প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ দশে হন্ডুরাসের গার্মেন্টশিল্প

শেয়ার বিজ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ ১০ পোশাক রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় রয়েছে হন্ডুরাস। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস নামা সত্ত্বেও দেশটির গার্মেন্টশিল্পের বেশ বিপণন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। খবর: দ্য গার্ডিয়ান।

সান পেড্রো সুলা হন্ডুরাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এ শহরটি বৃহৎ শিল্প গার্মেন্টের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানকার গিলডান অ্যান্ড হেন্স কারখানায় প্রোডাকশন ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন অ্যালান। তার কারখানায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের জন্য মোজা ও আন্ডারগার্মেন্ট তৈরি করা হয়। তার কারখানাটি হন্ডুরাসের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) অবস্থিত।

গত শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে হন্ডুরাসে এই ইপিজেড গঠন করা হয়। সময়ের সঙ্গে এ অঞ্চলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। অ্যালানের মতো অনেক কর্মী তাদের কর্মজীবন শুরু করেন এখানকার নানা প্রতিষ্ঠানে। তবে ব্যবস্থাপনা পরিষদে কাজের সুবাদে গার্মেন্টকর্মীদের তুলনায় বেতনভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বেশি পান অ্যালানের মতো কর্মীরা। তার মতো শিক্ষিত যুবকরা এ খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। তবে মজুরি নিয়ে এখনও ধুঁকছে দেশটির গার্মেন্ট খাত। বর্তমানে এ খাতের কর্মীরা ২৬৩ থেকে ৪৬৫ ডলার পর্যন্ত মাসিক মজুরি পেয়ে থাকেন। একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কোনো কল সেন্টারে চাকরিরতদের বেলায় এ বেতন প্রায় ৫০০ ডলার।

সস্তা শ্রমের কারণে হন্ডুরাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক খাতের অনেক ব্র্যান্ড তাদের পণ্য প্রস্তুত করে থাকে। এতে হন্ডুরাসের অনেক মানুষের কর্মসংস্থান দেশটির অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মানুষ গরিব রয়ে গেছে।

হন্ডুরাসে গার্মেন্ট খাতের পথচলা শুরু হয় আশির দশকে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার উত্থান নিয়ে চিন্তায় ছিলেন। এজন্য এ অঞ্চলে তিনি ক্যারিবিয়ান বেসিন ইনিশিয়েটিভ (সিবিআই) গঠন করেন। এর আওতায় হন্ডুরাসসহ কয়েকটি দেশকে সামরিক সহায়তা করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত পণ্য প্রবেশের সুবিধা দেয়া হয়। এ সুযোগটি কাজে লাগায় হন্ডুরাস। যুক্তরাষ্ট্র তখন এশিয়ার কয়েকটি দেশ থেকেও পোশাক আমদানি করত। তবে ভৌগোলিক সুবিধা ও সস্তা শ্রমের কারণে ক্যারিবিয়ান বেসিন তাদের কাছে ভালো গন্তব্য ছিল।

সিবিআই পুরোদমে কাজ শুরু করে ১৯৮৪ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সটাইল করপোরেশনস, অ্যাপারেল ফার্মস, আমদানিকারক ও খুচরা ক্রেতারা ক্যারিবিয়ান বেসিনকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়। এরপর ১৯৮৬ সালে স্পেশাল অ্যাকসেস প্রোগ্রাম (এসএপি) চালু করে যুক্তরাষ্ট্র। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাপড় ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের সেলাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। এ প্রোগ্রামও শুল্কমুক্ত রাখা হয়।

এসব প্রোগ্রামের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র হন্ডুরাসে অবকাঠামো নির্মাণ, পানি সরবরাহ, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ, কর ছাড়, প্রশিক্ষণ প্রভৃতি সুবিধা দেয়। এসব খাতে স্পনসর করে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও ইউএসএইড। এর পরও তীব্র প্রতিযোগিতায় পড়ে হন্ডুরাস, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া, জ্যামাইকা, তাইওয়ান, হংকং, চীন, বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতা করতে হয়। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের পোশাক প্রস্তুত করার কাজ। এ তালিকায় যুক্ত হতে থাকে ওয়ালমার্ট, কেমার্ট, স্যাকস ফিফথ এভিনিউ, কেলভিন ক্লেইন, ক্রিশ্চিয়ান ডিওর, ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট, গ্যাপ প্রভৃতি। এর সঙ্গে বাড়তে থাকে গার্মেন্ট খাতনির্ভর ধনিক শ্রেণি। তারা ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্টের (এফডিআই) মাধ্যমে নিজেদের সম্পদ বাড়াতে থাকেন। তবে হন্ডুরাসের সরকার শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো শুরু করলে ধনিক শ্রেণি অসন্তুষ্ট হয়। তারা এর বিরোধিতা শুরু করেন।

নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যায় দেশটির তৈরি পোশাক খাত। এসব সমস্যা সমাধানে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্রেতাসহ দেশটির সরকার আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। কাঁচামালের সহজলভ্যতা, কারিগরি দক্ষতা অর্জন, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাজারজাতকরণে নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়। শ্রমিকদের কর্মস্থলে ঝুঁকি কমিয়ে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়। উপরন্তু ক্রেতাদের নীতিমালা বাস্তবায়নে সক্ষম হয় হন্ডুরাস। এ কারণে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ দশে টিকে রয়েছে দেশটি।