প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

রকিবুল সাহেবের সদাইপাতি আর অর্থনীতিজ্ঞান

হাসান মামুন: রকিবুল সাহেব এ শহরেই জন্মেছেন। ছেলেবেলায় দেখতেন, বুয়েটে পড়া বড় ভাই কিংবা বাসার অন্য কেউ প্রায় রোজ কাঁচাবাজারে যান। রোজ রান্না হয় ফ্রেশ খাবার। তাদের বাসায় তখন ফ্রিজ ছিল না। ইতোমধ্যে অবস্থার কত পরিবর্তন হয়েছে! জন্ম থেকে দেখা এ রাজধানী আর দেশটার চেহারাও কত বদলেছে! তাদের বাসায় এখন ফ্রিজ, ফ্রিজার। একাধিক টেলিভিশন। কী নেই তাদের, সেটাই প্রশ্ন।

এখন তিনি বা পরিবারের অন্য কেউ কাঁচাবাজারে যান সপ্তায় এক কী দুদিন। শুকনো অনেক খাদ্যপণ্য কেনার জন্য বাজারেও যেতে হয় না। তাদের ফ্ল্যাটবাড়ির কাছেই মুদিখানা থেকে সাপ্লাই আসে। নিয়মিত ক্রেতা বলে কিছু জিনিসের দাম কমই রাখেন মুদিখানার লোকটি। রকিবুল সাহেব খেয়াল করেছেন, বহুদিন তিনি বাজার থেকে সেদ্ধ চাল কেনেননি। মেগাশপে গেলেও সুগন্ধি চাল কেনেন না। ওখানে প্যাকেটের গায়ে যা লেখা থাকে, সে দাম তো নেয়ই; তার ওপর নেয় ৪ শতাংশ ভ্যাট। মুদিখানায় তিনি বরং ৫-১০ টাকা কম পেয়ে থাকেন ‘সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য’ থেকে। রকিবুল সাহেব লক্ষ্য করেছেন, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের ব্যাপারটা অধিকাংশ ক্রেতা খেয়ালই করেন না। অথচ এর মানে হলো, ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সমঝোতা হলে এর চেয়ে কম দামেও জিনিসটি বিক্রি হতে পারে। অধিকাংশ ক্রেতা মনে করেন, ওটাই নির্ধারিত দাম।

নিজ পরিবারে তিনি চালু করেছেন চালের কুঁড়া থেকে উৎপাদিত তেল অর্থাৎ রাইস ব্রান অয়েল। একে যে ‘হার্ট অয়েল’ বলা হয়ে থাকে, বিনা পয়সায় এটা তিনি প্রচারও করেছেন পরিচিত মহলে। মুদিখানাটায় বলেছিলেন, তারা যেন দেশে উৎপাদিত এ ভোজ্যতেল এনে রাখেন। এতে কাজ হয়েছে। পরিচিত মুদিখানায় একাধিক কোম্পানির রাইস ব্রান অয়েল এসে জায়গা করে নিয়েছে তাকে। রকিবুল সাহেব অবশ্য খেয়াল করেছেন, বড় বাজারে আরও কম দামে একই ভোজ্যতেল পাওয়া যায়। তবে মেগাশপে একই ব্যবস্থা, পণ্যের গায়ে লেখা দামের ওপর ভ্যাট। অবশ্য তারা অনেক বিনিয়োগ করেছেন রাজধানীর দামি সব জায়গায়। সুন্দর পরিবেশ করে দিয়েছেন কেনাকাটার। রকিবুল সাহেব বোঝেন, তাদেরও তো মুনাফা করতে হবে।

মেগাশপগুলোয়ও মাঝে মাঝে কাঁচাবাজারের চেয়ে কম দামে ‘অফার’ করা হয় পণ্য। এসব ‘পশ্চিমা কেতা’ শিখছেন আমাদের উদ্যোক্তারা। উৎসবের সময় মুনাফার জন্য হামলে পড়ার বদলে তাদেরও কেউ কেউ দিচ্ছেন ছাড়। রকিবুল সাহেব জানেন, একে বলে ‘ব্র্যান্ডিং’। এর সুযোগ নিতেও তিনি কসুর করেন না। যেমন, সেদিন একটি মেগাশপ থেকে পছন্দের চা আর চানাচুর কিনতে গিয়ে দেখেন, ছোট সাইজ মুরগিতে ভালো ছাড় দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পকেটে টাকা থাকায় তিনি কিনে নিলেন ছয়টি প্রসেস করা মুরগি। দেড়শ টাকার মতো কম লাগলো তার। রকিবুল সাহেবের মনে পড়ে গেলো, মুরগি কিনে এনে এক সময় জবাই করা হতো তাদের বাসার আঙিনায়। ক’বছর আগেও জ্যান্ত মুরগি কিনে দোকান থেকে প্রসেস করে আনতেন তিনি। ইতোমধ্যে মুরগি জবাইয়ের দৃশ্য দেখতে আর ড্রামের ভেতর ওটার দাপাদাপির শব্দ শুনতে খারাপ লাগাটা শুরু হয়েছে তার। প্রসেস করা মুরগিই এখন পছন্দ রকিবুল সাহেবের। অবশ্য এতে ‘স্যানিটেশন’ কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, সে বিষয়ে আস্থা কমই আছে তার সংশ্লিষ্টদের ওপর। রকিবুল সাহেব জানেন, এদের ওপর মনিটরিং জোরালো নয়।

কাঁচাবাজারে যাওয়া অবশ্য তিনি একেবারে ছেড়ে দেননি। আগেকার স্টাইলে দরদাম করে মাছ কিনতে এখনও পছন্দ করেন রকিবুল সাহেব। তার জীবদ্দশায় এটা হয়তো নিঃশেষ হয়ে যাবে না। তবে তিনি জানেন, কবে বা কখন যেতে হয় বাজারে। জানেন, চাহিদার চাপ বেশি থাকলে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। শুক্র-শনিবারে নিয়ত পরিবর্তনশীল দামের জিনিসপত্র তথা মাছ-মাংসের বাজার চড়া থাকে, এটা তিনি জানেন। তাই পারতপক্ষে ওই দুদিন, বিশেষত শুক্রবার তিনি যান না মাছ-মাংস কিনতে। গেলেও যান দুপুরের পর, হাতে সময় থাকলে। তখন দাম একটু স্বাভাবিক হয়ে আসে। রকিবুল সাহেব খেয়াল করেছেন, সন্ধ্যার দিকেও নতুন করে জমে ওঠে কাঁচাবাজারগুলো। লোকজন অফিস থেকে ফেরার পথে মেগাশপেও ভিড় জমায়। এক-দেড় দশকের মধ্যেই রাজধানীর জীবনযাত্রায় এ বদলটা দেখে ফেললেন তিনি। মাঝে মাঝে ভাবেন, আরও না জানি কত বদল হবে আর চলতেই থাকবে এ প্রক্রিয়া।

রকিবুল সাহেব বুঝে পান না, শুক্র-শনিবারেই কেন কাঁচাবাজারে গিয়ে নিত্যপণ্যের দাম জানতে চান রিপোর্টাররা। এ সময়ে বাজার তো চড়া থাকে! তার যুক্তি, তাহলে তাদের উচিত হবে মঙ্গল-বুধবারের বাজারচিত্রেরও খোঁজ নেওয়া। আর তারা কী রাজধানীর সর্বস্তরের কাঁচাবাজারে যান? রকিবুল সাহেব জানেন, এ শহরে ধনী, মধ্যবিত্ত আর গরিবের বাজার আলাদা। আয়-বৈষম্যের মতো এ ব্যবধানও বাড়ছে। সব বাজারে একই মানের জিনিস পাওয়া যায় না, এও ঠিক। আবার একই মানের জিনিসের দাম একেক বাজারে আলাদা, এটাও তিনি জানেন। রকিবুল সাহেব লক্ষ করেছেন, পাইকারি আর খুচরা দামে পার্থক্যের বিষয়টিও মিডিয়ায় এসেছে অনেক পরে। তিনি জানেন, ‘উৎসে’ দাম আরও কম। অনেক ক্ষেত্রে অতুলনীয় রকম কম। কাঁচা পণ্যের উৎপাদকরা এদেশে মার খাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে।

রকিবুল সাহেব একজন সচেতন ক্রেতা, এটা বুঝতে নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে না পাঠকের। নিয়মিত সংবাদপত্র পড়ে থাকেন তিনি। ইন্টারনেটে অভ্যস্ত বলে দেশ-বিদেশের খোঁজও রাখেন। তিনি লক্ষ করছেন, অর্থনীতিবিষয়ক খবর পরিবেশনে সম্প্রতি কিছু নতুনত্ব এসেছে মিডিয়ায়। আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারের খবর আজকাল সংবাদপত্রে আসছে বেশ। পণ্য ধরে ধরে খবর পড়তে তিনি ভালোবাসেন। পরিবর্তনগুলো বেশ ধরতে পারেন এখন। কারণও বুঝতে পারেন। যেমন, গত কয়েকটি কোরবানি ঈদে তিনি লক্ষ করেছেন, মসলার দাম আগের মতো হুড়মুড় করে বাড়েনি। এমনকি রমজানের সময়ও সেভাবে নয়। কারণ বিপুল আমদানি। দেশেও উৎপাদন বাড়ছে মসলার। চোরাপথে মসলা আসাও বন্ধ হচ্ছে না। সংবাদপত্রেই তিনি এমন খবর পড়েছেন যে, চোরাপথে আসা মসলার কারণে বেশি দামে আমদানি করা মসলা বিক্রি হচ্ছে না। রকিবুল সাহেব জানেন, সব ব্যবসায়ীর সবসময় লাভ হয় না। তাদের কারও কারও লোকসানও হয়ে থাকে।

সম্প্রতি তিনি দেশের একটি মর্যাদাসম্পন্ন গবেষণা সংস্থার অর্থনীতিবিদদের এ-জাতীয় গবেষণার খবর সংবাদপত্রে পড়েছেন যে, চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে কৃষিমজুরি ২০ শতাংশ বাড়ে। ছেলেবেলা থেকে দেখে এসেছেন, রাজধানীর লোকজন চালটা কম দামে পেতে চায়। এমনটি তিনি বন্ধুমহলে বলেও থাকেন, আমরা চাই কৃষক কম দামে চাল জুগিয়েই যাবে আর নিজেরা চিরটাকাল থেকে যাবে গরিব হয়ে! গ্রাম থেকে আত্মীয়দের কেউ এলে বা তাদের সঙ্গে ফোনে কথা হলে রকিবুল সাহেব শোনেন, ধান-চাল এমনকি সবজি ফলাতে কৃষকের খরচ কী হারে বাড়ছে। ভালো মজুর পাওয়া যায় না গ্রামে, এটা তিনি আগে থেকেই জানেন; গবেষকরা যেটা বের করে এনেছেন সম্প্রতি। দক্ষ লোকজন শহরাঞ্চলে চলে আসছে শিল্প আর সেবা খাতে কাজ পেতে। এখানে মজুরি ভালো। আরও ভালো মজুরির আশায় তাদের একাংশ চলে যাচ্ছে বিদেশে।

রকিবুল সাহেব এসব পরিবর্তন বেশ টের পাচ্ছেন। চালের দাম বাড়লে তাই তিনি অখুশি হন না। তার যুক্তি, আমরা তো রোজ সিএনজি স্কুটারচালককে প্রতি ট্রিপে ২০-৩০ টাকা বেশি দিচ্ছি। মাঝে মাঝে ৫০ শতাংশ বেশি ভাড়ায় যেতে হচ্ছে কন্ট্রাক্টে। রিকশাভাড়াও কম বাড়েনি রাজধানীতে। রিকশাচালকদের কাজটা খুব কষ্টের, কিন্তু তাদের আয় ভালো। ধান-চালের দাম বেড়ে কৃষি উৎপাদনটা লাভজনক হলে মজুরি বাড়বে আর তখন হয়তো রিকশাচালকরাও ফিরে যেতে চাইবে গ্রামে। খালি ঘরবাড়ি করে দিলেই ওখানে ফিরে যাবে না তারা। জীবিকার একটা গ্রহণযোগ্য উপায় করে দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক’বছর অর্থশাস্ত্র পড়া রকিবুল সাহেব বোঝেন, কেন চালসহ কৃষিপণ্যের দাম বাড়া প্রয়োজন আর সেটা কেন বাড়তে হবে উৎসে।

তিনি এও বোঝেন, চালের দাম না বাড়লে কৃষক এর উৎপাদন কমিয়ে অন্যান্য জিনিসের উৎপাদন বাড়িয়ে দেবে। শুধু গম বা ভুট্টা নয়, এমনকি তামাকের উৎপাদন বাড়াবে। শুধু নীতিকথা বলে তাকে আটকানো যাবে না। দেশে তো ধূমপান বাড়ছে। সিগারেট কোম্পানিগুলো ভালো আয় করছে এবং সরকারকেও রাজস্ব দিচ্ছে ভালো। রকিবুল সাহেবের মনে প্রশ্ন, তাহলে চাষিরা এর সুফল পাবে না কেন? একটি গবেষণা সূত্রে তিনি জানতে পেরেছেন, দেশে সবজি ও মাছ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি উঁচুমাত্রার। শীতের এ সময়টায় বাজারে এ দুটি জিনিসেরই সরবরাহ দেখছেন ভালো। দামও গেছে কমে। পোলট্রির উৎপাদনও অনেক বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে মুরগির উৎপাদন এত বেড়েছে যে, তা নাকি ছাড়িয়ে গেছে চাহিদাকে। এ সময়ে যখন বিয়েশাদি, পিকনিক প্রভৃতির জন্য মুরগির চাহিদা বেশি, তখনও এর দাম কম দেখতে পাচ্ছেন রকিবুল সাহেব।

এ অবস্থায় গরু বা খাসির বদলে তিনি মুরগির মাংস খাওয়ার পক্ষে। এটা স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো। তবু সম্প্রতি তিন কেজি খাসির মাংস কিনেছেন তিনি বাধ্য হয়ে। ৬৫০-৭০০ টাকার কমে এখন মিলছে না এটা। ভালো গোমাংস ৪৫০ টাকা কেজি। অথচ রকিবুল সাহেব সেদিন চার কেজি বড় মাছ কিনলেন ১২০০ টাকায়। ছোট মাছও বাজারে প্রচুর। সব ধরনের জলাশয় থেকে সহজে মাছ ধরা যাচ্ছে এখন। তাতে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষেরও আয় বেড়েছে এ সময়ে। রকিবুল সাহেব জানেন, তার মতো অনেকেই এখন গরু-খাসির মাংসের বদলে বেশি করে মুরগি, মাছ আর সবজি কিনছে। অন্তত এমনটাই আশা করেন তিনি। আশা করেন, দেশে যুক্তিবোধসম্পন্ন ভোক্তা বাড়ছে, যারা দামি জিনিসের পেছনে লাগাতারভাবে না ছুটে আর সে বিষয়ে অন্তহীনভাবে অভিযোগ না করে সহনীয় বা কমদামি পণ্যের ভোক্তা হচ্ছে।

কমদামি জিনিস মানেই খারাপ তো নয়। প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ায় এর দামও এবার বেশ কম ছিল। রকিবুল সাহেব জানেন, এতে প্রশাসনের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। আর উৎপাদন বেড়ে নিত্যপণ্যের দাম যে সাধারণভাবে নাগালের মধ্যে থাকছে, তাতে রয়েছে সরকারের নীতিগত অবদান।

‘মধ্যস্বত্বভোগী’দেরও ভূমিকা রয়েছে। রকিবুল সাহেব অনেকের মতো এদের সম্পূর্ণ নেতিবাচকভাবে দেখেন না। তিনি জানেন, ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও মধ্যস্বত্বভোগী। কিন্তু তাদের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি কল্পনা করা যায় না। দুই প্রান্তের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে তাকে কাজে লাগাচ্ছে মধ্যবর্তীরা। দেশে বড় যেসব মেগাশপ হয়েছে, তারাও তো মধ্যস্বত্বভোগী। রকিবুল সাহেব ভাবেন, ভবিষ্যতে এগুলো আরও বড় হবে। যেসব উৎস থেকে এরা কৃষিপণ্য সংগ্রহ করবে, তাদের আরেকটু ভালো দাম দেবে এ মেগাশপগুলো। সেটা সম্ভব; কেননা এরা পণ্য সংগ্রহ করবে নিজস্ব চ্যানেলে। কাঁচাবাজারগুলো তখন হয়তো আরও প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। রকিবুল সাহেব জানেন, বিক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ভালো আর সেটা একজন সচেতন ক্রেতার দৃষ্টিকোণ থেকে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট