প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

যশোরে বাড়ছে মেটে আলুর বাণিজ্যিক আবাদ

কাজী আশরাফুল আজাদ, যশোর: যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা এবং মনিরামপুর-কেশবপুর উপজেলায় মেটে আলুর ব্যাপক চাষাবাদ শুরু হয়েছে। এসব এলাকার মাটি দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ হওয়ায় কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে মেটে আলুর চাষ করছেন বলে কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। মিশ্র ও রোলিং পদ্ধতিতে কম খরচে এ আবাদ করে এখানকার কৃষক লাভের মুখ দেখছেন।

যশোরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, গত বছর যশোরের আট উপজেলায় ১৯৫ হেক্টর জমিতে মেটে আলু চাষ করা হয়েছিল। এ বছর তা ২০০ হেক্টর ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে চৌগাছা ও ঝিকরগাছাতেই চাষ হয়েছে ১৩০ হেক্টর জমি।

ঝিকরগাছা উপজেলার গঙ্গানন্দপুর ইউনিয়নের শ্রীচন্দপুর, বালিয়া, আটুলিয়া, গোউরসুটি এবং চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর, মির্জাপুর, তেঘরী, বিশ্বনাথপুর, স্বরূপদাহরসহ বিভিন্ন মাঠে চলতি মৌসুমে মেটে আলুর ব্যাপক চাষ হয়েছে। চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম জানান, মাটিতে বালির মিশ্রণ বেশি থাকায় মেটে আলুর চাষ ভালো হয়। সাথী ফসল হিসেবে ঝিঙেও চাষ করা যায়। ওই গ্রামের চাষি সবুজ মিয়া জানান, আবহাওয়ার কারণে বর্তমান সময়ে মেটে আলুর চাষ ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। আলতা-পাত, বেনা ঝাড়, গাড়লতা, হরিণ শিংয়ে বা হরিণ পেলে জাতের মেটে আলু এখানকার জমিতে বেশি ফলন দেয়। তবে হরিণ পেলে ও আলতা-পাতের চাহিদা ক্রেতাদের কাছে বেশি হওয়ায় দাম ভালো পাওয়া যায়। এজন্য অধিকাংশ পতিত জমিতে চাষিরা এই জাত দুইটির বেশি আবাদ করেন।

তিনি জানান, বাংলা শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে জমিতে আলুর বীজ বপন করা হয়। এর চার মাস পরই আলু সংগ্রহ করা যায়। তাছাড়া এই ফসল উৎপাদনে কোনো ধরনের সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না। ফলে খরচ নেই বললেই চলে। পদ্ধতিটির পরিচিতি এজন্যই এতো বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন। আলমগীর, শাহীন, করিম ও আলমুদ্দীনসহ আরো অনেকে চাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রতি বিঘা জমিতে ৮০-১২০ মণ আলু উৎপাদিত হয়। প্রতি কেজি আলুর স্থানীয় বাজারদর ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।

শ্রীচন্দপুরের প্রান্তিক কৃষক আলী আহমেদ জানান, মেটে আলুর জমিতে মিশ্র চাষপদ্ধতি ছাড়াও পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতিতে (রোলিং) সবজির চাষ করা যায়। এই দুই পদ্ধতিতে যেখানে মেটে আলুর চাষ হচ্ছে সেখানে পটল, ঝিঙে, বেগুন, শশা জাতীয় সবজির চাষ করা যায়। এসব সবজির ফলন যখন কমতে শুরু করে তখনই মেটে আলু বিস্তার লাভ করে। ফলে খরচের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা এই সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠে মাচা করে মেটে আলুকে প্রধান এবং উচ্ছে ও শিমকে সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা হচ্ছে। পদ্ধতির নাম না জানলেও চাষি রিফা বেগম জানেন একই মাচায় উচ্ছে, মেটে আলু এবং শিমের চাষ পদ্ধতি। তিনি জানান, তিনটি সবজি একই সঙ্গে লাগানো হয়নি। উচ্ছে বোনার মাস দুয়েক পর মেটে আলু এবং আরো কয়েক মাস পর যখন আলু গাছ মরার মতো হবে তখন একই মাচায় ওঠানো হবে শিম। তেমন কষ্টসাধ্য না থাকায় সংসারের সব কাজ চালিয়ে এক বিঘে জমিতে চাষ করেছেন মেটে আলু। স্বামীর পাশাপাশি নিজেও করছেন বাড়তি আয়।

গৃহবধূ জরিনা খাতুন গত বছর এই চাষ-পদ্ধতিতে বিঘাপ্রতি লাভ করেছিলেন প্রায় ২৭ হাজার টাকা। দশ হাজার টাকার বিনিময়ে লিজ নেওয়া জমিতে স্বামী-স্ত্রী মিলে লাভের টাকা ঘরে তুলেছিলেন তারা। এবার একই গ্রামের চাষি রহমত আলী অল্প জমিতে চাষ করেছেন। তিনি জানান, তার চাষের আট কাঠায় শ্রমিক বাবদ খরচ হয়েছে ১হাজার ৩০০ টাকা। জমিতে গোবর, রাশিয়ান সার ও ইউরিয়া সার দিয়েছেন। প্রথম সবজি উচ্ছে উৎপাদনে সেচ দিতে হয়েছে। বান তৈরি ও আনুষঙ্গিক মিলিয়ে খরচ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত বিক্রির টাকা যা পেয়েছেন তাতে খরচ উঠে এসেছে। ৮ কাঠা জমিতে একই বানে তোলা তিনটি ফসলে আর যা আসবে সবই তার লাভ। তার ধারণা, মোট আট মাসে লাভের পরিমাণ ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা হতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক এমদাদ হোসেন জানান, মিশ্র ও রোলিং পদ্ধতিতে এ বছর মেটে আলুর চাষ অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে, মিশ্র পদ্ধতিতে একই মাচায় ন্যূনতম দুটি ফসলের চাষ সম্ভব এবং সেক্ষেত্রে মেটে আলুর চাষে খরচ নেই বললেই চলে। নিড়ানি ও অন্যান্য খরচও কম। অন্যদিকে, চৌগাছা, ঝিকরগাছার মাটি মেটে আলুর জন্য খুবই উপযোগী। ফলে পর পর কয়েক বছর ফলন বেশি পেয়ে চাষিরা মেটে আলুর সঙ্গে সাথী ফসলের চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।