স্পোর্টস

যেভাবে ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনা

ক্রীড়া ডেস্ক: আর্জেন্টিনায় মহানায়ক। শুধু দেশটিরই নয়, ফুটবল বিশ্বেরই কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা। খেলার বাইরেও নানা ঘটনা-অঘটনায় বারবার হয়েছেন সংবাদ শিরোনাম। এবার সব বিতর্ক-আলোচনা-শিরোনামের ঊর্ধ্বে উঠে গেলেন তিনি। ৬০ বছর বয়সে এসে বুধবার রাতে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন সাবেক তারকা এ ফরোয়ার্ড। তার মৃত্যুতে পুরো পৃথিবীর ক্রীড়াঙ্গনেই নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ কিংবদন্তির মৃত্যুতে অনেকেই দিয়েছেন আবেগঘন স্ট্যাটাস।

১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনেস আইরেসের লানুসের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ম্যারাডোনা। বেশ কষ্টেই কেটেছে তার শৈশব। পড়াশোনা নয়, ফুটবলের প্রতিই ছিল তার নেশা। সারাক্ষণ বল নিয়ে পড়ে থাকতেন। ১০ বছর বয়সে এস্ত্রেয়া রোজার হয়ে খেলেন। এরপর আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৭৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে মাঠে নামেন। তখন তার বয়স ১৬ বছর ১২০ দিন। ১৯৭৮ সালে বয়সে কম হওয়ার কারণে বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়েন।

তবে হাল ছেড়ে দেননি এ ফরোয়ার্ড। সে চেষ্টাতেই ১৯৭৯ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত যুব বিশ্বকাপে জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন তিনি। অধিনায়ক হিসেবে শিরোপাও জয় করেন। ২১ বছর বয়সে দলের সঙ্গে ইউরোপে পাড়ি জমান স্পেনে বিশ্বকাপ খেলার জন্য। ব্রাজিলের কাছে ৩-১ গোলে হেরে আর্জেন্টিনা বিদায় নেয়। বোকা জুনিয়র্সকে ১৯৮২ সালে লিগ চ্যাম্পিয়ন করেন ম্যারাডোনা। এরপর তিনি চলে যান বার্সেলোনায়। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকে অবাক করে ১৯৮৪ সালে ৪.৬৮ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ইতালীয় ক্লাব লাপোলিতে যোগ দেন এ তারকা।

১৯৮৭ ও ১৯৯০ সালে নাপোলির হয়ে সিরি আ’ জিতেছেন তিনি। জিতেছেন উয়েফা কাপও। আর্জেন্টিনার জার্সিতে রেকর্ড ১৬ ম্যাচে বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিয়েছেন ম্যারাডোনা। সবমিলিয়ে বিশ্ব আসরে খেলেছেন ২১ ম্যাচ। আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে মাত্র ১৫ বছরে বয়সে ১৯৭৬ সালে অভিষেক তার। এক বছর পরে আলবেসেলেস্তেদের জার্সি গায়ে চাপান তিনি। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে তাকে দলে নেওয়া হয়নি বেশি ছোট বলে! ম্যারাডোনা প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন ১৯৮২ সালে। তবে এ আসরে নিজেকে ঠিক মেলে ধরতে পারেননি। শুধুমাত্র ২টি গোল করেছিলেন।

পাশাপাশি ব্রাজিলের সাথে শেষ খেলায় লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। তবে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে একক আধিপত্য দেখিয়েছিলেন এ কিংবদন্তি। নিজে করেন ৫টি গোল। এই বিশ্বকাপটি ম্যারাডোনাকে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরে। কেননা এই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ এই গোল দুটি করেন। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনা। এই বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা বিশ্বকাপের সেরা খেলায়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতে নেয়।

১৯৯০ এর বিশ্বকাপে ইনজুরি ম্যারাডোনার শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। গোড়ালির ইনজুরি কারণে এই বিশ্বকাপে নিজেকে ঠিকভাবে মেলে ধরতে পারেননি ম্যারাডোনা। কোনো রকমে পার হন প্রথম পর্ব। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই প্রতিপক্ষ দলের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টার ফাইনালে ইয়োগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ১২০ মিনিটেও কোনো গোলের মুখ দেখেনি। ট্রাইব্রেকারে ম্যারাডোনার দুর্বল ঠেকিয়ে দিলেও আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে ম্যাচটি জিতে। এবার সেমিফাইনাল, প্রতিপক্ষ ইতালি। এই ম্যাচটিও ১২০ মিনিট পর্যন্ত গড়ায়। ফলাফল ১-১, ট্রাইব্রেকারে ইতালিকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায় আর্জেন্টিনা।

কিন্তু বিতর্কিত পেনাল্টিতে পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। ১৯৯১ সালে ইতালিতে ড্রাগ টেস্টে কোকেইনের জন্য ধরা পড়ায় ১৫ মাসের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ হন ম্যারাডোনা। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইফিড্রিন টেস্টে ইতিবাচক ফলাফলের জন্য তাকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালে ফুটবলকে বিদায় বলে দেন ম্যারাডোনা। শত কোটি ভক্তদের চোখের জলে ভাসিয়ে বুট জোড়া তুলে রাখেন শোকেসে।

১৯৯৯ সালে আর্জেন্টিনার কনেক্স ফাউন্ডেশন তাকে হীরক কনেক্স পুরস্কার প্রদান করে যা আর্জেন্টিনার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাংস্কৃতিক পুরস্কার। তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয় খেলাধুলায় আগের দশকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হওয়ার কারণে। খেলোয়াড়ী জীবন শেষ করে ২০০৮ সালে ম্যারাডোনা জাতীয় দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পান। ১৯ নভেম্বর, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তার প্রথম অ্যাসাইনমেন্টে আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে জয় পায়।

দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০১০ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দায়িত্ব ছাড়েন ম্যারাডোনা। এরপর ২০১১ সালের মে মাসে ম্যারাডোনা দুবাইয়ের ক্লাব আল ওয়াসলের কোচ হিসেবে যোগদান করেন। প্রত্যাশাপূরণ করতে না পারায় ২০১২ সালে চাকরি হারান আর্জেন্টাইন সুপারস্টার। মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ায় গত ২ নভেম্বর ম্যারাডোনাকে লা পালটা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ভর্তি করানোর একদিন পর তার পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ম্যারাডোনা সুস্থ আছেন।

কিন্তু দুইদিন পর তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করানো লাগে এবং ১১ নভেম্বর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। তবে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি মেলেনি। মদ্যপান সংক্রান্ত সমস্যার কারণে সরাসরি তাকে বুয়েনস আয়ার্সের একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই সময় গত সপ্তাহদুয়েক ধরে সেখানেই ছিলেন তিনি। সেখানেই বুধবার চিরবিদায়। ম্যারাডোনা নিষিদ্ধ হয়েছেন, নির্বাসিত হয়েছেন। ফিরে এসেছেন। মুটিয়ে গেছেন, আবার শুকিয়েছেন। মৃত্যুকে চুমু খেয়ে এসেছেন। আবার ফিরে জীবনকে করেছেন আলিঙ্গন। আনন্দের কান্না কেঁদেছেন, আর ব্যর্থতায়ও চোখের জলে দুকূল ভাসিয়েছেন। কাঁদিয়েছেন অনেক বার, শেষ বার কাঁদালেন মৃত্যুর পর। ম্যারাডোনা হেরেছেন, কিন্তু তার আগে জিতিয়ে দিয়ে গেছেন ফুটবলকে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..