মত-বিশ্লেষণ

যোগে অনেক রোগ থেকে আরোগ্য সম্ভব

শচীন্দ্রনাথ হালদার: স্বাস্থ্য মানবজীবনের অমূল্য সম্পদ। সমৃদ্ধি ও সাফল্য অর্জনে সুস্বাস্থ্য একটি পূর্বশর্ত। কিন্তু আমরা যথাসময়ে স্বাস্থ্যের পরিচর্যা করতে না পারায় অসময়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হই। যোগময় জীবন পরিচালিত করলে আমরা সুস্থ, সবল, কর্মময় ও দীর্ঘজীবন লাভ করতে পারে। এ যুগে মানুষের ১১৬ বছর আয়ু পাওয়া সম্ভব। চার হাজার বছরেরও বেশি আগে ঋষি পতঞ্জলি এ যোগ আবিষ্কার করেন। সে সময় যোগকে একটি গুপ্তবিদ্যা ও গুহ্যতম তত্ত্ব হিসেবে মনে করা হতো। ফলে আধিকারিক যোগীরা উপযুক্ত শিষ্য বা ছেলেমেয়ে ছাড়া অন্যকে যোগশিক্ষা দিতেন না। এ সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কালক্রমে এ যোগ বিলুপ্ত হয়। বর্তমানকালে স্বামী বিবেকানন্দ যোগকে জনসমক্ষে সর্বসাধারণের শিক্ষার জন্য প্রচার করেন। বর্তমানে জনসাধারণের স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য যোগ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ২১ জুন ‘আন্তর্জাতিক যোগ দিবস’ পালিত হচ্ছে। যোগ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা। সব ধর্মের ও বর্ণের মানুষের যোগ করতে পারে।

যোগ বলতে সাধারণত রাজযোগ বোঝায়। রাজযোগ আট ভাগে বিভক্ত, যথাÑযম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধ্যান, ধারণা ও সমাধি। রাজযোগ ধর্মবিজ্ঞান। রাজযোগ অনুশীলনে ধর্মের যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত উত্তর প্রদানে যোগী সক্ষম হয়। প্রাণায়ামের যে অংশে প্রাণের স্থূল প্রকাশগুলোর বাহ্য উপায়ের দ্বারা জয় করার চেষ্টা করা হয়, তাকে পদার্থবিজ্ঞান বলে; আর প্রাণায়ামের যে অংশে মনঃশক্তিরূপ প্রাণের বিকাশগুলোকে মানসিক উপায়ের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়, তাকে রাজযোগ বলে। 

ধর্ম প্রত্যক্ষানুভূতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। সব ধর্মাচার্যই সৃষ্টিকর্তাকে দেখেছেন। তারা প্রত্যেকেই আত্মদর্শন করেছেন। সবই নিজ নিজ ভবিষ্যৎ দেখেছেন এবং অনন্ত স্বরূপ সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। প্রত্যক্ষানুভূতি ছাড়া কেউই ধার্মিক হতে পারে না। যে বিজ্ঞানের দ্বারা এসব অনুভূতি হয়, তার নাম যোগ।

যোগে চিত্তশুদ্ধি হয় এবং সাক্ষাৎ মুক্তি লাভ হয়। প্রকৃতিতে নিয়ন্ত্রণ করাকে যোগীরা নিজ কর্তব্য বলে মনে করেন। যোগীরা মন যাতে পবিত্র থাকে, এমন খাবার খেতে হবে। যোগী অধিক বিলাসিতা ও কঠোরতা দুইই পরিত্যাগ করবেন। অতিভোজনকারী, একান্ত উপবাসী, অধিক জাগরণকারী, অধিক নিদ্রালু, অতিরিক্ত কর্মপরায়ণ, অথবা একেবারে নিষ্কর্মা এদের মধ্যে কেউই যোগী হতে পারেন না।

মানবদেহ একটি জটিল বায়োকেমিক্যাল সংমিশ্রণে পরিচালিত হয়। দেহের অসংখ্য গ্রন্থি ও অর্গান থেকে অসংখ্য রস নির্গত হয়ে দেহকে পরিচালিত করে। সঠিকভাবে ও সঠিক পরিমাণে রস নিসৃত হলেই মানুষ সুস্থ থাকে, অন্যথায় রোগাক্রান্ত হয়। যোগ অনুশীলনে বিভিন্ন গ্রন্থি থেকে রস নিঃসরণে সমতা বিধান করে। ফলে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হয়।

যোগ মন নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। মন আত্মার যন্ত্রবিশেষ। এর দ্বারা আত্মা বাহ্য বিষয় গ্রহণ করে থাকে। মনের আবার অন্তর্দৃষ্টি আছে এবং এ শক্তিবলে মানুষ নিজ অন্তরের গভীরতম প্রদেশ দেখতে পারে। এ অন্তর্দৃষ্টিশক্তি লাভ করাই যোগীর উদ্দেশ্য। মনের সমুদয় শক্তিকে একাগ্র করে ভেতরের দিকে ফিরিয়ে ভেতরে কী হচ্ছে, তা যোগী জানতে চায়। যোগীরা বিশ্বাস করে, মনের একটি উচ্চাবস্থা আছে। যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে এ জ্ঞানাতীত অবস্থা। এ উচ্চাবস্থায় যোগী তর্কের অতীত এক পরমার্থ জ্ঞান বা অতীন্দ্রিয় জ্ঞান লাভ করে। যোগীরা মনে করে, মানবমনের শক্তি অসীম।

মন নিয়ন্ত্রণের প্রথম সোপান কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে বসে থাকা এবং মনকে নিজের মতো করে ভাবতে দেয়া। ধীরভাবে অপেক্ষা করে মনের গতি লক্ষ করতে হবে। জ্ঞানই শক্তি। যতক্ষণ জানা না যায় মন কী করছে, ততক্ষণ মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা যাবে না। মনে অনেক খারাপ চিন্তা আসবে, কিন্তু কিছুদিন পর পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, খারাপ চিন্তা ক্রমেই কমে আসছে। আরও কয়েক মাস পর আরও কমে আসবে এবং অবশেষে মন সম্পূর্ণ বশীভূত হবে। কিন্তু প্রতিদিন আমাদের ধৈর্যের সঙ্গে অভ্যাস করতে হবে।

মানুষ জ্ঞাতসারে যেসব কাজ করে, তাকে বিচারবুদ্ধির ক্ষেত্র বলা হয়। একটি ক্ষুদ্র বৃত্তের মধ্যেই মানুষের বিচারবুদ্ধি নড়াচড়া করতে বাধ্য। তার বাইরে যেতে পারে না। সৃষ্টিকর্তা আছেন কি না, অবিনাশী আত্মা আছে কি না, জগতের নিয়ন্তা পরম চৈতন্যময় কেউ আছেন কি নাÑযুক্তি এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। অথচ এসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না পেলে মানবজীবন উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে। মানবজীবনের নীতি, আত্মার অমরত্ব, সৃষ্টিকর্তা, প্রেম ও সহানুভূতি, সাধুত্ব, নিঃস্বার্থতা ও মহৎ সত্যগুলো যুক্তিতর্কের বাইরে থেকে আসে।

মানবজীবনের চরম লক্ষ্য এ আত্মার সাক্ষাৎ উপলব্ধি করা। মানুষ আত্মাকে উপলব্ধি করতে পারে না, কারণ তা প্রকৃতি, মন ও শরীরের সঙ্গে মিশে আছে। চিত্তহƒদে যত দিন একটি তরঙ্গ থাকবে, তত দিন আত্মার প্রকৃত স্বরূপ অনুভব হবে না। আত্মার স্বরূপ তিনটি। আত্মা সত্যস্বরূপ, আত্মা জ্ঞানস্বরূপ ও আত্মা আনন্দস্বরূপ। আত্মা যখন নিজ স্বরূপে নিজ মহিমায় অবস্থান করবে, তখনই জানা যাবে আত্মা মিশ্র বা যৌগিক পদার্থ নয়, আত্মাই জগতের একমাত্র নিত্য, অমিশ্র ও মৌলিক পদার্থ। সুতরাং আত্মার জš§ও নেই, মৃত্যুও নেই। আত্মা অমর, অবিনশ্বর, নিত্য, চৈতন্যময় ও সত্যস্বরূপ।

আত্মার উন্নতির বেগ বৃদ্ধি করে কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে মুক্তিলাভ করা যায়, তা যোগবিজ্ঞানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। প্রকৃতির অনন্ত শক্তিভাণ্ডার থেকে মানুষ শক্তি গ্রহণ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে কীভাবে শিগগির সিদ্ধিলাভ করা যায়, যোগীরা তার উপায় উদ্ভাবন করেছেন। রাজযোগ বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়Ñকীভাবে একাগ্রতা শক্তি লাভ করে শক্তি সঞ্চয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়।

শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাই প্রাণায়াম। যোগীর জন্য প্রাণ সাধনার বস্তু এবং রোগীর জন্য প্রাণ ঔষধি। প্রাণায়ামের ক্রিয়া তিনটি। যথাÑরেচক, পূরক ও কুম্ভক। শ্বাস বাইরে বের করে দেয়া, অর্থাৎ নিঃশ্বাসকে রেচক বলে। দেহের মধ্যে শ্বাস গ্রহণ করাকে পূরক বলে এবং দেহের মধ্যে বা দেহের বাইরে শ্বাস ধরে রাখাকে কুম্ভক বলে। গৃহীদের খুব বেশি কুম্ভক করা উচিত নয়। এতে ক্ষতি হতে পারে। অনেকের ধারণা, প্রাণায়াম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, আসলে তা নয়। যোগের ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশ লাভ প্রাণায়াম এবং ধ্যানেই হয়ে থাকে। প্রাণায়ামে সিদ্ধ হলে যোগীর কাছে অনন্ত শক্তির দরজা খুলে যায়। তিনি তখন অষ্টসিদ্ধি লাভ করেন। অষ্টসিদ্ধি হলো অনিমা, লঘিমা, মহিমা, প্রাপ্তি, প্রাকাম্য, বশিত্ব, ঈশিত্ব ও কামবসায়িত্ব (সত্য সংকল্পতা)। অষ্টসিদ্ধি লাভ হলে জগতের সব শক্তি ক্রীতদাসের মতো যোগীর আদেশ পালন করে। প্রাণকে যিনি জয় করেছেন, পুরো জগৎ তিনি জয় করেছেন। তার আদেশে মৃতদেহে প্রাণের সঞ্চার হতে পারে। প্রাণবায়ুর সঙ্গে অপ্রাণ বায়ুর মিলন ঘটিয়ে তিনি তখন ইচ্ছামৃত্যু লাভ করতে পারেন। আত্মদর্শন লাভ করলে মৃত্যুভয় ও দুঃখ-কষ্ট আর থাকে না। অরিষ্ট নামক মৃত্যু লক্ষণগুলোর ওপর মনঃসংযোগ করলে যোগী মৃত্যুর সময় জানতে পারেন।

চিন্তার একমুখিতাই ধ্যান। ধ্যানাবস্থা মানবজীবনের সর্বোচ্চ অবস্থা। ইতর প্রাণীর সুখ ইন্দ্রিয়ে, মানুষের সুখ বুদ্ধিতে এবং দেবমানব ধ্যানেই আনন্দ লাভ করেন। ধ্যান জ্ঞান অর্জনের উপায়। যখন জ্ঞানলাভ হতে থাকে, তখন একটির পর আরেকটি করে সাতটি পর্যায়ে আসতে থাকে। প্রথম অবস্থায় যোগী বুঝতে পারেন যে, তিনি জ্ঞানলাভ করছেন। প্রথম অবস্থায় অসন্তোষের ভাব চলে যাবে। দ্বিতীয় অবস্থায় সব দুঃখ চলে যাবে। তৃতীয় অবস্থায় পূর্ণজ্ঞান লাভ করবেন। চতুর্থ অবস্থায় সমস্ত কর্মের অবসান হবে। পঞ্চম অবস্থায় চিত্ত বিমুক্তি অবস্থা আসবে। ষষ্ঠ অবস্থায় আত্মজ্ঞান হবে এবং সপ্তম অবস্থায় যোগী বুঝতে পারবেন, আত্মারূপে কেবল আমরাই ছিলাম। মন বা শরীরের সঙ্গে আত্মার কোনো সম্পর্ক নেই। আত্মা একাকী, নিঃসঙ্গ, সর্বশক্তিমান, সর্বব্যাপী ও সদানন্দ।

দীর্ঘস্থায়ী গভীর ধ্যানকে সমাধি বলে। সমাধিতে গিয়ে সাধক মহাজ্ঞানী হয়ে উঠতে পারেন। এ সমাধিতেই সাধক অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখে থাকেন। সমুদয় মন যখন একটিমাত্র তরঙ্গরূপ পরিণত হয়, মনের এ একরূপতার নামই সমাধি। এ সমাধিতেই সাধকের আত্মদর্শন হয়।

প্রাণায়াম ও আসন নিয়মিত অনুশীলন করলে দেহের সংশ্লিষ্ট রোগ নির্মূল হয়। কভিড-১৯ প্রতিরোধে প্রাণায়াম খুবই কার্যকর। প্রাণায়াম ও আসন অনুশীলনের সময় যথাযথ পদ্ধতি, সময় ও কৌশল অবলম্বন করতে হবে।

অনুলোপ বিলোম প্রাণায়াম: অনুলোপ বিলোম প্রাণায়ামের ফলে দেহের স্নায়ুতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র প্রভৃতির মুখ্য লাভ হয় এবং দেহের সার্বিক কল্যাণ হয়। মানুষ স্বাভাবিক প্রশ্বাসে ৫০০ থেকে এক হাজার মিলিলিটার আক্সিজেন গ্রহণ করে। কিন্তু গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণের ফলে প্রতিবার পাঁচ থেকে ১০ হাজার মিলিলিটার অক্সিজেন গ্রহণ করে। ফলে দেহে অক্সিজেন পূর্ণ হয়ে ওঠে এবং মানুষ নিরোগের পথে যাত্রা শুরু করে।

ভস্তিকা প্রাণায়াম: ভস্তিকা প্রাণায়ামে শ্বাসতন্ত্র, ফুসফুস, হƒদয়জনিত রোগ, ঠাণ্ডা, নিমুনিয়াসহ বুকের ভেতরের যাবতীয় রোগ নির্মূল হয়।

কপালভাতি প্রাণায়াম: লিভার, কিডনি, প্যানক্রিয়াস, মেয়েদের জরায়ুসহ সব রোগ নির্মূল হয়। প্রচলিত ধারণা মধুমেহ (ডায়াবেটিস) সারাজীবনের রোগ। এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু নির্মূল করা যায় না। যোগাভ্যাস এ ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে। কয়েকটি আসন নিয়মিত অনুশীলনে মধুমেহ সম্পূর্ণ নিরাময় হয়। যেমন মরুকাসন, যোগ মুদ্রাসন, গোমুখাসন, বক্রাসন, জানুশিরাসন, পশ্চিমোত্থাসন, উষ্ঠাসন, তোলাঙ্গাসন, পবনমুক্তাসন প্রভৃতি।

নি¤œরক্তচাপ: (ক) সূর্যতেরী প্রাণায়াম, (খ) শবাসন। কোমর, পিঠ ও ঘাড়ের ব্যথায় আধুনিক ফিজিওথ্যারাপি যোগাসনের অনুকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে: (ক) মর্কটাসন, (খ) ভূজঙ্গাসন, (গ) সলভাসন, (ঘ) সেতুবন্ধনাসন, (ঙ) নৌকাসন, (চ) উত্থিত পদাসন, (ছ) পদবৃত্তাসন এবং (জ) ঘাড়ের ম্যাসেজ। পেটের সমস্যা: (ক) উত্থিত পদাসন, (খ) পবনমুক্তসন, (গ) ভুজঙ্গাসন, (ঘ) সলভাসন, (ঙ) সেতুবন্ধনাসন, (চ) নৌকাসন। স্থূলতা/ওজন হ্রাস: (ক) ত্রিকোণাসন, (খ) কোণাসন, (গ) জানুশিরাসন, (ঘ) পশ্চিমোত্থাসন, (ঙ) উত্থিত পদাসন, (চ) পদবৃত্তাসন, (ছ) হস্তপদাসন, (জ) দ্বিচক্রিকাসন।

যোগ অনুশীলনের মাধ্যমে সব রোগ নির্মূল করা সম্ভব। আজ আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে পৃথিবীর সব মানুষ যোগ অনুশীলনের মাধ্যমে সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম ও দীর্ঘজীবন লাভ করুক এটাই প্রত্যাশা।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..