রাজধানীর যানজটে দেশ ২.৫% প্রবৃদ্ধি হারাচ্ছে

বিআইডিএসের বার্ষিক গবেষণা সম্মেলন

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী ঢাকায় যানজটের কারণে বার্ষিক জিডিপির সরাসরি ক্ষতি হচ্ছে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ। এছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাথাপিছু আয়ের ক্ষতি হয় পাঁচ দশমিক আট শতাংশ। সেইসঙ্গে ঢাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ক্ষতি হয় জিডিপির ছয় শতাংশ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনে ‘ঢাকা’স ওভারগ্রোথ অ্যান্ড ইট’স কস্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) পরিচালক আহমেদ আহসান। আরেক গবেষণায় বলা হয়, দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। ফলে দারিদ্র্য কমার হার এবং ভোগ ব্যয়ের মধ্যে বেশ ফারাক রয়েছে। রাজধানীর লেকশোর হোটেলে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ শেষ হবে তিন দিনের এই সম্মেলন।

বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সভাপতিত্বে দ্বিতীয় দিনে ১৫টির মতো গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে আহমেদ আহসান বলেন, দেশের যত মানুষ শহরে বাস করে, তার অধিকাংশ বাস করে ঢাকায়। বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। এর মধ্যে প্রধান শহরগুলোয় বাস করে ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে আবার ঢাকায় বাস করে ১১ দশমিক দুই শতাংশ মানুষ। এছাড়া ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস করে সাড়ে তিন শতাংশ শহরে। ১০ লাখের মতো মানুষ বাস করে এমন শহর মাত্র পাঁচটি।

চীনের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৩৮ কোটি। এর মধ্যে শহরে বাস করে তিন দশমিক এক শতাংশ। সবচেয়ে বড় শহরে বাস করে এক দশমিক আট শতাংশ, ১০ লাখের মতো মানুষ একটি শহরে বাস করে এমন শহর রয়েছে ১০২টি। ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৩৩ কোটি। এর মধ্যে শহরে বাস করে ছয় শতাংশ। সবচেয়ে বড় শহরে বাস করে দুই শতাংশ মানুষ। ১০ লাখের বেশি মানুষের শহর রয়েছে ৫৪টি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমের অধিকাংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। অন্য শহরগুলোয় উন্নয়নের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহারেও অন্য শহরগুলো পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অনেক, কিন্তু উৎপাদন হয় কম। ব্যবহার হয় আরও কম। দারিদ্র্য নিরসনের হার শহরাঞ্চলে কম আর গ্রামে বেশি। এই হার জাতীয় হারের চেয়ে গ্রামে বেশি। এছাড়া শ্রমিকদের মজুরি হারের প্রবৃদ্ধি শহরে কমছে। আগে যেখানে প্রবৃদ্ধির এ হার ১২ শতাংশ ছিল, এখন সেটি কমে আট শতাংশে নেমেছে।

আহমেদ আহসান জানান, দেশের বেশিরভাগ অর্থনৈতিক কার্যক্রম ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় সার্বিকভাবে দেশে নগর উন্নয়ন স্থবির হয়ে আছে। এ বিষয়টির সমাধান করার জন্য অন্যান্য শহর ও অঞ্চলের উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। সরকারি সেবার মান এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও ভালো করতে হবে। তিনি নীতিনির্ধারকদের অর্থনৈতিক কমিশন গঠনের মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া চালুর সুপারিশ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নগর প্রশাসনের হাতে নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা দেয়া প্রয়োজন। বিকেন্দ্রীকরণ-সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। নগর উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধির জায়গাগুলো ও নীতিমালা নিয়ে গবেষণা করার সুপারিশ করেন তিনি। ড. বিনায়ক সেন বলেন, ঢাকার অতিরিক্ত বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক খরচের বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারকদের উচিত একে খুবই গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা। সুপারিশগুলো সমস্যা সমাধানে কাজে আসতে পারে।

বৈষম্য বাড়ছে পূর্ব-পশ্চিমের: দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। পূর্বাঞ্চলের তুলনায় পশ্চিমাঞ্চলের বৈষম্য বেশি। পূর্বাঞ্চলের দারিদ্র্য কমছে বেশি হারে, অন্যদিকে দ্রুত বাড়ছে ভোগও। কিন্তু পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় দারিদ্র্য কমছে ধীরে এবং ভোগও কম। অর্থাৎ দেখা যায় পশ্চিমাঞ্চলে ভোগ বৃদ্ধির হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। বাংলাদেশ গবেষণা সম্মেলনে ‘কনভারজেন্স ইন ইনকাম, প্রভার্টি অ্যান্ড ইনইকুয়্যালিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এটি উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মোহাম্মদ ইউনূস।

প্রতিবেদনে ইউনূস বলেন, জাতীয় পর্যায়ে দেশে ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০১৬ সালে সেটি কমে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৩৪ শতাংশে। জাতীয় পর্যায়ে মাথাপিছু ভোগ মাসিক ২০১০ সালে ছিল এক হাজার ৪৭১ টাকা ৫৪ পয়সা। সেটি বেড়ে ২০১৬ সালে হয়েছে এক হাজার ৫০৮ টাকা ৬৪ পয়সা।

কিন্তু আঞ্চলিক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দেশের পূর্বাঞ্চলের জেলা রয়েছে ২৭টি আর পশ্চিমাঞ্চলের জেলার সংখ্যা ৩৭টি। পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় ২০১০ সালে দারিদ্র্য হার ছিল ২৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ সময় মাথাপিছু ভোগ ছিল মাসিক এক হাজার ৬১৩ টাকা ২২ পয়সা। ২০১৬ সালে এসে দারিদ্র্যের হার হয়েছে ২৩ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ। এ সময় মাথাপিছু ভোগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৯৮ টাকা ১৯ পয়সা।

এদিকে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। এ সময় মাথাপিছু ভোগ ছিল মাসিক এক হাজার ৩৭৪ টাকা ৬০ পয়সা। ২০১৬ সালে এসে দারিদ্র্য হার কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এ সময় মাথাপিছু ভোগ হয়েছে এক হাজার ৩৭৮ টাকা ৯৫ পয়সা। পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় দ্রুত হারে দারিদ্র্য কমছে এবং ভোগ বাড়ছে। তুলনামূলকভাবে কম হারে দারিদ্র্য কমছে ও ভোগ বাড়ছে পশ্চিমের জেলাগুলোয়।

আরেক গবেষণায় বিআইডিএসের গবেষক ড. আজরিন করিম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিচ্ছে, যেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে মনে করা হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয়ের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯১৪৯  জন  

সর্বশেষ..