টেলকো টেক

যানবাহনের পোড়া তেল থেকে গ্যাস ও জ্বালানি

অপ্রয়োজনীয় ও ফেলনা। যানবাহনের পোড়া তেলের ক্ষেত্রে শব্দযুগল একেবারে জুতসই। অথচ এ বাতিল তেল দিয়ে তৈরি হচ্ছে গ্যাস বা জ্বালানি। পরিণত করা হয়েছে মূল্যবান সম্পদে। যশোরের সীমান্তবর্তী উপজেলা শার্শার মোটর মেকানিক মিজানুর রহমান এর উদ্ভাবক।
যানবাহন বা কল-কারখানার পোড়া তেল পরিবেশ দূষণ করে। পরিবেশকে দূষণমুক্ত করতে মিজান এ উদ্যোগ নিয়েছেন। এক বছর ধরে পোড়া তেল নিয়ে গবেষণা করে সফল হয়েছেন তিনি।
মিজান বলেন, আমাদের দেশে লাখ লাখ যানবাহন ও কল-কারখানা থেকে ফেলে দেওয়া হয় প্রচুর পরিমাণে পোড়া তেল। এ তেল নষ্ট করছে পরিবেশ, স্বাস্থ্যহানি করছে মানবদেহের। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য গবেষণায় মনোনিবেশ করি। চিন্তা করি, কীভাবে এ পোড়া তেল কাজে লাগানো যায়। একদিন কিছু পোড়া তেল আমি খোলা মাঠের ঘাসের ওপর ফেলে আসি। কিছুদিন পর দেখি ঘাসগুলো মারা গেছে। এমনিভাবে পানিতে ফেললেও মারা যাচ্ছে মাছ। পোড়া তেল কাজে লাগাতে গিয়ে দেখি, তা থেকে উৎপাদন হচ্ছে গ্যাস ও জ্বালানি সম্পদ। একটি কন্টেইনারে পোড়া তেল জ্বালিয়ে গ্যাস তৈরি করেছি। রান্নাসহ বিভিন্ন কাজে এ গ্যাস ব্যবহার করা যায়। অবশিষ্ট কিছু রিসাইক্লিং করে কেরোসিন তেল তৈরি করা যায়।
শার্শার নিজামপুর ইউনিয়নের আমতলা গাতিপাড়ায় ১৯৭১ সালের ৫ মে জন্মগ্রহণ করেন মিজান। বাবা আক্কাজ আলী। মা খাদেজা খাতুন। তারা কেউ বেঁচে নেই।
বাবা-মায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে মিজান পঞ্চম। শার্শার শ্যামলাগাছি গ্রামে বাস করেন তিনি। দারিদ্র্যতার কারণে লেখাপড়া শিখতে পারেননি। আট থেকে ৯ বছর বয়সে বেঁচে থাকার তাগিদে নেমে পড়েন কর্মে। মাঠে মাঠে ইরি ধানের ক্ষেতে শ্যালো মেশিন চালানো ও মেরামতের কাজ করেন। পরবর্তীকালে নাভারন বাজারে একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজ প্রতিষ্ঠা করেন। সে থেকেই মোটর মেকানিক পেশা হিসেবে কর্মজীবন শুরু হয় তার। বর্তমানে শার্শা বাজারে ‘ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ’ নামে একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজ রয়েছে তার।
ছোটবেলা থেকে তার শখ নতুন কিছু করা। নতুন কিছু জানা। তবে মেকানিক হিসেবে ইঞ্জিন তৈরি করার প্রতি প্রবল আগ্রহ রয়েছে তার।
মিজান প্রথমে উদ্ভাবন করেন হাফ ক্র্যানসেপ্ট দিয়ে একটি আলগা ইঞ্জিন। তার ইঞ্জিনের সব যন্ত্রপাতি বাইরে থেকে দেখা যেত। ইঞ্জিনটি একবার তেল দিয়ে চালু করলে পরবর্তী সময়ে আর তেল লাগত না। সৃষ্ট ধোঁয়া থেকে জ্বালানি তৈরি করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলত ইঞ্জিনটি।
ঢাকার তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিকের প্রাণহানির পর মিজান উদ্ভাবন করেন স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র। বাসা-বাড়ি, কল-কারখানা, অফিস-আদালতে আগুন লাগলে যন্ত্রটি আগুন নেভাতে পাঁচ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে আগুন নেভাতে শুরু করে। বিদ্যুৎ ছাড়াই চলে যন্ত্রটি, স্বল্প জায়গায় রাখা যায়। কোথাও আগুন লাগলে যন্ত্রটি তার তাপমাত্রা নির্ণয়ক যন্ত্রের মাধ্যমে আগুনের অবস্থান নিশ্চিত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম ও রেড লাইট অন করে দেয়। একই সঙ্গে সংযুক্ত মোবাইল ফোন হতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানান দেয় এবং পানির পাম্পের সুইচ অন করে দেয়। এজন্য সময় নেয় পাঁচ থেকে সাত সেকেন্ড। এরপর পানির পাম্পের সঙ্গে সংযুক্ত পাইপের মাধ্যমে আগুনের অবস্থানে পৌঁছে। অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত ফাঁপা বলের আগুনে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আগুন নিভে যায়। এটি উদ্ভাবনের পর ২০১৫ সালে যশোর জিলা স্কুলের একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় মিজান এটি প্রদর্শন করেন। মেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরে এটি বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। দেশে পেট্রোল বোমায় যখন মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছিল, ঠিক সে সময় মিজান উদ্ভাবন করেন তার তৃতীয় উদ্ভাবন অগ্নিনিরোধ জ্যাকেট। এ জ্যাকেট গায়ে দিয়ে ড্রাইভার বা ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা নিরাপদে কাজ করতে পারেন। আগুনের মাঝে গিয়ে জান-মাল রক্ষা করার সময় তাদের শরীরে আগুন স্পর্শ করবে না। চতুর্থ উদ্ভাবন ছিল অগ্নিনিরোধক হেলমেট। এটি ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় আগুনে গলার শ্বাসনালি পুড়বে না। তার পঞ্চম উদ্ভাবন ছিল প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে দেশীয় প্রযুক্তির মোটরকার উদ্ভাবন। এটি বিদ্যুৎ বা পেট্রোলচালিত।
কৃষকের স্বয়ংক্রিয় সেচযন্ত্র উদ্ভাবন ছিল তার ষষ্ঠ উদ্ভাবন। দূরদূরান্তের জমিতে পানি দিতে আর ক্ষেতে যেতে হবে না কৃষককে। বাড়িতে বসেই সেচযন্ত্রটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বন্ধ বা চালু করতে পারবেন তারা। তাছাড়া এ যন্ত্রটি জমিতে পানির প্রয়োজন হলে নিজে নিজেই চালু হয় এবং পানির প্রয়োজন না থাকলে এটি বন্ধ হয়ে যায়। দেশীয় প্রযুক্তিতে মিজান তার সপ্তম উদ্ভাবন করেন ফ্যামিলি মোটরযান। ব্যবহারযোগ্য এ যানটি এলাকার মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। মিজানের অষ্টম উদ্ভাবনে রয়েছে পরিবেশ সেইফটি যন্ত্র। এটি পরিবেশ রক্ষায় বহুমুখী কাজ করে থাকে। বাসা-বাড়ি, অফিস বা কল-কারখানায় ময়লা পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার করা যায় যন্ত্রটি। হাতের স্পর্শ ছাড়াই এ যন্ত্রটি পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহার হয়। যন্ত্রটি উদ্ভাবনের পর ২০১৬ সালের ৫ জুন মিজান পরিবেশ পদক অর্জন করেন। জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে মিজান এখন পর্যন্ত ৩৮টি সনদ পেয়েছেন। তার ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য ক্রেস্ট ও পুরস্কার।
মিজানের উদ্ভাবিত মোটরকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের আওতাভুক্ত হয়েছে।
মিজান বলেন, আমি দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যেতে চাই। এজন্য আরও নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবন করার ইচ্ছে রয়েছে আমার।
কথা ও কাজে মিল রয়েছে মিজানের। তাই পরিবেশ দূষণরোধে এ বছর তিনি উদ্ভাবন করেন ফেলে দেওয়া পোড়া তেল থেকে গ্যাস ও জ্বালানি সম্পদ।

মহসিন আলী, বেনাপোল

 

 

 

 

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..