মত-বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘কৌশলগত স্থিতি’ পেতে চীনের রাশিয়া নির্ভরতা

ম্যাথিউ দুচাতেল:যুক্তরাষ্ট্র চীনে পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে। চীনকে তাই সে বোমা ঠেকানোর অস্ত্র বানাতেই হবে। এখন চীন-রাশিয়া কৌশলগত সম্পর্কে রাশিয়া কীভাবে চীনকে সাহায্য করবে? রাশিয়া কি তার পারমাণবিক অস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বকে চীনের সামনে নত করবে?

এ বিষয়েই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সেদিন ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবে খোলাসা করলেন অনেকটা: ‘আমি সম্ভবত এখানে একটি বড় গোপনীয়তাকে উš§ুক্ত করছি না। কিন্তু যে কোনোভাবেই হোক বুদবুদ নির্গত হতেই থাকবে শিগগিরই অথবা দেরিতে। আমরা এখন চীনা বন্ধুদের সাহায্য করছি, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নির্মাণে পাশে দাঁড়িয়েছি। এটা খুবই গুরুত্ববহ এবং চীনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে তুলবে। এই ব্যবস্থাটি এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনেরই রয়েছে।’

ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পূর্বসতর্কীকরণ ব্যবস্থাটি হলো ভূমিভিত্তিক রাডার। এটা ভূমি থেকেই অনেক দূর পরিসরের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যেমন আগেই নির্ণয় করতে পারে, একইভাবে এটা মহাকাশভিত্তিক সহায়-সম্পদ, যা ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে চিহ্নিত করে জানিয়ে দেয় তার গতিপথ কোথা থেকে কোন প্রান্তে। আবার এটা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতও করতে পারে। কিন্তু আক্রমণের সক্ষমতা না থাকলে এটাকে পরোক্ষ ব্যবস্থা হিসেবেই ধরতে হবে।

‘কৌশলগত স্থায়িত্ব হলো একটি শীতল যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণে আনার ধারণা। আর এটাই হলো চীনের বিশ্বভাবনার মর্মকথা।’

কিছু রাশিয়ার বিশ্লেষক চীনকে কেবল ভূমিভিত্তিক রাডারে সাহায্য দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে রাশিয়াকে। এক্ষেত্রে মহাকাশভিত্তিক রাডারে সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারে তারা বিরত থাকার পক্ষে। তবে রাশিয়ার এই সাহায্যকল্প কিছু অত্যাধুনিক ব্যবস্থায় জায়গা পাবে, যা বহিঃশক্তির হাতে রাডারের জট পাকিয়ে যাওয়া এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া থেকে সুরক্ষা দেবে।

পুতিনের ঘোষণায় এটা বোঝা যায়, চীনের এই এক প্রকল্পে রাশিয়ার সাহায্যকে ঘিরে অনেক তথ্য উদয় হবে এবং চারদিকে ঘোরাফেরা করবে। তাতে এই সাহায্য-সহযোগিতার প্রকৃত বৈশিষ্ট্য আঁচ করার মতো অনেক কিছুই থাকবে। তবে এটাও সত্য, সঠিকভাবে এই প্রকল্প সম্পর্কে অনুধাবন করা যাবে না।

কিন্তু পুতিনের পূর্বাভাসটি পারমাণবিক বোমা প্রতিরক্ষা নির্ভরশীলতায় চীনের নেতৃত্বের বিষয়ে রাশিয়ার মর্মমূলের সংস্রবকে ইঙ্গিত করেছে।

ক্যারনেজি-সিংহুয়া বিশেষজ্ঞ টং ঝাও তার টাইডস অব চেঞ্জ বইয়ে একটি চীনা প্রাক্কলন উল্লেখ করেছেন। তাতে দেখা যায়, চীনের প্রতিরক্ষা শক্তির মাত্র পাঁচ থেকে ১০ শতাংশই পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আক্রমণকে নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে টিকে থাকতে।

এই প্রাক্কলনটা অবশ্য সত্যিকার অর্থে সাধারণ জনগণের জন্য নয়, বরং ধারণা করা অন্যায়

হবে না যে, এখানে বেইজিং তার নিজস্ব কিছু দুর্বলতা প্রকাশ করে।

চীনের প্রতিটি প্রতিরক্ষা ব্যূহ মূলত তিনটি শাখায় বিভক্তÑভূমি থেকে উত্থিত ক্ষেপণাস্ত্র, কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক সাবমেরিন। এক্ষেত্রে সব শাখাকেই এখন নতুন নতুন উপায়ে আরও আধুনিকায়ন করা হচ্ছে, যা বেইজিংয়ের দুর্বলতাকে ছাপিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক, নজরদারি ও পুনরুদ্ধারÑএ তিনটি শাখাতেই অস্ত্র-সরঞ্জামের যে দুর্বার শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে চীন লড়তে প্রস্তুত হবে।

গত কয়েক দিন আগে পিআরসির ৭০তম বার্ষিকীতে বেইজিংয়ের মিলিটারি প্যারেডে কিছু অস্ত্রপাতি প্রদর্শিত হলো। হাইপারসনিক গ্লিড ভেহিকেল, রোড-মোবাইল সলিড ফুয়েল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাইলোসের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সক্ষম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এসব অস্ত্রের উন্নয়নে বেশ কার্যকর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তাতে অন্তত নিশ্চিত প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতা সৃষ্টি হবে।

অবশ্য বেইজিংয়ের এই দুর্বলতার মধ্যে একটি শক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। এই শক্তি চীনের স্বার্থ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি করছে। চীন এখানে রাশিয়ার সঙ্গে প্রবল ঘোরাচ্ছন্ন ভাগাভাগি করবে তাদের বৈশ্বিক কৌশলগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে।

এ বছর জুনে একই ভাষা ব্যবহারে তারা যৌথ বিবৃতি দিল। এখানে উভয়েই একই লক্ষ্যে কাজ করবে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে: উদ্যোগটি ‘কিছু বিরোধী রাষ্ট্রের সামরিক-রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় অসীম সুযোগ অর্জনের জন্য এবং পুরাদস্তুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সামরিক পরিমণ্ডলে কৌশলগত সুবিধা লাভের চেষ্টা।’

তাদের প্রথম নম্বরের চিন্তা হলো উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন। একই সঙ্গে এখানে আরও একটি বিবেচনা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২১ সালের পরে যদি যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া ‘স্টার্ট’ চুক্তিটি দীর্ঘায়িত না হয়, কিংবা তা অন্য কারও সঙ্গে হয় তবে সেক্ষেত্রে কী হবে?

যুক্তরাষ্ট্র (ও রাশিয়া) পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনে কোনোভাবেই কারও দ্বারা বাধাগ্রস্ত হবে না, যেখানে তাদের রয়েছে এক হাজার ৫৫০ ওয়ারহেডস। সম্ভবত এই হিসাবটি তাদের হীনম্মন্য করে তুলেছে। তারা নিজেদের ঝুঁকি মোকাবিলায় এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতার স্থায়িত্ব বাড়াতে এখন মরিয়া।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক দূরত্ব কমিয়ে আনতে, পূর্বসতর্কীকরণ এই ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ চীনের জন্য এখন অপরিহার্য। এটা পরমাণু বোমা প্রতিহত করতে চীনের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলবে। এমনকি এটার মাধ্যমে নতুন কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি হবে।

‘প্রথমেই আক্রমণ নয়’ এ নীতি ব্যবহার করেই চীন আক্রান্ত হলে আগেভাগেই নিক্ষেপে আগ্রাসী হতে পারবে। তাতে প্রথম আক্রমণ সহ্য করে প্রতিশ্রুত প্রতিশোধের পরিবর্তে চীন তার সক্ষমতা সম্পর্কে সংকেত দিতে পারবে এবং পরবর্তীকালে হামলা হলেই তাৎক্ষণিকভাবে হামলার হুমকি দিতে পারবে।

বেইজিংয়ের ওপর বিশেষ পর্যবেক্ষণে তাদের কার্যভার সম্পর্কে জানা যায়। তারা তাদের সেনাবাহিনীকে এই আদেশ দিয়ে রেখেছেÑযুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আক্রমণে চীনকে তাদের সব পারমাণবিক অস্ত্রসহ যাবতীয় অস্ত্রের নিরস্ত্রীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের প্লেবুক থেকে মুছে ফেলো। কিন্তু ‘কৌশলগত স্থায়িত্ব’র এ বিষয়ে এটাই কি আসলে চীনের বোধগম্য? এটা আসলে পুরোপুরি স্পষ্ট কথা নয়।

চীনের ভাষা প্রতিরক্ষামূলক। সংকটকালে আধিপত্যবাদী আচরণকে আরও তীব্র করতে যুক্তরাষ্ট্র যেন এই অঞ্চলে কোনো সহযোগিতামূলক সিঁড়ি খুঁজে না পায়Ñএ বিষয়টিকেই তারা প্রাধান্য দিচ্ছে। তবে চীনের প্রতিরক্ষা নীতির কথা এখানেই শেষ নয়। তারা বিভিন্ন ধারায় তাদের নীতিমালাকে সন্নিবেশন করেছে। প্রতিরোধকে তাদের প্রধান ভাষা হিসেবে বলা হলেও তাদের নীতিমালায় আরও অনেক আক্রমণাত্মক সিদ্ধান্ত রয়ে গেছে।

‘কৌশলগত স্থায়িত্ব’ ছাড়া চীনাদের সুযোগগুলো তাইওয়ান স্ট্রেইট ও বিভিন্ন দ্বন্দ্বের মধ্যেই বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের একটি কঠিন যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হবে। তবে চীন যদি কৌশলগত স্থায়িত্ব বাড়িয়ে একটি সমতায় পৌঁছাতে পারে, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও বড় আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণের সুযোগ লাভ করবে। 

একটি সময় ছিল যখন চীনের সঙ্গে রাশিয়ার পূর্ব রাষ্ট্রকাঠামোর সম্পর্ক দা-কুমড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। এটা আজ থেকে ৫০ বছর আগের ইতিহাস। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন জিনজিয়াঙে অবস্থিত চীনের পারমাণবিক পরিকাঠামোতে পারমাণবিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু পুতিন সেই ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে সরে এসে এখন চীনের সঙ্গে এমন এক জোট সম্পর্কে পৌঁছেছে, যাকে বহুমুখী কৌশলী অংশদারিত্বের পরিপূর্ণ বোঝাপড়া বলা যায়।

ইতিহাস ঘাঁটলে সিনো-রাশিয়ান তিনটি চুক্তির খোঁজ মেলে। এগুলো ১৮৯৬, ১৯৪৫ ও ১৯৫০ সালে সম্পন্ন হয়। কিন্তু এর প্রত্যেকটিই ভেস্তে যায় কেবল রাশিয়ার বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। এখন আবারও চুক্তি হতে দেখা যাচ্ছে। এই চুক্তিটি আবার চীনের প্রযোজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠিত হচ্ছে। অবশ্য চীন রাশিয়ার সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক জোটবদ্ধতায় যেতে চায় না। কিন্তু পরিস্থিতি চীনকে এমন অংশীদারিত্বে পৌঁছাতে বাধ্য করছে। কেননা চীনকে এখন কয়েকটি খাতে প্রাধান্য দিতে হচ্ছে। এগুলো হলোÑসামরিক কর্মসূচি, শক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া প্রভৃতি। এসব খাতে চীন রাশিয়ার সহায়তা চায়।

এসব সাধারণ স্বার্থ ইতিহাসের ঝুলিকে ছাপিয়ে যায়, তোয়াক্কা করে না। ‘কৌশলগত স্থায়িত্ব’ হলো একটি শীতল যুদ্ধের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ধারণা, যা এখন চীনের বিশ্বভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। রাশিয়া তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার দৌড়ে এখন চীনকে শক্তিশালী করতে চাইছে। এক্ষেত্রে রাশিয়াকে হয়তো অনেক বেশি কাঠখড় পোড়াতে হবে। কেননা রাশিয়ার নিজস্ব ক্ষমতা যে হারে ত্বরান্বিত হয়েছে, তাতে চীনের সঙ্গে তাদের একটি তফাত সৃষ্টি হয়ে রয়েছে।

আদর্শিক রূপান্তর এখানে ঘটেছে। আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ পারমাণবিক ভারসাম্য রক্ষার নির্ভেজাল ধারণা থেকে এই বৈশ্বিক আকাক্সক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। এই রূপান্তরে রাশিয়া চীনকে সেই

সাহায্য দেবে, যে সাহায্যটুকু রাশিয়ার কাছে চীনের প্রয়োজন রয়েছে।

ডিরেক্টর, এশিয়া প্রোগ্রাম, ইনস্টিটিউট মন্টেইগনি

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে

ভাষান্তর: মিজানুর রহমান শেলী

সর্বশেষ..