দিনের খবর সারা বাংলা

যশোরের খেজুর রসের ঐতিহ্য রক্ষায় একজন ‘রসকাকা’

মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর: যশোরের যশ খেজুরের রস। এটি ছিল যশোরের অন্যতম ঐতিহ্য। এখনও আছে, তবে আগের তুলনায় কম। খেজুরের রসের এই সুখ্যাতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় সংগ্রামে নেমেছেন যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বহরামপুর গ্রামের সবার কাছে ‘রসকাকা’ নামে পরিচিত মাওলানা কাজী ফারুক হোসেন (৫৮)।

পেশায় শিক্ষক মাওলানা কাজী ফারুক হোসেন প্রত্যেক শীত মৌসুমে নিজ হাতে ৬০টির মতো খেজুরগাছ কাটেন। তারপর ভোরের হাড়কাঁপানো শীতকে উপেক্ষা করে গাছে উঠে খেজুর রস সংগ্রহ করেন। পরে নিজেই সেই রসের ভাঁড় কাঁধে নিয়ে নিজ গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামের মানুষদের পর্যায়ক্রমে বিলিয়ে দেন। তার দুই ছেলে নাজমুস সাকিব, মাহবুব হেলাল এবং এক মেয়ে উম্মে হাবিবা তার এই কাজে সহযোগিতা করে। গ্রামের সবার তাকে রসকাকা নামেই চেনে।

যশোরের সুস্বাদু খেজুরের রস ও গুড়-পাটালি টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজš§কে যশোরের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে তিন বছর ধরে এই কাজ করছেন তিনি। এজন্য কারও কাছ থেকে তিনি টাকা-পয়সাও নেন না। এমনকি রস সংগ্রহ করার ভাঁড়সহ অন্যান্য উপকরণও কেনেন নিজের টাকায়। পান করার উপযোগী নিরাপদ রস সংগ্রহ করতে, অর্থাৎ নিপাহ ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতেও ব্যবস্থা নিয়েছেন। বাদুড়সহ যেকোনো পাখি যেন রসে মুখ দিতে না পারে, সেজন্য গাছে ভাঁড়ের ওপর খাঁচা লাগানোর ব্যবস্থাও করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে কাজী ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমার এ কাজের পেছনে উদ্দেশ্য হলো, বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি যশোরের খেজুর রস ও গুড়ের যে ঐতিহ্য, দিন দিন তা বিলুপ্তির দিকে। কিন্তু সবাই সুস্বাদু রস পান করতে আগ্রহী। বর্তমানে গ্রামেও ভালো মানের রস পাওয়াটা দুর্লভ, কারণ খেজুরগাছ কমে গেছে। আবার যে সংখ্যায় খেজুরগাছ আছে, তার অধিকাংশই রস সংগ্রহ করতে কাটা হয় না দক্ষ গাছির অভাবে।’

খেজুর রসের সুখ্যাতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় সংগ্রামী মানুষ ফারুক হোসেনের ইচ্ছা, আগামীতে পর্যাপ্ত খেজুর চারা রোপণসহ প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন গ্রামে দক্ষ ‘গাছি’ তৈরি করা। সম্প্রতি এক ভোরে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বহরামপুর গ্রামে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনেই গøাস, মগ, কাপ, ছোট ঘটি ও বোতল নিয়ে অপেক্ষমাণ একদল শিশু-কিশোর। খেজুরের রস পান করতে এসেছে সবাই। ফারুক হোসেন খাঁটি সুস্বাদু খেজুরের রস নিয়ে মাঠ থেকে ফিরবেন সেই অপেক্ষাতেই রয়েছে তারা।

একপর্যায়ে শিশুদের দলবদ্ধ আনন্দ-চিৎকারে বোঝা গেল তিনি আসছেন। শিশু-কিশোরের দল আনন্দ করতে করতে তাকে ঘিরে ধরে তার সঙ্গেই ঢুকল বাড়িতে। এরপর তিনি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ভাঁড়ের রস ছেঁকে তা শিশুদের মাঝে বিলাতে শুরু করলেন। কে কার আগে রস পান করবে, শুরু হলো শিশুদের হুড়াহুড়ি। তা দেখে তিনি বিরক্ত তো হলেনই না, বরং এসব দেখে আনন্দ আর মুগ্ধতার ঝিলিক ফুটল ফারুক হোসেনের মুখে।

শিশুপুত্র নিয়ে খেজুর রস পান করতে আসা অভিভাবক সাবিনা খাতুন এ সময় বলেন, ‘রসকাকা’ কাজী ফারুক আমাদের ফ্রি খেজুরের রস খাওয়ান। তার জন্যই গ্রামের বাচ্চারা রস খেতে পারে। গ্রামেও এখন ঠিকমতো খাঁটি রস পাওয়া যায় না। কাকার জন্যই আমরা খাঁটি রস খেতে পারছি। তিনি কারও কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সাও নেন না।

কাজী ফারুকের প্রতিবেশী আইয়ুব, হানিফ ও ওমর ফারুক জানান, তিন বছর ধরে প্রতি শীতকালে তিনি গ্রামের ৬০টির মতো খেজুরগাছ নিজে কাটেন। এসব গাছে যে রস হয়, তা তিনি গ্রামের মানুষদের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণ করেন। তিনি টাকার জন্য এ গাছ কাটেন নাÑযশোর অঞ্চলের খেজুরের রস ও গুড়ের পুরোনো দিন ফিরিয়ে আনতে, টিকিয়ে রাখতে এবং মানুষের সেবার জন্য খেজুরগাছ কেটে খাঁটি রস মানুষকে খাওয়ান।

কাজী ফারুক হোসেন গ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রায় পাঁচ হাজারের মতো তালগাছের চারাও রোপণ করেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে তালগাছের উপকারিতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার কাজটাও করেন তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..