প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

রাজনীতি থেকে ব্যবসায় যেভাবে এলাম

 

(গতকালের পর)…….

বৈষয়িক উদাসীনতা ক্যান্টনমেন্টের বন্দি অবস্থায় আমাকে এতই আবেগাপ্লুুত, ব্যথিত ও বিবেকের যন্ত্রণায় উš§ত্ত করে তুলতো যে, নামাজ শেষে সিজদায় গিয়ে ডুকরে কেঁদে বলতাম,

আল্লাহ্, হায়াত না থাকলেও আমার হায়াতটি একটু বাড়িয়ে দাও। আমার সন্তান ও স্ত্রীর জন্য একটা সাধারণ জীবনের সংস্থান করে যেন মরতে পারি। ১৫ আগস্টের পর যখন কারাগারে ছিলাম, তখন জিয়াউর রহমানের কো-অর্ডিনেশন সেলের চেয়ারম্যান ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। যুবলীগের মহাসচিব থাকার কারণে আমার বিপুল ‘অস্ত্রসম্ভার ও অর্থভাণ্ডার’ সম্পর্কে তারা প্রচণ্ডভাবে সন্দিহান ছিলেন। আমার জন্য যত বেদনাদায়কই হোক, এ চিন্তা তাদের জন্য নিতান্ত অমূলক বলা যাবে না। কো-অর্ডিনেশন সেলের তরফ থেকে নানা ধরনের তদন্তে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সশরীরে ঝিনাইদহ পর্যন্ত গিয়ে বিষয়টির অনুসন্ধান করেন। অনুসন্ধানের পর দেওয়া প্রতিবেদনে তিনি বলেন, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকার কারণে আমাকে অবরুদ্ধ রাখা প্রয়োজন। কোনো দুর্নীতি ও অর্থ-সম্পদের ক্লু খুঁজে পাননি তিনি। প্রতিবেদনের একটি জায়গায় তিনি নিঃসঙ্কোচে উল্লেখ করেন: Either gentleman is fox like cunning or scrupulously honest. We moved earth & haven but couldnÕt find a clue to lodge an FIR.. এ প্রতিবেদনটি রিট আবেদনের মাধ্যমে আমার মুক্তি পেতে ভীষণভাবে সহায়তা করেছিল।

আমার ব্যবসায়ী হওয়ার পেছনে শুধু আর্থিক দৈন্য ও পরিবারের অসহায়ত্বই নয়, আরেকটি কারণও সুপ্তভাবে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সেটি জিয়াউর রহমান সাহেবের উক্তি:  IÕll make politics difficult for politicians. . কথাটি আমার কাছে এভাবে বিবেচিত হয়েছিল যে, রাজনীতিকে তিনি হয় ক্রয় করবেন, না হলে উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মধ্যে সরাসরি সম্পৃক্ত করবেন। বক্তৃতা-বিবৃতির আওতার বাইরে রাজনীতিকে নিয়ে আসবেন। রাজনীতি যদি কেউ করতে চান, তাহলে তার আর্থিক সঙ্গতি থাকতে হবে। এমনি এমনি চিড়ে ভিজবে না। রাজনীতির প্রতিযোগিতার রিলে-রেসে এক সময় যেমন স্বাধীনতা-পূর্বকালে আমি প্রায় তিনটি এমএ ও আইন শাস্ত্রে একটি উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করি (শুধু জ্ঞানসীমায় পরিতৃপ্ত হওয়ার জন্য নয়, একাডেমিক পলিটিশিয়ান হওয়ার জন্য)। তেমনি ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর ক্যান্টনমেন্ট থেকে শুরু করে পুরো অবরুদ্ধ জীবনটি আমি সম্পূর্ণ আল্লাহর প্রতি নিজেকে সমর্পণ করি। দীর্ঘ সময়ে ইবাদতে নিমগ্ন থেকে এবং আল্লাহর কাছে মিনতি করে একটা ন্যূনতম সচ্ছল জীবন লাভ আর রাজনীতি করতে হলে যেন দুর্নীতির চোরাবালিতে পা ফেলতে না হয়, তা প্রত্যাশা করতাম। সেখান থেকে সুস্পষ্ট ও সুন্দর চিত্তে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে আমি ঘোষণা দিতে চাই, ’৭৭ সালের আগ পর্যন্ত বিত্ত, প্রাচুর্য, বৈভব তো অনেক দূরের কথা, নিজের উপার্জিত সাড়ে তিন হাত কবরের জায়গাও আমার ছিল না। এটি মিথ্যা বর্ণনা হলে কিয়ামত পর্যন্ত আমি আল্লাহর কাছে দায়ী থাকবো।

ফিরে আসি আমার ব্যবসায়িক জীবনের চড়াই-উৎরাই, ঘাত-প্রতিঘাতের কথায়। কেন জানি না একটি প্রতীতী জš§ নিয়েছে যে, আমার মায়ের এবং কোনো ওলি-আউলিয়ার দোয়ার বরকতে একটা অভাবনীয় রহমতের জীবন ভোগ করতে পেরেছি। স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য হওয়ার পর চেয়ারম্যান খুরশিদ ভাইয়ের রুমে প্রায়ই বসে থাকতাম। আহমদ ফজলুর রহমান বাংলাদেশের স্টক এক্সচেঞ্জের প্রথম চেয়ারম্যান। খুরশিদ ভাই দ্বিতীয় চেয়ারম্যান। অন্যদিকে সৈয়দ মহসীন আলী সাহেব বাঙালি হয়েও অল পাকিস্তান ফেডারেশন অব চেম্বারসের সভাপতি ছিলেন। তখন তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিরেক্টর (সম্মানীয় পরিচালক, চাকরিরত নন)। তৃতীয় পর্বের চেয়ারম্যান পদের জন্য তাদের তিনজনের মধ্যে একটা বড় ধরনের মতপার্থক্য ও মনোমালিন্য ঝগড়াঝাটির পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ একটা প্রস্তাব আসে যে, আমি চেয়ারম্যান হলে উদ্ভূত সমস্যাটির সমাধান হবে। এখানে আরেকটু জানানো প্রয়োজন যে, আমি স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যপদ পাওয়ার পর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বোর্ড অব ডাইরেক্টরসের সদস্য হই এবং খুরশিদ ভাই আমাকে বিশেষ অনুরোধে তার ভাইস চেয়ারম্যান করেন। এই ত্রিমাত্রিক অন্তর্দ্বন্দ্বে আমি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে যাই। সত্য বলতে কি, আমি মানসিকভাবে আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না। আমি তিনজনকেই ব্যক্তিগতভাবে সমঝোতার অনুরোধ করেছিলাম এই বলে যে, স্টক এক্সচেঞ্জ চালানোর মতো অভিজ্ঞতা আমার নেই। ধ্যান-ধারণাও শূন্যের কোঠায়। তারা তিনজনই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আমাকে আশ্বাস দিলেন পূর্ণ সহযোগিতার। এটা সর্বজনবিদিত যে, আহমদ ফজলুর রহমান সাহেব সিএসপি হলেও ছয় দফার অন্যতম প্রণেতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞাশীল। তিনি আমাকে ধরে জোরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, জিয়াউর রহমান সাহেব রাষ্ট্র চালাতে পারলে আপনি অবশ্যই স্টক এক্সচেঞ্জ চালাতে পারবেন। এখান থেকেই আমার ব্যবসায়িক জীবনের সফল যাত্রা।

আমি চেয়ারম্যানের কক্ষটিকে সুসজ্জিত করেছিলাম। ওখানে বসেই অবলোকন করতাম খুরশিদ ভাই, খাজা কুদ্দুস ও হেমায়েত ভাই (পরে তিনজনই স্টক এক্সচেঞ্জের সভাপতি হয়েছিলেন) বস্তা বস্তা টাকা চেয়ারম্যানের কক্ষে ঢালতেন আর হিসাবকিতাব করতেন। আমি অবাক হয়ে সেসব দেখতাম। একদিন কৌতূহল দমন করতে না পেরে বললাম, প্রতিদিন এত টাকা আনেন আর ব্যাংকে নেন, এগুলো আসে কোত্থেকে? তারা হেসে বললেন, এটা কালোটাকা নয়। ডলার-পাউন্ড বেচাকেনার টাকা। আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে ব্যবসাটি করার আগ্রহ প্রকাশ করলে তারা সহযোগিতার আন্তরিক আশ্বাস দেন। কিন্তু ব্যবসাটি করতে হলে যে কোনো একজন প্রবাসী চাকরিরত ব্যক্তির হিসাবের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। এটা নিয়ে যখন আমি চরম সংকট আর সংশয়ে এবং যখন ধরেই নিলাম ব্যবসাটি কপালে জুটলো না, তখন মুক্তিযুদ্ধে আমার অন্যতম সার্বক্ষণিক সঙ্গী মোস্তাফিজুর রহমান পাটোয়ারী ফেরেশতার মতো এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আমি সুদান এয়ারওয়েজের জেনারেল ম্যানেজার হয়েছি। তখনকার দিনে সব মিলে প্রায় দুই লাখ টাকা বেতনের অধিকারী। আমাকে তার নমিনি হতে হবে। এটি অমাবস্যার চাঁদ হাতে পাওয়ার মতোই অভাবনীয় ঘটনা। তিনি ডলার ও পাউন্ড দুটোরই নমিনি বানিয়ে আমাকে বললেন, আলম ভাই, আপনার হয়তো স্মরণ নেই, বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং মহাব্যবস্থাপক পদ থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারে (পি-ও-৯) চাকরিচ্যুত হওয়ার পর ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী স্যারকে দিয়ে আপনিই আমাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। নতুন জীবনের যাত্রা শুরুর পর আল্লাহর রহমতে আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কিছুদিনের মধ্যে ওয়েজ আর্নার্স অ্যাসোসিয়েশনও আমাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান বানিয়ে দিল। সেখানেও আহমদ ফজলুর রহমান, খুরশিদ আলম, খাজা কুদ্দুস ও হেমায়েত ভাইয়ের যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা ছিল এবং এই ব্যবসাটি করতে গিয়ে ব্যবসায়ী সমাজে আমার প্রতি যে ঔদার্য, যে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা লক্ষ্য করেছি, সেটি কেবল অপ্রত্যাশিতই নয় অভাবনীয়, অভূতপূর্ব এবং আজ পর্যন্ত অব্যাহত।

এই বিশাল অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও আজ অতিশয় সংক্ষুব্ধ হৃদয়ে ইদানীংকালের ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা নিয়ে একটি কথা বলতে হচ্ছে। তা হলো, বর্তমান অবস্থায় সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করে টিকে থাকার অবস্থা নেই। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা এখন অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত অবস্থার মধ্যে পর্যবসিত। আমার দৃষ্টিতে দেশের অর্থনীতি শুধু ভঙ্গুরই নয়, ইনটেনসিভ কেয়ারে আছে। স্টক এক্সচেঞ্জে আমি কোনো ফাটকামূলক (স্পেকুলেটিভ) শেয়ার কিনি না। তারপরও হাজার কোটি টাকার শেয়ার এখন ৪২ কোটি টাকা। এ অবস্থায়ও আমি টিকে আছি শুধু আল্লাহর ওপর আমার বিশ্বাস ও আস্থার কারণে।

এই ব্যবসা থেকে আমি একটি শিক্ষা গ্রহণ করেছি, সেটি আমার সন্তানদের আমি প্রায়ই বলি, এখনকার প্রজন্মকে ও বলতে চাই ব্যবসায়ের সবচেয়ে বড় পুঁজি হলো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া, সততা আর কমিটমেন্ট ও শৃঙ্খলা। নিষ্ঠাবানচিত্তে এটি অনুসরণ করলে ইনশাল্লাহ যে কোনো মানুষ ব্যবসায় সফলতা পাবেই। এটি আমার স্থির বিশ্বাস।  (শেষ)

 

অনুলিখন: জাকারিয়া পলাশ