প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের প্রভাব: কমেছে পাট রফতানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে লেনদেন

জাকারিয়া পলাশ : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের প্রভাবে ধুঁকছে বাংলাদেশের পাট খাত। বাংলাদেশ থেকে ইরানে রফতানি হওয়া পাটপণ্যের বিপরীতে ডলার লেনদেন নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। গত বছরের শুরুর দিকে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার খবরে অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে অবস্থার কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৯ হাজার টন পাটের সুতা (ইয়ার্ন) ইরানে রফতানি হয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে রফতানির পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার টন। সংশ্লিষ্টরা জানান, এর আগেও কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে পাটের সুতা রফতানির পরিমাণ ছিল ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টনের মধ্যে। এছাড়া পাটের তৈরি ব্যাগ ও বিভিন্ন উপাদান রফতানি হয় ইরানে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ইরানে পাটের সুতা ও অন্যান্য টেক্সটাইল পণ্যের (এইচএস কোড ৫৩০৭) রফতানি হয়েছে ডলারের অঙ্কে তিন কোটি ১১ লাখ ৯৩ হাজার ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রফতানির পরিমাণ চার কোটি ২২ লাখ ৪৩ হাজার ডলার, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চার কোটি ৫০ লাখ ২৯ হাজার ডলার, ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাঁচ কোটি ২৪ লাখ ৮৭ হাজার ডলার এবং ২০১১-১২ অর্থবছরে ছয় কোটি ৩০ লাখ ছয় হাজার ডলার রফতানি হয়েছে। অর্থাৎ ডলারের অঙ্কে রফতানির পরিমাণ গত পাঁচ বছরে অর্ধেকেরও বেশি নেমে গেছে।

রফতানিকারকরা বলছেন, পাটের পণ্য দেশটিতে পাঠানোর পর প্রাপ্য ডলার আনা সম্ভব হয়নি অনেক ক্ষেত্রে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পাটপণ্যের জন্য ইরান মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট দেশ। ইরানের স্থানীয় বাজারে কার্পেটশিল্প ঐতিহ্যবাহী হওয়ায় সেখানে পাটের সুতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। এর পাশাপাশি ইরান থেকে পাটের পণ্যগুলো মধ্য এশিয়ার সমুদ্রসীমাবিহীন (ল্যান্ডলকড) দেশগুলোতে যায়।

এদিকে চলতি মাসে ভারতের বাজারে পাটপণ্য রফতানিতে বড় অঙ্কের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের কারণে অনেক পাট রফতানিকারকের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ওইসব রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করেছে। ইরান সেক্ষেত্রে একটি ভালো বাজার হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।

কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেও আন্তর্জাতিক নানা বাধা-নিষেধের কারণে ইরানে পাটপণ্য রফতানি সহজ হচ্ছে না বলে জানান ব্যবসায়ীরা। রফতানিকারকরা বলছেন, জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আগে বিশ্বব্যাপী লেনদেনের জন্য আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের (সুইফট) মাধ্যমে ডলার লেনদেন হতো। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার ফলে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ইরানে পাট রফতানির পর তার মূল্য বাবদ ডলার আনা কঠিন হতো। এ অবস্থায় ইরানের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তৃতীয় কোনো দেশ থেকে ডলার পাঠাচ্ছে। কিন্তু চার বছর ধরে সেক্ষেত্রেও জটিলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। নিউইয়র্ক ব্যাংক ইরানের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনের তথ্য পেলে আর ডলার ছাড় না করে লেনদেন স্থগিত করে রাখছে। এছাড়া পারমাণবিক সরঞ্জামাদির বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইরানের অনেক প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে আর্থিক প্রবাহ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয় বলে জানান রফতানিকারকরা।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (আকু) নামে একটি ব্যবস্থা চালু আছে এশিয়ার ৯টি দেশের মধ্যে। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ইরানÑএ ৯টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আকু নেটওয়ার্কের সদস্য। তেহরানে রয়েছে এর সদর দফতর। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আকু ব্যবস্থার অধীনে দুই দেশের পণ্যের রফতানি বা আমদানির জন্য ডলার লেনদেনের হিসাব হয় প্রতি ৬০ দিন পর পর। ৬০ দিনের চেয়ে বেশি সময় নিলে দাতা দেশকে দিন হিসাবে সুদ পরিশোধ করতে হয়। ৬০ দিন লেনদেনের জন্য পর্যাপ্ত সময় হওয়ায় এই ব্যবস্থা দাতা ও গ্রহীতা উভয়পক্ষের জন্য সুবিধাজনক ছিল।

ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ডলার লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে এ আকু-অ্যাকাউন্টের ব্যবহার করতো সোনালী ব্যাংক। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সেই আকুর মাধ্যমেও লেনদেন করা যাচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

পরে গত ২০১৫ সালের শেষ দিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ার কথা শোনা যায়। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দেওয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের খবর পাওয়া গেছে। সুইফট কোডের সঙ্গেও ইরানি ব্যাংকগুলোর সম্পর্ক আবার স্থাপিত হতে যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। ফলে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সহজ হবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করেন। বাংলাদেশের পাটপণ্য রফতানিকারকরা আশা করেছিলেন, ওই আকু-অ্যাকাউন্টটি পুনরায় চালু হবে। কিন্তু বিষয়টিতে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে সর্বশেষ অবস্থা জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ)।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রনীতি-বিষয়ক দফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের লেনদেন শুরু করছে না। আর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক মনোভাব ছাড়া কেউ ইরানের সঙ্গে সহজে লেনদেন করতে পারবে না। এ নিয়ে সোনালী ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেন শাখার কর্মকর্তারাও একই কথা বলেছেন।

এ বিষয়ে গত বছরের নভেম্বরে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হককে একটি চিঠি দেন বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি আহমেদ হোসেন। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের লেনদেনের হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক এর অনুমোদিত সোনালী ব্যাংক দ্বারা পরিচালিত আকু-এর মাধ্যমে হয়ে আসছিল। নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে এ ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। এ কারণে ইরানের সঙ্গে আমাদের রফতানি বাণিজ্য নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

এখন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও শিথিল করার কারণে পুনরায় আকু-এর মাধ্যমে লেনদেন চালু করার যায় কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জানতে চেয়েছিল জুট স্পিনার্স। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ‘ইরানের ওপর জাতিসংঘের বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করা হলেও, সে বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো সঠিক তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নেই। ফলে আকু-অ্যাকাউন্ট পরিচালনার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।’

এ বিষয়ে বিজেএসএ’র সভাপতি আহমেদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আকু অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এজন্য সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা জরুরি।’