প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

রাজধানীর বস্তিবাসীর দুঃসহ জীবন

সেলিমা খাতুন: নগরায়ণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পারিবারিক নির্যাতনের কারণে অনেক নারী ও শিশু বিভিন্ন শহরে অভিবাসিত হচ্ছে। রংপুরের কোহিনুর বেগম নেশাগ্রস্ত স্বামীর নির্যাতনের কারণে সংসার ছেড়েছেন প্রায় ১০ বছর আগে। বাবার সংসারে আর্থিক অনটন থাকায় এক নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে কোহিনুর ঢাকায় চলে আসেন কাজের খোঁজে। তেজগাঁওয়ের বস্তিতে ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নেন। বুয়ার কাজ করে কোনোরকমে চলছিল কোহিনুর বেগমের জীবন। এক বছর আগে আগুনে ঘর পুড়ে গেলে তিনি উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন। পরে অনেক চেষ্টায় ঠাঁই হয় শাহজাহানপুর বস্তিতে। বস্তির ঘিঞ্জি পরিবেশে খুপরি ঘরগুলোয় ঠাসাঠাসি করে তাকে থাকতে হয়।

মহাখালীর বস্তিতে প্রায় পাঁচ বছর ধরে বাস করে আসছেন কুড়িগ্রামের সুফিয়া খাতুন। অনেক আগেই স্বামী মারা গেছেন। স্বামীর যেটুকু ভিটামাটি ও ফসলি জমি ছিল, সেটুকুও নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এরপর তিনি একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ঢাকা শহরে কাজের সন্ধানে আসেন। মা-মেয়ে দুজনই একটি গার্মেন্টে কাজ নেন। এক ঘরে তারা থাকেন আটজন। ভাড়া দিতে হয় মাসে দুই হাজার টাকা। সুফিয়া জানান, আটজনের দুই শিফটে কাজ থাকায় মানিয়ে নিতে খুব সমস্যা হয় না। স্বল্প বেতন দিয়ে ভালোভাবে থাকা সম্ভব হয় না। এসব নারী কেউ প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিঃস্ব হয়ে, কেউবা স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে অভাব-অনটনের কারণে জীবন-জীবিকার তাগিদে শহরমুখো হন।

ঢাকাসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল ও অনুন্নত শহরগুলোয় বস্তিতে বসবাস একটি পরিচিত দৃশ্য। কখনও আগুন লাগা বা বস্তি উচ্ছেদের মতো আকস্মিক ঘটনায় বস্তির বাসিন্দারা বিপদে পড়ে যায়। গত দু-তিন বছরের মধ্যে রাজধানীর আগারগাঁও, কল্যাণপুর, তেজগাঁও, বেগুনবাড়ী, কড়াইল প্রভৃতি বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘদিন একই জায়গায় বসবাস করার পর হঠাৎ এমন দুর্ঘটনায় অসহায় হয়ে পড়ে বস্তির ছিন্নমূল মানুষ। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে উš§ুক্ত আকাশের নিচে খাদ্য, পানীয় জল ও কাজবিহীন অবস্থায় বস্তিবাসীকে দুঃসহ জীবনযাপন করতে হয়। ছোট ছোট শিশুদের অবস্থা হয় আরও ভয়াবহ।

বেসরকারি সংস্থা ‘কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর (কাপ), ২০১৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতিবছর বস্তিবাসী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, আর প্রতিবছর অবৈধ বস্তি উচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। আবার বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও বেড়েই চলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে বস্তির সংখ্যা চার হাজার সাতশ’র বেশি। বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রায় চল্লিশ লাখ, যা ঢাকা মেগা সিটির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। সুপেয় পানীয় জলের অভাব, অনুন্নত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগবিহীন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ প্রায় প্রতিটি বস্তিতে বিদ্যমান। সেই পরিবেশেই ঝড়-বৃষ্টি এবং অগ্নিকাণ্ডের ভয় মাথায় নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করতে হয় বস্তিবাসীকে। অনেকে নিকটস্থ ডোবা, নালা, ড্রেন প্রভৃতি অনিরাপদ পানির উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে, ফলে আক্রান্ত হয় বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের ফলে বস্তিবাসীদের মধ্যে নারী ও শিশুদের ক্ষতি হয় সবচেয়ে বেশি। ফলে স্বাস্থ্যহীনতার প্রকোপ চলতেই থাকে। পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি রেললাইনের পাশে বস্তিতে বসবাস করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, অথচ রাজধানীতে রেললাইনের পাশে গড়ে উঠেছে অনেক বস্তি। তেজগাঁও এফডিসি গেট থেকে কারওয়ানবাজার রেলগেট পর্যন্ত রেললাইনের খুব কাছেই গড়ে উঠেছে বস্তিগুলো, যা স্বাভাবিক জীবনযাপন করার ক্ষেত্রে শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, ভয়ংকরও বটে। এছাড়া খিলগাঁও থেকে মালিবাগ রেললাইন ঘেঁষে তাবু টানিয়ে অসংখ্য ভাসমান মানুষ বসবাস করছে।

রেললাইনের পাশে গড়ে ওঠা বস্তিগুলোর পাশ দিয়ে ট্রেন চলে যায় যখন-তখন। দ্রুত গতির আন্তঃনগর ট্রেনের হুইসেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে বস্তির মানুষগুলো, বিশেষ করে ছোট শিশুরা দিগি¦দিক ছোটাছুটি শুরু করে নিরাপদ স্থানের জন্য। অনেক সময় ট্রেনঘটিত বিভিন্ন দুর্ঘটনারও শিকার হয় বস্তিবাসী। কিন্তু ট্রেন চলে গেলেই পুরোনো চেহারায় ফিরে যায় বস্তির জীবন। কেউ রেললাইনে বসেই রান্নার কাজ সারে, কেউবা আবার দুই লাইনের মাঝের খালি জায়গায় পসরা সাজিয়ে বসে ব্যবসা করে, আড্ডা দেয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা ও খাওয়া-দাওয়া করে রেললাইনে। এসব এলাকায় মারাত্মক দুর্ঘটনা ও জীবনহানি যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন প্রতিকারের উদ্যোগ নিলেও ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

নগরে বসবাস করেও নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত এই বিশাল জনগোষ্ঠী রাজধানীর অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিশেষ অবদান রেখে আসছে। মিল-কারখানার শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, পোশাকশিল্পের শ্রমিক, রিকশা ও অটোরিকশা চালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ফেরিওয়ালা, সবজি ও মাছ বিক্রেতা, বাসায় কাজ করা বুয়াসহ বিভিন্ন নি¤œ আয়ের পেশাজীবী বস্তিতে বসবাস করে। এসব স্বল্প আয়ের মানুষের বাসস্থানের দাবি দীর্ঘদিনের। রাজধানীর মিরপুরে বস্তিবাসীদের জন্য ১৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল ভবনে ৫৩৩টি আধুনিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করেছে সরকার। এর মধ্যে প্রথম দফায় ৩০০টি ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হয়েছে। চার হাজার ৫০০ টাকা মাসিক ভাড়া দিতে হবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন ৬৭৩ বর্গফুট। প্রতিদিন ১৫০ টাকা কিংবা সপ্তাহে এক হাজার ৫০ টাকা করে ফ্ল্যাটের ভাড়া পরিশোধ করা যাবে।

২০১৭ সালে এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বছরের ২৬ অক্টোবর এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বলেন, বস্তিবাসী মানুষগুলো শুধু শুধু শহরে আসে না। তারা কাজের সন্ধানে আসে, কিন্তু তারা কোনো বস্তিতে বিনা পয়সায় থাকতে পারে না। তাদের ভাড়া দিয়ে থাকতে হয়। তাদের যারা ঘর ভাড়া দেয়, জমি তাদেরও নয়। সুতরাং তারা বেআইনি কাজ করছে। প্রভাবশালী কিছু মানুষ দরিদ্র এসব বস্তিবাসীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে। তাদের জন্য রাজধানীর আশপাশের এলাকায় সরকারিভাবে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে সরকারও লাভবান হবে, বস্তিবাসীও উপকৃত হবে। এছাড়া আশপাশের জেলাগুলোর সঙ্গে রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। সারাদিন কাজ করে কেউ যদি সন্ধ্যায় রাজধানীর পাশের জেলাগুলোয় ফিরতে পারে, তাহলে বস্তির সংখ্যা এমনিতে কমে যাবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারলে কাজ শেষে ঢাকা ছেড়ে ঘরে ফেরার ব্যবস্থা বাস্তবে রূপ দেয়া সম্ভব।

বস্তিতে বসবাসকারী নি¤œ আয়ের মানুষদেরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। ঢাকার বাইরে যদি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো স্থানান্তর করা সম্ভব হতো, তাহলে রাজধানীতে বড় বড় বস্তি তৈরি হতো না। ঢাকার প্রয়োজনেই এসব বস্তি তৈরি হয়েছে। তাদের জন্য বিকল্প আবাসন ব্যবস্থা একান্ত প্রয়োজন। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সরকারি যেসব বেদখল জমি রয়েছে, তাতে বিকল্প পুনর্বাসন ব্যবস্থা করে দিলে অনেকাংশেই বস্তিবাসীর সমস্যার সমাধান হবে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না বস্তিবাসীরাও আমাদের অংশ। তাদের সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। নগরের সঠিক পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিচ্ছন্ন রাখতে বস্তি এলাকার পরিবেশ উন্নয়ন আবশ্যক। বস্তিবাসীদের জীবনের উন্নয়ন করা আমাদের নাগরিক ও মানবিক দায়িত্ব। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং আন্তরিকতা প্রয়োজন সবার আগে। সবাই মিলে বস্তিবাসীদের দুঃসহ জীবন সুন্দর করতে আমাদের সবার এগিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই।

পিআইডি নিবন্ধ