মত-বিশ্লেষণ

যে জীবন বাঙালির স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য নিবেদিত

কাজী সালমা সুলতানা: বাঙালি জাতির সংগ্রাম ও উম্মোষের এক অনন্য অধ্যায় ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল। মুক্তির এই দীর্ঘ আন্দোলনে ষাটের দশকের এক রাজনীতিবিদ ‘কাজী আরেফ আহমেদ’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়েই তিনি ছিলেন প্রথম কাতারের যোদ্ধা, সংগ্রামী চেতনার এক অগ্রসৈনিক। ১৯৬০ সালে ১৮ বছর বয়সে রাজনীতিতে যুক্ত হন কাজী আরেফ আহমেদ। হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও এ সময়ে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন তিনি। আর এর মাধ্যমেই মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়ে রাজনীতিতে সরব পদচারণা শুরু করেন।

জগন্নাথ কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে  সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এ দশক ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ চেতনার উšে§ষকাল এবং পাকিস্তানি শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার সময়। কাজী আরেফ তার ঘনিষ্ঠ দুই সহযোদ্ধা সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গড়ে তোলেন গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন পূর্ব বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’। ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ‘ছয় দফা’ এগিয়ে নেওয়া, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, জাতীয় পতাকা রূপায়ণ, ’৭০-এর নির্বাচন, জাতীয় সংগীত নির্ধারণ, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণাসহ প্রতিটি পর্বেই স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে গেছে। এই স্বাধীন পূর্ববাংলা বিপ্লবী পরিষদ মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স-বিএলএফ বা মুজিববাহিনী নামে পরিচিত হয়। ১৯৬৬ সালে যখন বঙ্গবন্ধু লাহোর বিমানবন্দরে প্রেস কনফারেন্স করে ছয় দফা পেশ করেন। তার আগেই ১৯৬৬ সালের আগেই বিপ্লবী পরিষদের কার্যক্রম দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃত করতে কাজী আরেফের ভূমিকা রাখেন। শুধু তাই নয়, ’৬৬ সালে বাঙালির মুক্তি সনদ ‘ছয় দফা’ ঘোষণার ফলে বাঙালির স্বাধিকার বিষয়টা সামনে চলে আসে। সেসময় ছয় দফার ঘোষণা জাতীয় নেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু করে। সব বিতর্ককে পাস কাটিয়ে সেসময়ের ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি কাজী আরেফ আহমেদ সর্ব প্রথম বিবৃতি দিয়ে ছয় দফার প্রতি সমর্থন জানান এবং তার নেতৃত্বে ঢাকার রাজপথে বিশাল মিছিল হয়। কাজী আরেফ আহমেদের পৈতৃক নিবাস ঢাকার টিকাটুলীর ১৪/৩ অভয় দাস লেনে। ১৯৬৪ সাল থেকে তার পৈতৃক নিবাসের টিনশেডের বাড়িতে একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন ছিল। সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার পর এ মেশিনটিকেই তিনি কাজে লাগান প্রচারযন্ত্র হিসেবে। নিজ হাতে স্বাধীনতার ইশতেহার লিখে এ সাইক্লোস্টাইলে ছেপে বিতরণ করতেন। আর এসব ইশতেহার পড়া শেষে পুড়িয়ে ফেলা হতো।

আইয়ুব খানের পতনের পর ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন দেন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তথা ছয় দফার প্রতি বাঙালি নিরঙ্কুশ সমর্থন ব্যক্ত করে। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিকে ক্ষমতায় বসতে না দিয়ে টালবাহানা শুরু করে। এ সময়ে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। এরই অংশ হিসেবে ১৯৭০ সালে গঠন করা হয় ‘জয় বাংলা বাহিনী’। এর অন্যতম সংগঠক ছিলেন কাজী আরেফ আহমেদ। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ একে একে স্বাধীনতার সব প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। নির্ধারণ করে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ও স্বাধীনতার পতাকা। কাজী আরেফ আহমেদ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকার অন্যতম রূপকার। তিনি ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) এক কক্ষে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার নকশা করেন। প্রাথমিকভাবে এটিকে জয় বাংলা বাহিনীর পতাকা বলা হলেও বিপ্লবী পরিষদের সিদ্ধান্ত ছিল এটিই হবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। বঙ্গবন্ধুর সমর্থন নিয়েই এটি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কাজী আরেফ আহমেদ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি দেরাদুনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে গঠন করা হয় বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী। তিনি ছিলেন পশ্চিমাঞ্চলীয় সেক্টরের উপ-অধিনায়ক। বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর চারটি সেক্টরের সঙ্গে হাইকমান্ডের একজন হিসেবে সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন। মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার প্রধান ছিলেন তিনি।

স্বাধীন দেশে আত্মপ্রকাশ করা প্রথম রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের অন্যতম উদ্যোক্তা কাজী আরেফ আহমেদ। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে তিনি এ সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন আমৃত্যু। ১৯৭৫-এ নৃসংশভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে শাহাদাতবরণের পর আওয়ামী লীগ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে সক্রিয় করতে কাজী আরেফ আহমেদ সমমনা দলগুলো নিয়ে গড়ে তোলেন ১০ দলীয় ঐক্যজোট। তিনি রাজনীতিতে সেনাছাউনির হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধী ছিলেন। 

আজীবন প্রচারবিমুখ এই সব্যসাচী রাজনীতিবিদ কাজী আরেফ নেপথ্যে থেকে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম চালিয়েছেন। দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে তিনি পালন করেছেন নীতিনির্ধারকের ভূমিকা। ১৯৮৭ সালের জুনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি গ্রেপ্তার করা হন। ৯ মাস কারাভোগের পর ১৯৮৮ সালের ২৯ মার্চ তিনি মুক্তি পান। রাজনীতিতে স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে তাদের ক্ষমতাবান করে তোলে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তারা। সামরিক শাসক স্বৈরাচার এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও কর্মসূচি দিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৮৮ সালে অক্টোবর মাসে এখনই সময় সাপ্তাহিকীতে ধারাবাহিক দুই পর্বে লেখেন, ‘জল্লাদের ভূমিকায় জামাত ও জামাত আল্লাহকেও ভয় করে না’ শিরোনামে। নব্বইয়ের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানেরও অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি।

১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম জামায়াতের আমির হিসেবে প্রকাশ্যে আসেন। এ সময় কাজী আরেফ আহমেদ সমমনা রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক ও সামাজিক দলকে সংগঠিত করে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে তোলেন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’। এ জাতীয় সমন্বয় কমিটির নেতৃত্বে আন্দোলনের এক পর্যায়ে গণআদালত গঠন করা হয়। ২৬ মার্চ ১৯৯২, ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালতে গোলাম আযমের বিচার করা হয় এবং দোষী প্রমাণিত হওয়ায় ফাঁসিতে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রায় হয়। এ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করতে অসামান্য অবদান রাখে। সে চেতনাতেই বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু প্রচলিত আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দেখে যেতে পারেননি কাজী আরেফ আহমেদ। মহান মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানী ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক জনসভায় প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হলেও সব অপরাধীর সাজা কার্যকর হয়নি। কয়েকজন এখনও পলাতক রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের হুকুমদাতা কে বা কারা, সে বিষয়টা আজও আড়ালেই থেকে গেছে।

বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক নিকোলাই অস্ত্রভোস্কি তার ‘ইস্পাত’ উপন্যাসে বলেছেন, ‘জীবন মানুষের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। এই জীবন সে পায় মাত্র একটিবার। তাই এমনভাবে বাঁচতে হবে, যাতে বছরের পর বছর লক্ষ্যহীন জীবনযাপন করার যন্ত্রণাভরা অনুশোচনায় ভুগতে না হয়, যাতে বিগত জীবনের গ্লানিভরা হীনতার দগ্ধাগ্নি সইতে না হয়। এমনভাবে বাঁচতে হবে, যাতে মৃত্যুর মুহূর্তেও মানুষ বলতে পারে, আমার সমগ্র জীবন, আমার সমগ্র শক্তি আমি ব্যয় করেছি এই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আদর্শের জন্য মানুষের মুক্তির সংগ্রামে।’

কাজী আরেফ আহমেদের জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, তার জীবন পরিপূর্ণ ছিল এক সংগ্রামী চেতনা নিয়ে, যে চেতনাজুড়ে ছিল মানুষের মুক্তির গান, মানুষের মুক্তির সনদ। তার জীবন রচিত হয়েছিল শুধুই গর্ব করার মতো অধ্যায় নিয়ে, যা ছড়িয়ে দিতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মঝে। তার জীবন ছিল শুধুই দেশ ও মানুষের মুক্তির জন্য নিবেদিত। তারই আদর্শ, জীবনধারা ও প্রদর্শিত পথে তার চেতনায় এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..