সম্পাদকীয়

যানজট নিরসনে চাই কার্যকর পদক্ষেপ

 

গত সপ্তাহে প্রকাশিত ‘ট্রাফিক ইনডেক্স ২০১৭’-এ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার যানজটের যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তাতে এ নগরীর বাস্তব রূপই ফুটে উঠেছে। এতে ২০৫টি শহর নিয়ে করা বিশ্বের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ শহরের তালিকায় ঢাকা উঠে এসেছে দুইয়ে। যানজটের কারণে রাজধানীতে জীবনযাপন যে কত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তা কে না জানে! এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিলÑশুধু ঢাকার যানজটের কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশের ক্ষতি হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তিন শতাংশ। আর্থিক হিসাবে এ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। উল্লিখিত দুই প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট, যানজটে রাজধানীতে বেড়ে উঠেছে মানুষের ভোগান্তি; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি ও পরিবেশ।

বস্তুত এসব তথ্য সরকারের অজানা নয়। আমরা দেখেছি, ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে নানা মহল থেকে। সরকারও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। এ লক্ষ্যে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণ হয়েছে সাম্প্রতিককালে। সরকার এগুলোকে উপস্থাপন করছে উন্নয়নের দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবে। কিন্তু এর কোনো কোনোটি যে যানজট নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারছে না, তাও উঠে এসেছে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের বক্তব্যে। এজন্য আমরা চাইবো, যানজট নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের আগে পর্যাপ্তভাবে বিশেষজ্ঞ মত নেওয়া হোক। কেননা ফ্লাইওভারের মতো স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় হয় প্রচুর। এজন্য বিদেশি ঋণও নেওয়া হয় উচ্চ সুদে। সেই অবকাঠামোর কারণে সৃষ্ট যানজটে যদি জিডিপি কমে আসে, তাহলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুদিক থেকেই। এ অবস্থায় এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ সুবিবেচনাপ্রসূত হতে পারে না।

যানজটের কারণে যে মূল্যবান কর্মঘণ্টা অপচয় হয়, তা কাজে লাগানো গেলে জিডিপি আরও বাড়তো। জ্বালানির অপচয় হ্রাস করা গেলে জীবনযাত্রার ব্যয়ও কমানো যেতো। প্রতিদিন যে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, তা হ্রাস করা গেলে ঢাকার বাতাসে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতিও এত বাড়তো না। বিভিন্ন সময় সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, যানজটের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে চিকিৎসাসেবার জন্য হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না মানুষ। অগ্নিনির্বাপণে দমকল বাহিনী অকুস্থলে পৌঁছাতে পারে না যথাসময়ে। এজন্য কখনও কখনও মেনে নিতে হয় বড় ক্ষতি। এ অবস্থা কতদিন চলবে, তা কেউ জানে না। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, যানজটের কারণে একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশে প্রতিবছর জিডিপির তিন শতাংশ ক্ষতি কি মেনে নেওয়ার মতো? শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রকে এ অবস্থায় রেখে দেশকে কাক্সিক্ষত সময়ে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা কি সম্ভব?

উল্লিখিত বাস্তবতা বিবেচনায় রাজধানীসহ দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত শহরগুলোয় যানজট নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। রাজধানীর পথে ছোট গাড়িকে বিশেষজ্ঞরা আখ্যায়িত করেছেন সমস্যার মূল কারণ হিসেবে। প্রাইভেটকার যে এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে, তা বলাই বাহুল্য। আয় বৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের বিলাসব্যসন বেড়ে ওঠে স্বভাবতই। এজন্য ঢাকার বাইরে অন্যান্য শহরেও এখন প্রাইভেটকার বাড়ছে ব্যাপকভাবে। সিটি ট্যাক্স আরোপ, গাড়ি আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি ও ব্যাংকঋণে সুদহার বাড়িয়ে কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণে রাখার উদাহরণ রয়েছে অনেকে দেশে। আমরা চাইবো, যানজট নিয়ন্ত্রণে এসব উদাহরণ অনুসরণ করবে সরকার। প্রায় সোয়া কোটি মানুষের নগরীতে মাত্র দুই শতাংশ ব্যক্তির মাত্রাতিরিক্ত গাড়ির কারণে বাকি ৯৮ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন ভুগবে, এজন্য অর্থনীতি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবেÑতা হতে পারে না। যানজট নিয়ন্ত্রণে যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জনবল ও আইনি কাঠামো দরকার, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহায়তা জোগানো হোক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..