প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

রাজশাহীতে টমেটো পাকাতে বিষাক্ত ইথিফন, হারাচ্ছে পুষ্টিগুণ

মেহেদী হাসান, রাজশাহী: দেখে মনে হতে পারে কোন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ চলছে। মোটা পলিথিন পেপারের উপর অপরিনত কাঁচা টমেটো ছড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকজন। এরপর স্প্রে মেশিন দিয়ে টমেটোর উপর কুয়াশার মতো ছড়িয়ে দিচ্ছে ইথিফন। এতেই সবুজ টমেটো হয়ে উঠছে লাল টুকটুকে। সেগুলো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গার উদ্যেশ্যে হচ্ছে প্যাকেট। রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে এভাবেই বিষাক্ত ইথিফন দিয়ে পাকানো হচ্ছে টমেটো; যা ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা সারাদেশ।

কৃষি বিভাগের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ইথিফন শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে এই কেমিকেল মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদরা বলছেন, ইথিফন ব্যবহারের ফলে টমেটোর পুষ্টিগুণ আগের মতো থাকেনা। এছাড়া অ্যাসিডিটিসহ বিভিন্ন বিপাক-সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

সরেজমিনে গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ীহাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সময়ের আগে জমি থেকে কাঁচা টমেটো তুলে নেওয়া হচ্ছে।এসব কাঁচা কিংবা অপরিনত টমেটো দ্রুত পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কীটনাশক ইথিফন। পচন রোধ করতে টমেটোতে ছিটানো হচ্ছে কিছু ছত্রাকনাশক। বর্তমান বাজারে কাঁচা টমেটোর পাইকারি বাজার বেশ নিন্মগামী। ফলে পাকা টমেটো থেকে বেশি দাম পাওয়ার আশায় এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন তারা। অপরদিকে স্থানীয় প্রশাসন কিংবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্মকর্তাদের কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় নি।

কথা হয় আব্দুল হামিদ নামের এক ব্যবসায়ীর সাথে। তিনি বলেন, বাজারে কাঁচা টমেটো খায় না। আর পাইকারিতে কাঁচা টমেটো বিক্রি হচ্ছে ২’ শ থেকে ৩’ শ টাকা। আর একটু পাকলে ৮’ শ টাকা থেকে মানভেদে হাজার টাকা মণও বিক্রি হয়। তাই পাকানোর ঔষধ ব্যবহার করি। শুধু আমি নই, এই এলাকায় যত চাষি আর ব্যবসায়ীরা আছে, সবাই এই পদ্ধতি ব্যবহার করি।

তিনি আরো জানান, শীত মৌসুমে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এখানকার টমেটো যায়। পাকানোর জন্য এবং লাল রং করার জন্য টমেটোতে ইথিফন ও অন্যান্য ছত্রাকনাশক জাতীয় রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। বাজারে টমেটো পাকানোর জন্য হরমন কিনতে পাওয়া যায়। মেশিনের সাহায্যে এসব স্প্রে করা হয় টমেটোতে। এরপর একদিন রোদে শুকিয়ে খড়, পলিথিন দিয়ে সেগুলো ঢেকে রাখা হয়, যেটিকে বলে ‘জাগ’। ‘জাগ’ দিয়ে এভাবে দু-তিন দিন ঢেকে রাখার পরে আবার সেগুলো রোদে শুকানো হয়। তাহলেই লাল টুকটুকে হয়ে উঠে।

গোদাগাড়ী রাজাবাড়ী এলাকার কৃষক শান্ত রহমান বলেন, জমিতে টমেটো পাকানো খুব কষ্টকর। বাণিজ্যিকভাবে টমেটো বিক্রির জন্য একসাথে পাকানো জরুরি। জমি থেকে সব টমেটো কাঙ্খিতভাবে উত্তোলন সম্ভব নয়। আর জমিতে পাকা টমেটো বাজারজাত করতে গেলে গলে যাবে। এছাড়াও শীতের কারণে টমেটো পাকতে দেরি হয়। গাছে পাকা টমেটো পাখিতে খেয়ে ফেলে। কাজেই কাঁচা টমেটো পাকাতে হরমন জাতীয় কীটনাশক মেশাতে হয়।’

তিনি আরো বলেন, বিষ দিয়ে টমেটো পাকানো হয় একদিকে বেশি দাম পাওয়ার জন্য; অন্যদিকে বাজারজাতকরণের সুবিধার জন্য। স্বাভাবিকভাবে ১০ দিনেও পাকবে না টমেটো।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কেজেএম আব্দুল আউয়াল বলেন, রাজশাহীতে এবার ৩৬’ শ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে ২৯’ শ হেক্টর চাষ হয়েছে গোদাগাড়ীতে। জেলায় মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিকটন।

ইথিফন দিয়ে টমেটো পাকানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইথিফন কোম্পানিগুলো হরমন হিসেবে বিক্রি করে। মূলত এটি একটি অর্গানোফসফরিক গ্রুপের কীটনাশক। অতিরিক্ত পরিমাণ ব্যবহারে বিপাকীয় সমস্যা, পেটের পীড়া কিংবা স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে। তবে, কৃষকরা যে পরিমাণে ব্যবহার করেন তাতে কোন সমস্যা হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের পরিচালক নাজমা শাহীন বলেন, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসারে নির্দিষ্ট রাসায়নিক ব্যবহার করে ফল পাকিয়ে বাজারজাত করা হয়। ইথোফেন ব্যবহার করে ফল পাকালে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না। এটি একধরণের গ্যাস যা ফলের ভেতরের এনজাইমকে প্রভাবিত করে যার ফলে দ্রুতবেগে ফল পাকে। উন্নত বিশ্বে বর্তমানে ইথোফেন চেম্বারে ফল রাখা হয়। সেই ফল বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারে নেয়ার পথে সাধারনত পেকে যায় ও খাওয়ার উপযোগী হয়। তবে, কার্বাইড দিয়ে ফল পাকালে আর্সেনিক বা ফসফরাসের অবশিষ্টাংশ ফলে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। এজন্য বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ফল পাকানোর কাজে কার্বাইড নিষিদ্ধ করা হয়েছে।