প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

রফতানি হচ্ছে লক্ষ্মীপুরের হাতে বোনা টুপি

 

জুনায়েদ আহম্মেদ, লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুরে হাতে বোনা টুপি সৌদি আরব, আরব আমিরাত, ওমানসহ আরব দেশগুলোতে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গ্রামের নারীদের হাতের তৈরি এ টুপির চাহিদাও বেশ। টুপির উৎপাদন বাড়াতে সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তিসহ সরকারি ও বেসরকারি নানা সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন এর উদ্যোক্তারা। শিল্পটির প্রসার ঘটলে বদলে যাবে এ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার

মান। পাশাপাশি দেশে বৈদেশিক মুদ্রা

আয়ও বৃদ্ধি পাবে বলে আশাবাদী টুপি বুননে নিয়োজিত নারীরা।

কমলনগর ও রামগতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বসতবাড়ির আঙিনায়, পুকুর পাড়ে টুপি তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন  নারীরা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চলে পুরোদমেই এ টুপি তৈরির কাজ। কেউ টুপি নকশা করছেন, কেউ নকশা করা টুপি সেলাই করছেন, কেউ জোড়াতালি দিচ্ছেন। টুপি বুননের কাজে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রীরাও পড়ালেখার পাশাপাশি এ কাজ করে পরিবারকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছে।

এ দুই উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ নকশি টুপি তৈরি ও বুননের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। যার মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীশ্রমিকের সংখ্যাই বেশি। রামগতির চরআলেকজান্ডার, চররমিজ, চরসেকান্তর, গুচ্ছগ্রাম, সমবায় গ্রাম, শিক্ষা গ্রাম ও কমলনগরের হাজির হাট, মতিরহাট, চরফলকন, চরকালকিনি, চরমার্টিন,  চরজাঙ্গালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার নারী ও পুরুষরা এ পেশায় জড়িত।

এ নকশি টুপি সৌদি আরব, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয় বলে উদ্যোক্তারা

জানান। তবে স্থানীয়ভাবে এ টুপি ‘ওমানি টুপি’ নামে পরিচিত।

কমলনগরের চরলরেঞ্চ এলাকার টুপি বুননের কাজে নিয়োজিত সুমি আক্তার জানান, চার বছর ধরে টুপি বুননের কাজ করছি। চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত পুঁজির জোগান দিতে না পারায় টুপি উৎপাদনকাজ ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলেও অতিরিক্ত সুদ দিতে হয়। পড়তে হয় বিভিন্ন ঝামেলায়। পুঁজির অভাবে কাজ করতে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এ পেশায় বেকার নারী-পুরুষদের কর্মসংস্থান হতো।

বুননকাজে নিয়োজিত সীমা নামে এক শিক্ষার্থী জানায়, সে পড়ালেখার পাশাপাশি বিকালে টুপি বুনতে মাকে সাহায্য করে। এ কাজ করতে তার ভালোই লাগে কিন্তু মহাজনরা ন্যায্য পারিশ্রমিক ও সময়মতো টাকা না দেওয়ার অভিযোগ এ ছাত্রীর।

সীমা আরও জানায়, একটি নকশি টুপি বুনতে সময় লাগে দুই-তিন সপ্তাহ। আর কারিগররা তাদের শ্রমের মজুরি হিসেবে টুপিভেদে

পান ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, যা ঢাকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকায়।

চরকালকিনির গৃহবধূ বিলকিস জানান, অভাবের সংসারে পাঁচ ছেলেমেয়ের পড়ালেখা চালাতে কষ্ট হতো। গত ছয় মাস থেকে পাশের গ্রামের আসমা বেগম নামের এক নারী থেকে টুপি বোনার কাজ শেখে এখন স্বাবলম্বী হতে স্বপ্ন দেখছেন তিনি। নিজেদের পুঁজি সংকটের কারণে মহাজনদের দেওয়া টুপিতে নকশার কাজ করে আশানুরূপ লাভ হচ্ছে না। তবে সরকারি সহায়তা পেলে এ পেশায় আরও লাভবান হতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী।

কমলনগরের চরলরেঞ্চ ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান খোকন জানান, চরাঞ্চলে ওমানি টুপি বুনে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছে নারীরা। চরলরেঞ্চ ইউনিয়নেও দিন দিন নারীরা এ পেশায় ঝুঁকছেন। এ ইউনিয়নের গৃহিণীরা দৈনন্দিন সংসারের কাজের ফাঁকে নকশি টুপি বুনে সংসারের আয় বৃদ্ধি করছে।

জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর বিসিক শিল্পনগরীর উপ-ব্যবস্থাপক অরবিন্দ দাশ জানান, এ টুপিশিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। কমলনগর ও রামগতি উপজেলার নারীরা এ নকশি টুপি বুননের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। টুপি বুননশিল্পের কারিগরদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণসহ সহজ শর্তে সরকারি ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, এটি খুবই লাভজনক পেশা। সংসারের কাজের ফাঁকে টুপি বোনানোর কাজ করে নারীরা বাড়তি আয় করছেন। এতে যেমন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি এ টুপি রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও আয় হবে। তাদের এ পেশাকে আরও গতিশীল করতে নিজ নিজ উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ ও ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।