সারা বাংলা

যশোরে বিলুপ্তির পথে মাশরুম চাষ

মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর: আত্মকর্মসংস্থানের জন্য উচ্চ পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ মাশরুম চাষে উৎসাহী হয়ে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন যশোরের অনেক নারী-পুরুষ। তৈরি হন কয়েকশ’ উদ্যোক্তা। বাসাবাড়ি ও অল্প জায়গার মধ্যে চাষ করে সচ্ছলভাবেই জীবনযাপন করতেন তারা। অথচ যশোরে  বিলুপ্ত হতে চলেছে সেই মাশরুম চাষ। সরকারের গৃহীত মাশরুম উন্নয়ন ও জোরদারকরণ প্রকল্প বন্ধ হওয়ায় যশোরের অধিকাংশ উদ্যোক্তা মাশরুম চাষ ছেড়ে দিয়েছেন।

কৃষি বিভাগের একটি সূত্রে জানা গেছে, সাভারে প্রথমে মাশরুম উন্নয়নকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে মাশরুম উন্নয়ন ও জোরদারকরণ প্রকল্প চালু করে। এ প্রকল্পের আওতায় অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ চাষের পরিধি বিস্তৃতি লাভের জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় যশোরে বিকশিত হয় মাশরুম চাষ। পাড়া-মহল্লার শিক্ষিত বেকার নারী-পুরুষরা মাশরুম চাষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু এরই মাঝে প্রকল্পের টাকা অপচয়ের কারণে বন্ধ হয়ে যায় মাশরুম উন্নয়ন প্রকল্প। এ নিয়ে শুরু হয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। ফলে প্রকল্পটি চালু হওয়ার কথা থাকলেও আর চালু হয়নি।

জানা গেছে, যশোরে ব্যক্তি উদ্যোগে সর্বপ্রথম ২০০১ সাল থেকে কিছু উদ্যোক্তা মাশরুম চাষ শুরু করেন। এরপর ২০০৯ সালে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় গৃহীত মাশরুম উন্নয়ন ও জোরদারকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে মাশরুম চাষ যশোর অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। কিন্তু কোনো ঘোষণা ছাড়াই গত ২০১৪ সালের জুনে হঠাৎ প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন চাষিরা। প্রকল্পটি আবার চালু হবে এ প্রত্যাশায় তারা ব্যক্তি উদ্যোগে মাশরুম চাষ ধরে রাখলেও বেশিদিন এগুতে পারেননি। নিরুৎসাহিত হয়ে মাশরুম চাষ বন্ধ করে বদলে ফেলেছেন পেশা।

তাদেরই একজন যশোর চাঁচড়া এলাকার তৌহিদুল ইসলাম। তৌহিদুল ইসলাম জানান, মাশরুম উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হওয়ার পর ব্যক্তি উদ্যোগে প্রায় দু’বছর মাশরুম চাষ করেন। কিন্তু এরপর প্রকল্প আর চালু না হওয়ায় অর্থের অভাবে

আর এগুতে পারেননি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা

ছাড়া মাশরুম চাষ সম্ভব নয়। সে কারণে ইচ্ছা থাকলেও তা ধরে রাখতে পারেননি।

একই কথা জানান মুড়লীর আইয়ুব আলী। তিনি জানান, যশোর হর্টিকালচার থেকে মাশরুম উদ্যোক্তাদের নিয়মিত ট্রেনিং দেওয়া হতো। প্রকল্প বন্ধ হওয়ার পর থেকে আর কোনো ট্রেনিং দেওয়া হয় না। সরকারিভাবে উদ্যোক্তাদের মধ্যে মাশরুমের বীজ (স্পুন) সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে বীজ না থাকায় ইচ্ছা থাকলেও মাশরুম চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অঞ্চলে প্রায় এক হাজার নারী-পুরুষ মাশরুম চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে শুধু প্রকল্প চালুর অপেক্ষায় থেকে গেলাম। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সব সময়ই বলে আসা হচ্ছে, মাশরুম চাষ প্রকল্প আবার চালু হবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

রেহেনা আক্তার রানু নামে একজন মাশরুম চাষি জানান, মাশরুম চাষ এক সময় যশোরে বিপ্লব সৃষ্টি  করে। তার মতো শত শত মহিলা ঘরে বসেই মাশরুম চাষ করে জীবন নির্বাহ করছিলেন। তৈরি হচ্ছিল নতুন নতুন উদ্যোক্তা। অথচ এটি যশোর থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

যশোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক বিনয় কুমার সাহা জানান, এ অঞ্চলের মানুষের চাহিদা মেটাতে যশোরের হর্টিকালচার সেন্টারে প্রতিষ্ঠা করা হয় মাশরুম গবেষণাগার। যেখানে প্রতি মাসে সাত হাজার প্যাকেট বীজ (স্পুন) উৎপাদন হতো। এসব বীজ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করা হতো। বর্তমান প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মাশরুম গবেষণাগারটি বন্ধ রয়েছে। মাশরুম উন্নয়ন প্রকল্পটি আবার চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। হয়তো এ নামে না এলেও খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে অন্য নামে সরকারি উদ্যোগে মাশরুম চাষ শুরু হবে।

সর্বশেষ..