প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

রডের বাজারে হুমকিতে বিএসআরএমের শ্রেষ্ঠত্ব

পুরোনো প্রযুক্তিতে চলছে উৎপাদন

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশের ইস্পাত খাতের প্রথম ও পুরাতন কোম্পানি বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড (বিএসআরএম)। পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি ইস্পাত উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়িয়েছে সক্ষমতা এবং এনেছে বৈচিত্র্য। কিন্তু ইন্ডাকশন প্রযুক্তিনির্ভরতায় চলছে ইস্পাত উৎপাদন। অথচ প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো গুণগত ইস্পাত উৎপাদনের জন্য স্থাপন করেছে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস ও কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তি। এতে আগের চেয়ে কম খরচে প্রতিষ্ঠানগুলো গুণগত ইস্পাত উৎপদন করছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্মাণ খাতের ক্রেতারা গুণগত মানের ইস্পাত নিয়ে সচেতন। ফলে বাজার প্রতিযোগিতায় স্বল্পসময়ে বিএসআরএমের বাজার-শ্রেষ্ঠত্ব হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিএসআরএম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অবাঙালি ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন কোম্পানিটি ১৯৬০ সালে যাত্রা করে। সময়ের পরিবর্তনে গত ৫৯ বছরে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বেড়েছে বহুগুণ। পাশাপাশি ইস্পাতপণ্যে এনেছে নানান বৈচিত্র্যতা। এছাড়া চাহিদা বৃদ্ধি আর প্রচার-কৌশলে অর্জন করেছে বাজারের শ্রেষ্ঠত্ব। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ইন্ডাকশন ফার্নেস-নির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ইস্পাতপণ্য উৎপাদন করছে। আর এ প্রযুক্তিতে বিএসআরএম উৎপাদনে আসে ২০১৫ সালে। অথচ একই সময় ইস্পাত খাতের ‘বিগ প্লেয়ার’ আবুল খায়ের স্টিল (একেএস স্টিল) ইস্পাত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে। বর্তমানে একেএসের লং স্টিলের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১৪ লাখ টন। আর বার্ষিক বিক্রি প্রায় ১২ লাখ টন। একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে একেএস শতভাগ পরিশুদ্ধ ও গুণগত ইস্পাত উৎপাদনে শীর্ষে।
এদিকে সর্বশেষ ইস্পাত খাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন করেছে ‘রাইজিং প্লেয়ার’খ্যাত জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তি এবং একই ছাদের নিচে সর্বাধুনিক কাঁচামাল হ্যান্ডলিং, মেল্টিং, রিফাইনিং, কাস্টিং ও রোলিং সুবিধা আছে। অর্থাৎ ইন্টিগ্রেটেড স্টিল প্লান্ট প্রজেক্ট, যা বাংলাদেশ ও এশিয়া অঞ্চলে প্রথম প্লান্ট। এ কারখানায় উৎপাদিত পণ্য খুবই দৃঢ়, শক্তিশালী ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহৃত হবে। আর উৎপাদিত পণ্যের কেমিক্যাল, ফিজিক্যাল, মেকানিক্যাল ও মেটালোজিক্যাল-বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করবে। উৎপাদিত পণ্যের কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের জন্য উচ্চমানসম্পন্ন কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাবরেটরিতে পণ্যের কেমিক্যাল, ফিজিক্যাল, মেকানিক্যাল ও মেটালোজিক্যাল পরীক্ষাসহ সব ধরণের সুবিধা নিশ্চিত করবে। আর এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বিশ্বব্যাংকের নির্ধারিত কার্বন নির্গমন ৯০ শতাংশের কম এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ৯৬ শতাংশের কম হবে কার্বন নিঃসরণ, যা বিদ্যমান রি-রোলিং মিল অথবা ইন্ডাকশন ফার্নেস-নির্ভর মিলগুলোতে নেই।
বিভিন্ন ইস্পাত প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশল বিভাগে কর্মরতরা বলেন, ইস্পাতপণ্য (লং স্টিল) উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সর্বশেষ যুক্ত হয় কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেস। এ প্রযুক্তি ইস্পাত খাতে উৎপাদন বাড়িয়েছে জ্যামিতিক হারে এবং কমেছে উৎপাদন ব্যয়ও। নিশ্চিত করছে শতভাগ পরিশুদ্ধ ও গুণগত ইস্পাত। আর এ পরিবর্তনে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলোর মুনাফার সম্ভাবনা বাড়ছে। অপরদিকে হুমকির মুখে পড়ছে ম্যানুয়াল, সেমি অটো, ইন্ডাকশন ফার্নেস মিলগুলো। কারণ, বিদ্যমান ইন্ডাকশন ফার্নেস প্রযুক্তিতে এক টন স্ক্র্যাপে ৯৩০-৯৪০ কেজি ইস্পাত পায়। আর কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তির কারখানায় ৯০০ কেজি ইস্পাত পাওয়া যায়। কারণ, অক্সিজেন ব্যবহার করে সø্যাগ ফেলে দিতে হবে, যা বিদ্যমান অর্থাৎ ইন্ডাকশন ফার্নেস-নির্ভর মিলগুলো ফার্নেসে সঠিকভাবে অক্সিজেন পুশ করতে পারে না। ফলে শতভাগ রিফাইন স্টিল উৎপাদন করতে পারে না। আর কোয়ান্টাম আর্ক প্লান্টে এক টন ইস্পাতপণ্য তৈরিতে খরচ হয় ৩১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ। যেখানে দেশে বর্তমানে মিলগুলোর এক টনে ৫৫০-৬৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে এবং এক টনে ৩৫ কিউবিক মিটার গ্যাস সাশ্রয় হবে। এছাড়া পরিবেশ দূষণও কমবে।
ইস্পাত খাতের একাধিক উদ্যোক্তা বলেন, গত পাঁচ বছরে দেশের ইস্পাত খাতে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসে। আর বর্তমানে সেমি, অটো কিংবা ইন্ডাকশন ফার্নেসে উৎপাদিত ইস্পাতপণ্যের কোয়ালিটি নিয়ে অবশ্যই আপত্তি আছে। কারণ, প্রচলিত মিলগুলোয় সরাসরি অক্সিজেন লেন্সিং বা ইনজেক করা যায় না। ফলে এসব প্লান্টে পুরো কোয়ালিটি স্টিল তৈরি হয় না। আর কোয়ালিটি স্টিল না হলে নির্মাণও টেকসই হয় ন। এছাড়া উৎপাদন খরচও সাশ্রয় হয়। ফলে বিদ্যমান ইন্ডাকশন ফার্নেস প্লান্টগুলোতে গুণগত পণ্য উৎপাদন হয় না। উৎপাদন খরচও বেশি হয়। ফলে তারা মিডিয়ায় অতিপ্রচারের (বিজ্ঞাপন) মাধ্যমে তারা বাজার সুবিধা গ্রহণ করছে। জনগণ এখন খুবই সচেতন। এখন দেশে বড় দুটি প্লাট আছে, তারা কোয়ালিটি স্টিল তৈরি করছে।
ইস্পাত খাতে প্রযুক্তি পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জের কারণে বিএসআরএমের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার কৌশল প্রসঙ্গে জানতে বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্তের সঙ্গে একাধিকবার সেলফোনে যোগাযোগ করলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে একই বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) ও কোম্পানির সচিব শেখর রঞ্জন কর শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিষয়টি আসলে টেকনিক্যাল। এ বিষয়ে আমার জানা নেই। পরে যোগাযোগ করুন’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
উল্লেখ্য, বিএসআরএম গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান রড, চ্যানেল, বার ও অ্যাঙ্গেল উৎপাদন, বাণিজ্যিক ও বিপণন করে। এ গ্রুপের বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড ও বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড দেশের পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত কোম্পানি।

 

সর্বশেষ..