মত-বিশ্লেষণ

রাইড শেয়ারিংয়ে নারীচালক

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি

নারী বাইক চালাচ্ছে, ব্যাপারটি বর্তমান সময়ে দেখতে যতটা সহনীয় মনে হচ্ছে, আগে ঠিক তেমনটা ছিল না। এখনও যে বাইকের ওপরে পুরুষের বদলে নারীকে দেখতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়েছে আমাদের দেশের মানুষ, তা কিন্তু নয়। আগে দেশ এবং দেশের বাইরে সব জায়গাই ছিল একই অবস্থা। অনেক সময় লেগেছে নারীদের মোটরবাইক বা স্কুটিকে নিজেদের অধিকার আয়ত্তে আনতে।

১৮৮৫ সালের দিকে গোত্তেলিব ডেলমার বাইসাইকেলে ইঞ্জিন লাগিয়ে সেটাকে ঘণ্টায় ১২ মাইল যাওয়ার উপযোগী করেন। ভারসাম্য রাখার জন্য তিনি এতে মোট চারটি চাকা জুড়ে দেন। এর আগে নারীরা বাইসাইকেলে অভ্যস্ত ছিলেন। হুট করে নতুন এই উদ্ভাবনী মানুষকে আবার ভাবায়। নারী না পুরুষÑএকটু বেশি গতির বাইকটা কে চালাবে?

প্রথমদিকে ভাবনাটা ছিল কম। একটু একটু করে বাইককে আরও গতিশীল ও উন্নত করে তোলাটাই ছিল সবার ভাবনা। সেই ভাবনা থেকেই ১৮৬৯ সালে ম্যাসাচুসেটসের সিলভেস্টার রোপার দুই চাকার মোটরবাইক তৈরি করেন। আস্তে আস্তে আরও নতুন সব কোম্পানি চালু হয়। নতুন নতুন বাইক বানায় তারা। আর বাইক যত বেশি উন্নত হতে থাকে, তত বেশিই নারীর প্রতি প্রশ্নটা ছুড়ে দিতে থাকে সমাজÑনারীদের কি মোটরবাইক চালানো উচিত?

নারীরা তখন থেকে বাইসাইকেল চালাচ্ছেন। কম সময় আর অল্প খরচের কারণে মোটরবাইক ছিল তাদের অন্যতম পছন্দের বাহন। ১৯১৫ সালে রিয়ার এবং ফ্রন্ট শকস্ বাজারে নিয়ে আসে ইন্ডিয়ান মোটরবাইক। মোটরবাইক এখন শুধু গতি নয়, আরামদায়ক ভ্রমণও বটে। এই সময় দুই মা-মেয়ে এভিস এবং এফি হচকিস মোটরবাইকে করে দীর্ঘ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। মোট পাঁচ হাজার মাইল ঘুরে আসেন তারা। পরের বছরই একই কাজ করেন অ্যাডেলিন এবং অগাস্টা ভ্যান ব্যারেন। সবচেয়ে বেশি এগিয়েছিলেন ভিভিয়ান ওয়েলস। ৫০০০ মাইল ভ্রমণের মধ্য দিয়ে। তবে নারীদের মধ্যে সব সময়ের সেরা রাইডার মনে করা হয় বেজি স্ট্রিংফিল্ডকে। মায়ামির মোটরসাইকেল কুইনও বলা হয় তাকে। কারণ একা একা দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো ছিল অত্যন্ত সাহসী ও মনে রাখার মতো কাজ।

এই তালিকায় নাম আছে দেশ-বিদেশের আরও অনেকের। বাংলাদেশি নারীরা প্রথমে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসেননি। সামাজিক বাধা তো ছিলই। সঙ্গে ছিল ভয়ও। গাড়ির চেয়ে কম দামের হলেও মানসিক আর সামাজিক বাধাকে এড়াতে সময় লেগেছে অনেক।

কর্মজীবী অনেক নারী প্রতিদিনের যাতায়াতের ঝামেলা এড়াতে স্কুটি কিনছেন। মধ্যবিত্ত নারীরাও এখন এগিয়ে আসছেন স্কুটি আর বাইকের দিকে। এর আগেও যে নারীরা একেবারে বাইক চালাতেন না, তা নয়। বাংলাদেশে নারী বাইকার ছিলেন আগেও। তবে সেই সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। নারীদের কাছে বাইককে জনপ্রিয় আর সহজ যাতায়াত মাধ্যম করে তুলতে সবচেয়ে বড় কাজটি করেছে দেশীয় কিছু প্রতিষ্ঠান। নারীদের নিয়ে, নারীদের জন্য কাজ করেছে তারা। এদের মধ্যে অন্যতম কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হলোÑ‘ওবোন’, ‘লিলি’, ‘পিংক স্যাম’ ইত্যাদি। নারীদের কাছে বাইক চালানোকে বিলাসিতা নয়, কাজের একটি অংশ হিসেবে তুলে ধরতে সাহায্য করেছে তারা।

লিলি ‘নারীদের দ্বারা, নারীদের জন্য’Ñএই সেøাগান নিয়ে যাত্রা শুরু করে। লিলি এবং পিঙ্ক স্যাম পরবর্তী সময়ে এলেও এই যাত্রার শুরুটা বড় আকারে এবং প্রথমদিকে করে ওবোন। ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করে এই প্রতিষ্ঠানটির মোট রাইডার সংখ্যা এখন ১০০ জনের বেশি। প্রতিদিন নতুন নতুন নারীরা প্রশিক্ষণ নিতে আসছেন ওবোনের নির্ধারিত ট্রেনিং গ্রাউন্ডে। আর তাদের কোনো বাড়তি খরচ ছাড়াই বাইক চালানো শেখাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

পরিবারে আয় রোজগারের জন্য, শখের বসে কিংবা বাড়তি আয় হিসেবে অনেকেই বাইক চালাচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে এখানে কাজ করে স্বাধীনতা। বাইক চালানোর ব্যাপারটি নারীদের জন্য বাংলাদেশে স্বাধীনতার স্বাদ নেওয়ার একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের আনাচে-কানাচে বাইকে চেপে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানো মজাই আলাদা।

সুরাইয়া বাইক চালান। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু উপার্জনও হয়। তিনি বলেন, আগে আমি সেলসপারসন হিসেবে কাজ করতাম। ভার্সিটি যাওয়ার সুযোগ হতো না। বাইক চালিয়ে আমি আয় করছি। আবার ভার্সিটির ক্লাসগুলোও ঠিকভাবে করতে পারছি। স্টুডেন্ট থেকে শুরু করে মধ্যম বয়সী অনেকেই রাইডার হিসেবে কাজ করছেন। আয়ের পথ হিসেবে বাইককেই বেছে নিয়েছেন অনেকে।

আজ একজন, কাল দুজনÑএভাবে বারবার নারী রাইডার আর তাদের সঙ্গে থাকা যাত্রীকে দেখছেন এখন সবাই রাস্তায়। বাকি নারীরা অবাক হয়ে ভাবছেন, কেন এমন কিছু তারা করছেন না! আসলেই তো! কেন তারা শুরু করছেন না? অনেক সময় পরিবার, অনেক সময় সমাজ কিংবা নারী নিজেই নিজেকে বাধা দিচ্ছেন সামনে এগোতে। তবে শুরুটা তো হয়েছে অবশেষে।

নারীদের এত অগ্রগতি, এত অর্জন তারপরও ঢাকার রাস্তায় নারী মোটরবাইক চালককে দেখলে একনও ভ্রƒ কোঁচকান অনেকে। ওবোন রাইডার সুরাইয়া বলেন, ‘এমন অনেক সময় হয়েছে। পাশের অন্য চালকরাই হয়তো আমাকে বিরক্ত করেছে, বাজে কথা বলেছে। তবে সাহায্যও অনেকে করেছে।’ নারী বাইকদের নিয়ে ইতিবাচক মানসিকতার ব্যাপারটি এখন প্রায় অর্ধেক-অর্ধেক হলেও এই মানসিকতা বদলে যাবে খুব তাড়াতাড়ি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় বাজারে বাইকের অংশের দাম কমিয়ে এনেছে। বাইকের রেজিস্ট্রেশন খরচও ২০ হাজার থেকে কমিয়ে পাঁচ হাজার টাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। ফলে ২০১০-এ যেখানে বাইকারের সংখ্যা অনেক কম ছিল, সেটা বেড়ে এই বছর পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। অধিকাংশ না হলেও এতে নারী বাইকারের সংখ্যাটাও কম নয়। প্রতিদিন রাস্তায় পাশের যে নারীকে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে বাইক চালাতে দেখছেন আপনি, উনি কি আপনাকে একজন নারী হিসেবে প্রভাবিত করছে না?  আপনিও কি বাইক চালাবেন কি না সেটা ভাবছেন না? এমন ভাবনা শুধু আপনি নন, ভাবছেন আরও অনেক নারীই। আর এই উৎসাহটুকু জুগিয়ে নারীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটাকে মসৃণ করে চলা এই নারী বাইকারদের ভালোবাসা তো জানানোই যায়! আমাদের ভালোবাসা ও শুভকামনা তাই নিশ্চয়ই তাদের সঙ্গে আছে।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..