শাহারুল ইসলাম, বেনাপোল (যশোর) : যশোরে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ধারাবাহিক সহিংসতায় জেলাজুড়ে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌঁছেছে। শনিবার সন্ধ্যায় শহরের শংকরপুর এলাকায় গুলিতে নিহত হন বিএনপি নেতা, তার পরদিন রোববার সকালে জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ এনাম সিদ্দিকিকে ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা, আর আজ (গতকাল) সোমবার (৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় মনিরামপুর উপজেলায় প্রকাশ্য দিবালোকে গুলিতে হত্যা করা হয়েছে এক সাংবাদিককে। একের পর এক এসব ঘটনায় যশোরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সবশেষ সোমবার সন্ধ্যায় মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক রানা প্রতাপ। তিনি নড়াইল থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘বিডি খবর’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যায় জনাকীর্ণ বাজারে অবস্থানকালে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ করে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন এবং উদ্ধার করার আগেই মারা যান। ব্যস্ত বাজারে প্রকাশ্যে একজন সাংবাদিককে হত্যার ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোক ও আতঙ্ক।
এর আগে রোববার (৪ জানুয়ারি) সকালে যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের এনায়েতপুর গ্রামে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন এনাম সিদ্দিকি। তিনি জুলাই আন্দোলনে আগে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। সকাল সাড়ে ৮টায় হাঁটতে বের হলে এনায়েতপুর পীরবাড়ির সামনে দুই দুর্বৃত্ত তার পথরোধ করে। প্রথমে লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত, পরে বুক, কাঁধ ও হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে তারা পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসকরা জানান, তিনি বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত।
এই ঘটনার ঠিক আগের দিন শনিবার সন্ধ্যায় যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় গুলিতে নিহত হন এক বিএনপি নেতা। ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের মেয়ের জামাইসহ দুজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনের মোটিভ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
টানা তিন দিনে গুলি ও ছুরিকাঘাতে প্রাণহানি এবং গুরুতর আহতের ঘটনায় যশোর জুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ বলছেন, প্রকাশ্য সড়ক ও বাজারে এভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটলে নিরাপত্তা নিয়ে ভরসা রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে সাংবাদিক হত্যা ও সাম্প্রতিক সহিংসতা নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন যশোরের জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে একজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও অগ্রহণযোগ্য। এই ধরনের অপরাধ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। অপরাধীরা যে-ই হোক, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি আরও বলেন, যশোরে টানা সহিংস ঘটনাগুলো আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। জনগণের জানমাল রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ জানায়, সাংবাদিক রানা প্রতাপ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। একই সঙ্গে বিএনপি নেতা হত্যা ও এনাম সিদ্দিকির ওপর হামলার ঘটনাগুলোকেও সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
প্রিন্ট করুন





Discussion about this post