মত-বিশ্লেষণ

যোগ্য নেতৃত্বে কাতারের সফলতা

এম আতহার নূর : আরব উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল থেকে একটু উত্তর দিকে পারস্য উপসাগরের কূলঘেঁষে ছোট্ট রাষ্ট্র কাতারের অবস্থান। আরবের উত্তপ্ত, শুষ্ক ও ভূ-পৃষ্ঠস্থ জলাশয়হীন মরুময় এলাকায় বিশ্বের অন্যতম অভিবাসী ধারক রাষ্ট্রটি দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ এই ছোট দেশটির আকাশ ছেয়ে গেল বিপত্তিভরা বাতাসে, ঘিরে ধরল নিষেধাজ্ঞার এক কঠিন বেষ্টনী। গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়ে তথাকথিত মুসলিম বিশ্বের ক্ষমতাশালী কর্ণধার সৌদি আরবের প্রত্যক্ষ আহ্বানে উপসাগরীয় রাষ্ট্রের সমন্বিত জোট গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) গত ২০১৭ সালের জুন মাসে ক্ষুদ্রকায় এ রাষ্ট্রকে ঘিরে ‘অবরোধ’ নামক এক নোংরা খেলায় মেতে ওঠে।

রাষ্ট্রটি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও তার নিত্য চাহিদার প্রায় সবই আমদানিনির্ভর। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেই মূল চাহিদার ৬০ ভাগ পূরণ হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, ক্ষুদ্র আয়তনের এ রাষ্ট্রের ত্রিসীমানা জুড়ে রয়েছে সাগর এবং একমাত্র স্থল সীমান্তটিও সৌদি আরবের সঙ্গেই লাগোয়া, যা বু-সামরা বর্ডার বা আরবিতে মানফায বু-সামরা নামে পরিচিত। অবরোধের দুঃসংবাদ কেবল কাতারের নাগরিকই নয়, বরং অবস্থানরত কোটি কোটি প্রবাসীকেও বিমূঢ় করে দেয়, কপালে আনে চিন্তার ভাঁজ।

অবরোধ আরোপের ঘটনায় বিশ্ব কিছুটা হতচকিয়ে গিয়েছিল, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি এবং পেন্টাগনের সবচেয়ে বড় ফাঁড়ি, সে দেশের স্বার্থ বাদ দিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মদতে কিনা কাতার অবরুদ্ধ হলো! অবিশ্বাস্য হলেও এটিই সত্য। ভৌগোলিকভাবে কাতার প্রায় ক্ষেত্রে সৌদি-আমিরাত-মিসর-বাহরাইন বলয়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো থেকেই ষড়যন্ত্ররূপে হরেকরকম অভিযোগ আসতে থাকে। সন্ত্রাসবাদে মদত, তাদের আশ্রয় ও অর্থায়নসহ নানা অভিযোগে জর্জরিত হতে থাকে কাতার। অতঃপর ২০১৭ সালে দলবদ্ধভাবে কাতারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে ষড়যন্ত্রকারীরা; বন্ধ করে দেয় আকাশ, নৌ ও স্থলপথ; আরোপ করে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কঠিন নিষেধাজ্ঞা। তবে নিরপেক্ষ ভূমিকায় ছিল জিসিসিভুক্ত দেশ ওমান।

হঠাৎ ঐতিহাসিক এই অবরোধের ফলে পারস্য উপসাগরের পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। টানটান উত্তেজনার মধ্যে চার দেশের কূটনীতিকরা কাতার ছেড়ে যান। কাতারও তার কূটনীতিকদের দেশে ফিরিয়ে আনে। তখন অনেক জগৎবাছা অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, কাতারের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। লন্ডন রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক মাইকেল স্টেফেন্স বলেন, কাতারের চ্যালেঞ্জ ছিল দুটি। প্রথমত, প্রমাণ করতে হবে যে তারা কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের মদতদাতা নয় এবং সমর্থনও করছে না। দ্বিতীয়ত, তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি যে মজবুত তা কাজে প্রমাণ করা। এছাড়া কাতারের নিদারুণ বিপদে যেসব বিশ্লেষণ দৃষ্টিগোচর হয়, তার মধ্যে আরেকটি হলো লন্ডন ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রতিবেদন। তাদের মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক বিশ্লেষক জেসন টাভি বলেন, উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর তুলনায় কাতারের অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য খুবই দুর্বল।”

এখন আলোকপাত করা যাক কীভাবে তরুণ সাহসী আমির ‘শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি’ তার দূরদর্শী চিন্তাশক্তির বদৌলতে এই সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দেশের সফল উত্তরণ ঘটান। অভিযোগের সূচনালগ্নেই কাতার জিসিসি’র সব অভিযোগ পুনঃপুন নাকচ করে আসছিল। অর্থনৈতিক মন্দার তেতো ধাক্কার প্রারম্ভিকতায় অবরোধ তুলে নেয়ার আকুতি জানালেই সৌদিবলয় জুড়ে দেয়া হয় ১৩টি কঠিনতম শর্ত। কিন্তু সাহসী আমির একটিও না মেনে অবিচলিত থেকেছেন। শির উঁচু করে এই আমির তার দৃঢ়তা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রখরতায় পুরো বিশ্বকে সাহসিকতার সবক দেন।

ছোট একটি রাষ্ট্রের আমিরের ওপর নানা ধরনের চাপ, হুমকি এবং অপবাদ ও অপপ্রচার থাকা সত্ত্বেও কখনও সেই আমির মারমুখী, উগ্র কিংবা শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠেননি। আঞ্চলিক কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো চাপের কাছে নতজানু না হয়ে বরং তিনি ঘোষণা দেন, ‘আমার দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ রাখতে কোনো পদক্ষেপ নিতে পিছপা হব না।’ গত সাড়ে তিন বছরে সাহসী আমির বিশ্বকে অবাক করে দেশে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধন করেন।

মূলত ১৯৪০ সালে শুরু হওয়া পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাসশিল্পের ওপর ভিত্তি করে কাতারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় একচেটিয়াভাবেই সাধিত হয়। এতে পাকাপোক্ত হয় কাতারের অর্থনীতির সামগ্রিক ব্যবস্থা। পৃথিবীতে প্রাকৃতিক গ্যাস মজুতের তালিকায় তৃতীয় এবং রপ্তানিতে দ্বিতীয় এই দেশের বর্তমান মাথাপিছু আয় এক লাখ ৩৮ হাজার ৯০০ ডলার। শুধু তাই নয়, প্রতি বছর প্রায় শত মিলিয়ন টন তথা বিশ্বের মোট রপ্তানিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এলএনজি রপ্তানি করে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিতে কাতার বিশ্বে প্রথম। অবরোধকালে কাতার কালক্ষেপণ ছাড়া তুরস্ক ও ইরানের মাধ্যমে বিকল্প পথে খাদ্য আমদানি শুরু করে। তারাও এই বিপদের সময় বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়। তুরস্ক বিভিন্ন জাতের খাদ্যদ্রব্য অবিলম্বে বিমানযোগে পাঠিয়ে দেয়। আকাশসীমার নিষেধাজ্ঞায় কাতার এয়ারওয়েজ বড় বিপাকে পড়ে, বাধ্য হয়ে ইরানের আকাশসীমা-সংলগ্ন ব্যয়বহুল রুট ব্যবহার করতে শুরু করে, পাশাপাশি কাতার কর্তৃপক্ষও দেশে ঘরোয়া উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো শুরু করে।

দুধ আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রচণ্ড সংকট সৃষ্টি হলে হাজার হাজার গরু আমদানি করে কাতার। বছর খানেকের মধ্যেই দুধ উৎপাদনে বড় সাফল্য দেখায় দেশটি। সবজি চাষ ও হাঁস-মুরগির খামার রাতারাতি চালু করে ঘরোয়া উৎপাদনের বিস্তৃতি ঘটায়। অবরোধের থমথমে পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ফলপ্রসূ রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ছিল হামাদ সমুদ্র বন্দরে সাত দশমিক চার বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প উš§ুক্ত করা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রবন্দরে পণ্যবাহী অনেক জাহাজ অবাধে প্রবেশাধিকার পায়। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যেও বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে তারা। শ্রম আইনের সংস্কার, বেসরকারিকরণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা গঠন ও বিস্তৃতিকরণ হয় ব্যাপকভাবে। অবশেষে কৌশলী কাতারের আমির অবরোধের কালো ধাক্কাকে যুগোপযোগী ও বুদ্ধিবৃত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সফলভাবে ঠেকিয়ে দেন এবং নিজেদের আকাশচুম্বী সফলতার মাধ্যমে অবরোধকে ব্যর্থতায় পর্যুদস্ত করেন।

পরিশেষে মধ্যস্থতার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন বছরব্যাপী দ্বন্দ্বের এই কঠিন সমীকরণের  মীমাংসা হয়। বিশেষজ্ঞরা উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর এই সমঝোতা তথা কাতার- সৌদি বিভেদ নিরসন থেকে আরব ও মুসলিম বিশ্ব এবং মানবতার কল্যাণে নতুন উপসাগরীয় রাজনীতি সূচনা করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন