীয় হয়ে ওঠে। নারী শ্রমিক জাহানারা বলেন, ঝাঁঝ যতই হোক, মরিচ বেচে লাভের মুখ দেখার পর ঝাঁঝের কথা আর মনে থাকে না।

জেলায় সবচেয়ে বেশি মরিচ চাষ হয় সারিয়াকান্দি, শাজাহানপুর, সোনাতলা, ধুনট, শেরপুর, নন্দীগ্রাম ও শিবগঞ্জ উপজেলায়। সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার যমুনাবেষ্টিত স্থানগুলোয় গিয়ে দেখা গেছে, চরের নারী ও পুরুষরা মরিচ শুকানোয় ব্যস্ত সময় পার করছে। বিশেষ করে নারীরা এখন মরিচের কাজে বেশি সময় দিয়ে বাড়তি টাকা আয় করছে।

মরিচচাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, লাল মরিচ গাছ থেকে সংগ্রহ করছে মসলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। লাল টোপা মরিচ কৃষকের আঙিনায় শুকিয়ে তারা কারখানায় নিচ্ছে। এছাড়া মৌসুমি

ব্যবসায়ীরা মরিচ কেনার জন্য এখন সারিয়াকান্দি ও ধুনটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

কৃষক মোখলেস ও আকবর বলেন, শ্রমিকদের মজুরি দিতে হচ্ছে বেশি। ফড়িয়া দালালদের কারণে লাভের অংশ কমে যাচ্ছে। পাইকারি বাজারে শুকনো মরিচ মণপ্রতি ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। খুচরো বাজারে তা আট হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা।

মাঠ পর্যায়ের অনেক কৃষক জানান, মরিচ বেচে লাভের মুখ দেখছেন না তারা। গত বছরের তুলনায় এ বছর মরিচের দাম তুলনামূলক কম। কৃষক বগা হোসেন বলেন, সাড়ে চার মণ মরিচ শুকিয়ে এক মণ মরিচ পাই। বাজারে মরিচের দাম কম হওয়ায় আমরা হতাশ। আমরা চর এলাকার মানুষ, আশায় থাকি, এ মরিচ চাষ করে অভাব দূর করব। দাম ভালো হলে আমরা সুখে থাকতে পারব, আমাদের অভাব দূর হবে।

পারভীন লুনা, বগুড়া

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..