মত-বিশ্লেষণ

যৌতুক প্রথার নির্মমতা কভিডের চেয়েও ভয়াবহ!

মো. রায়হান আলী : যৌতুক পণ প্রথা (Dowry System) আমাদের সামাজের এক ভয়াবহ ব্যাধি। এর আভিধানিক অর্থ হলো বরপক্ষকে বিয়ের সময়, আগে, কিংবা পরে কন্যাপক্ষ থেকে অর্থ, সম্পদ, অলংকার, আসবাবপত্র প্রভৃতি উপঢৌকন প্রদান প্রথা। আর এই যৌতুক প্রথা একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধিতে সংক্রমিত করেছে পুরো সমাজকে। এ সংক্রমণের ফলে পুরো সমাজ আজ আক্রান্ত হয়েছে। যৌতুক প্রথা সমাজে এক দিনেই আসেনি, এসেছে কালের বিবর্তনে প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকেই। প্রাচীন যুগের রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রের বিয়েতে যৌতুকের প্রথা প্রচলন ছিল। আরও জানা যায়, বল্লাল সেনের সময় তৎকালীন প্রচলিত কৌলীন্য রীতির কারণে কন্যার অভিভাবককে বিভিন্ন অর্থ ও সম্পদদানের চুক্তিতে অরক্ষণীয়া হওয়ার আগেই কুলীন পাত্রে পাত্রস্থ করতে হতো। নিচু বংশের কন্যাকে একটু উঁচু বংশে পাত্রস্থ করতে হলে দিতে হতো অঢেল সম্পদ। এছাড়া মধ্যযুগে মঙ্গল কাব্যেও যৌতুক প্রথা সম্পর্কে অনেক কাহিনি পাওয়া যায়। আজও এ প্রথার বিলুপ্তি ঘটেনি। হয়তোবা ধরন পাল্টেছে, কিন্তু মূলটা রয়েই গেছে। চলমান এ প্রথার প্রচলনের ফলে নারীজীবনে এর প্রভাব অত্যন্ত অভিশপ্ত। প্রতিনিয়তই অগণিত নারী এ প্রথার অভিশাপে সহিংসতা ও অত্যাচার-অনাচারের শিকারে পরিণত হচ্ছে। দার্শনিক জন অস্টিন যৌতুক প্রথা প্রচলনের মাধ্যমে নারী নির্যাতন সম্পর্কে বলেছেন, ‘Dowry system paves the way to women oppression. সদ্য বিবাহিত নারীরাও যৌতুকের উপঢৌকন দিতে না পারলে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে শুরু হয় তার ওপর নির্যাতনের মিশন। আর এ নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে হয়তো নারী আত্মহননের পথও বেছে নিতে দ্বিধা করে না। এমন ঘটনায় অহরহ খবরের কাগজ কিংবা মিডিয়াতে দেখা যায় যে, যৌতুক দিতে না পারায় স্ত্রীকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে যৌতুকলোভী স্বামী ও তার পরিবার। কন্যাসন্তানের অভিভাবকরা এ প্রথার গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট হয়ে হয়তো সংসারের সর্বস্ব বিক্রি করে বরপক্ষের অযাচিত চুক্তির আবদার পূরণ করছে। একাধিক মেয়ে যাদের আছে তারা তো বিপদসীমার ওপরেই অবস্থান করছে। এমনও লক্ষ করা গেছে, জীবন-জীবিকার শেষ সম্বলসহ ভিটেমাটি বিক্রি করে হলেও মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে বরপক্ষকে দিতে হচ্ছে অযাচিত উপঢৌকন। এমন প্রথার ভাইরাসে সারাদেশ আক্রান্ত হলেও এটি বেশি অ্যাটাক করেছে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোয়। মেয়ের সৌন্দর্য, লেখাপড়া, পারিবারিক স্টাটাসসহ সবকিছু পজিটিভ থাকলেও যৌতুকের হাত থেকে নিস্তার নেই অভিভাবকের। কন্যাসন্তান মানেই মনে হয় তাদের একটা বোঝা। কন্যাসন্তান জন্ম নিলেই ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা রাখার মতো অনেকেই আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সঞ্চয় করে রাখে সম্পদ। কন্যাসন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে অবিভাবকের দুশ্চিন্তা। চিন্তার ভাঁজ যেন কপালে লেগেই থাকে।

নারীদের পণ্যের মতো ভাবে কেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ? নারীরা হলো মায়ের জাতি। ইসলামে ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত’-এর কথা বলা হয়েছে। সেখানে কেন এত অমর্যাদা নারীর প্রতি?

আল্লাহ বলেন, ‘আমি যাকে খুশি সন্তান দান করি এবং যাকে খুশি পুত্রসন্তান দান করি। যাকে খুশি কন্যা ও পুত্র উভয় দান করি। যাকে ইচ্ছা করি নিঃসন্তান করি। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাশীল।’ (আশ-শুরা, আয়াত: ৪৯)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ওই নারী বরকতময়ী ও সৌভাগ্যবান, যার প্রথম সন্তান মেয়ে হয়। কেননা (সন্তানদানের নেয়ামত বর্ণনা করার ক্ষেত্রে) আল্লাহ তায়ালা মেয়েকে আগে উল্লেখ করে বলেন, তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। ’ (কানযুল উম্মাল ১৬:৬১১)

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস। নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুটি কন্যাকে সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কিয়ামতের দিন আমি এবং সে এ দুটি আঙুলের মতো পাশাপাশি থাকব (অতঃপর তিনি তার আঙুলগুলো মিলিত করে দেখালেন)।’ (মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৩১, তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯১৪, মুসনাদ আহমদ, হাদিস নং: ১২০৮৯, ইবনু আবি শাইবা, হাদিস নং: ২৫৯৪৮)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করনে, ‘যার ঘরে কন্যাসন্তান জš§গ্রহণ করল, অতঃপর সে ওই কন্যাকে কষ্ট দেয়নি, মেয়ের ওপর অসন্তুষ্টও হয়নি এবং পুত্রসন্তানকে তার ওপর প্রাধান্য দেয়নি, তাহলে ওই কন্যার কারণে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে প্রবশে করাবেন।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস নং: ১/২২৩)

ইসলাম নারীকে মর্যাদা দিয়েছে, তার পরও কেন কথিত মুসলিম তরুণরা সামান্য যৌতুকের লোভে নারীদের নারকীয় অত্যাচার, নির্যাতন, অবমাননা, হেয় প্রতিপন্ন করাসহ মধ্যযুগীয় কায়দায়ও নির্যাতন করছে, তা কারও সঠিকভাবে জানা নেই হয়তোবা। যুগে যুগে আধুনিকতায় কালের আবহে অনেক কিছুরই আধুনিকায়ন হয়েছে, কিন্তু হয়নি ছোট মনমানসিকতার মানুষগুলোর মনের আধুনিকায়ন।

সংবিধানের ২৭নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। তাহলে সবাই যদি সমান অধিকার ভোগ করার আইনগত অধিকার রাখে, তাহলে মেয়েরা কেন যৌতুকের বলির শিকার হয়ে আজ সমাজে নিষ্পেষিত, শোষিত এবং বর্বরোচিত নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার শিকার হচ্ছে। এমন প্রথার ফলে দেশে কন্যার অভিভাবকরা আজ নাজেহাল।

বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০২০ সালে এক প্রতিবেদনে বলেছে, ওই বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর কালপর্বে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত তথ্যমতে, দেশব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতা, বিশেষ করে হত্যা, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা ও এর ভয়াবহতার ব্যাপকতা তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এই রিপোর্টে যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ১৬৮ নারী। এর মধ্যে যৌতুকের কারণে শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৭৩ জন, যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ৬৬ জনকে এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১৭ নারী। এছাড়া স্বামীর গৃহ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন ১২ জন।

নারীদের প্রতি এমন বর্বরোচিত ঘটনার প্রতিকার ও প্রতিরোধে বিভিন্ন প্রকার আইনও প্রবর্তন করা হয়েছে। যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০-এর ৩ ধারায় বলা আছে, ‘এই আইনের কার্যকারিতা শুরু হইবার পর হইতে যদি কোনো ব্যক্তি যৌতুক প্রদান করে কিংবা গ্রহণ করে, অথবা প্রদান বা গ্রহণে সহায়তা করে, তাহা হইলে সেই ব্যক্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবে এবং এক বছরের কম মেয়াদের নহে, অথবা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’ ওই আইনের ৪ ধারায় আরও বলা হয়েছে, ‘এই আইনের কার্যকারিতা শুরু হইবার পর হইতে যদি কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কনে বা বরের পিতা বা অভিভাবকের নিকট হইতে যৌতুক দাবি করে, তাহা হইলে সে পাঁচ বছর মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবে এবং এক বছরের কম মেয়াদের নহে, অথবা কারাদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’ এছাড়া আরও কত আইন রয়েছে, যেমন নারী নির্যাতন আইন, ১৯৮৩; নারী ও শিশু নির্যাতন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)। ওই আইনে বলা আছে, যৌতুকের কারণে কোনো নারীর মৃত্যু হলে অপরাধীর সাজা হবে মৃত্যুদণ্ড এবং যৌতুকের কারণে আহত করা হলে অপরাধীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এমনকি যৌতুকের কারণে আহত করার চেষ্টা করলে অনধিক ১৪ বছরের এবং সর্বোনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

আইন করে সবকিছু দমন-পীড়ন করা সম্ভব নয়, দরকার উন্নত মানসিকতার। নারীর প্রতি যৌতুকের অভিশাপ কী করে সমাজ থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া যায় তার উপায় খুঁজে বের করতে হবে সকলকে। এক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক মানবতার মমতাময়ী মা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মন্ত্রী, সচিবসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কিত করে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন এদেশের নারীরা। তাই আমরা চাই, এদেশে যেন আর কোনো নারীকে যৌতুকের বলি হয়ে জীবন বিসর্জন দিতে না হয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেনÑ‘কোনো কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি; প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়লক্ষ্মী নারী। তাই নারীকে আর অবহেলা নয়। প্রথাগত রীতিতে আর আবদ্ধ না করে পুরো নারী জাতিকে অসম্মান নয়, চাই প্রথার বিলুপ্তির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসহ পুরুষশাসিত সমাজে নারীর প্রতি উন্নত মানসিকতার বাস্তব প্রতিফলন।

শিক্ষানবিস আইনজীবী, খুলনা

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..