দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বড় হচ্ছে ‘ডেকো ফুডস’!

ডেকো গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান

রহমত রহমান: ডেকো গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ডেকো ফুডস লিমিটেড। দেশের স্বনামধন্য প্যাকেটজাত খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি মাসিক দাখিলপত্রে (ভ্যাট রিটার্ন) প্রকৃত বিক্রির ১০ ভাগের এক ভাগ দেখিয়েছে। এক বা দুই বছর নয়, চার বছর প্রতিষ্ঠানটির দাখিলপত্রে বিপুল পরিমাণ বিক্রি কম দেখিয়েছে। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি পণ্য বিক্রয় করেছে প্রায় ৬৪৪ কোটি টাকা। দাখিলপত্রে দেখিয়েছে মাত্র ৪৮ কোটি টাকা। মূলত রাজস্ব ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানটি ৪৮৭ কোটি টাকা বিক্রি কম দেখিয়েছে, যাতে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির দাখিলপত্র ও ব্যাংকে জমা দেওয়া আর্থিক বিবরণী যাচাই করে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন ও মামলা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ভ্যাট ফাঁকি দিতে বিপুল পরিমাণ বিক্রয় তথ্য গোপন করায় হতবাক এনবিআর। কর্মকর্তাদের ধারণা, চার বছরে প্রতিষ্ঠানটি এই পরিমাণ বিক্রয় তথ্য গোপন করলে এর আগেও একই কায়দায় বিক্রয় তথ্য গোপন করে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, তাহলে কি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েই বড় হচ্ছে ডেকো ফুডস? অন্যদিকে এর আগে একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের তথ্য উদ্ঘাটন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আয়কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন কিরণের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কয়েকদিন ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। খুদেবার্তা পাঠানো হলেও জবাব দেননি। এ বিষয়ে ব্যবস্থাপক (অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স) জাদিদুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা কোনো প্রতিবেদন পাইনি। কোনো ভ্যাট ফাঁকি হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘ভ্যাট অফিস যে রিপোর্টের ভিত্তিতে ভ্যাট হিসাব করেছে তা অডিটেড রিপোর্ট নয়। এ রিপোর্টে কোনো সিএ ফার্মের সই নেই। এ রিপোর্ট প্রতিষ্ঠানের লোন (ঋণ) নেওয়ার জন্য কর্মচারীরা তৈরি করেছে। কোম্পানির এত সেল (বিক্রি) হয়নি।’

এনবিআর সূত্র জানায়, ডেকো ফুডস লিমিটেডের বিরুদ্ধে বিক্রয় তথ্য গোপন করে দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআরের নির্দেশে ঢাকা পশ্চিম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের দাখিলপত্র ও বার্ষিক আর্থিক বিবরণী যাচাই করা হয়। এতে ব্যাপক গরমিল ও ভ্যাট ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায়। ২২ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবেদন দেয় ভ্যাট পশ্চিম কমিশনারেটের আওতাধীন সাভার বিভাগ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাভার জামুর মুচিপাড়া এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা পশ্চিম কমিশনারেটের আওতাধীন সাভার বিভাগের হেমায়েতপুর সার্কেলের অধীন। প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধনের পর থেকে নিয়মিত দাখিলপত্র (রিটার্ন) দাখিল করে আসছে। অভিযোগ ওঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির দাখিলপত্র যাচাই করা হয়। মাসিক দাখিলপত্রে প্রদর্শিত বিক্রয়মূল্য এবং ব্যাংক থেকে প্রেরিত আর্থিক বিবরণীতে প্রাপ্ত তথ্য তুলনা করে হিসাবের গরমিল ও বিপুল পরিমাণ ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়েছে।

যাতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে পণ্যের বিক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ১২০ কোটি ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৪৭৮ টাকা। ওই অর্থবছর দাখিলপত্রে দেখিয়েছে, (ভ্যাট, রপ্তানি, অব্যাহতি ও ট্যারিফ পণ্যের প্রকৃত সরবরাহ মূল্যসহ মোট সরবরাহ মূল্য) ৩২ কোটি ৮৩ লাখ ৮৫ হাজার ৪২১ টাকা। দাখিলপত্রে বিক্রয় দেখানো হয়নি ৮৭ কোটি ৩০ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭ টাকা। এর ওপর অপরিশোধিত বা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ১১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৭ টাকা।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ১৫০ কোটি ২৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৩২ টাকা। দাখিলপত্রে ভ্যাট আরোপযোগ্য মূল্য, রপ্তানি ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত মূল্য দেখানো হয়েছে, ১৩ কোটি ১৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৭৬ টাকা। ওই অর্থবছর দাখিলপত্রে দেখিয়েছে, (ভ্যাট, রপ্তানি, অব্যাহতি ও ট্যারিফ পণ্যের প্রকৃত সরবরাহ মূল্যসহ মোট সরবরাহ মূল্য) ৩২ কোটি ৮৩ লাখ ৮৫ হাজার ৪২২ টাকা। দাখিলপত্রে বিক্রয় দেখানো হয়নি ১১৭ কোটি ৩৯ লাখ ৬৩ হাজার ১০ টাকা। এর ওপর অপরিশোধিত বা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ১৫ কোটি ৩১ লাখ ২৫ হাজার ৬১০ টাকা।

২০১৬-১৭ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ১৮০ কোটি ৬৭ লাখ ৬৩ হাজার ৩৮৬ টাকা। দাখিলপত্রে ভ্যাট আরোপযোগ্য মূল্য, রপ্তানি ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত মূল্য দেখানো হয়েছে, ১৫ কোটি ৬৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৯৩ টাকা। ওই অর্থবছর দাখিলপত্রে দেখিয়েছে (ভ্যাট, রপ্তানি, অব্যাহতি ও ট্যারিফ পণ্যের প্রকৃত সরবরাহ মূল্যসহ মোট সরবরাহ মূল্য) ৪০ কোটি ৫৮ লাখ ৬৬ হাজার ১৯ টাকা। দাখিলপত্রে বিক্রয় দেখানো হয়নি ১৪০ কোটি ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৩৬৭ টাকা। এর ওপর অপরিশোধিত বা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ১৮ কোটি ২৭ লাখ ২৫ হাজার ৭৪৩ টাকা।

২০১৭-১৮ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ১৯৩ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৮২২ টাকা। দাখিলপত্রে ভ্যাট আরোপযোগ্য মূল্য, রপ্তানি ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত মূল্য দেখানো হয়েছে ১৯ কোটি ৫৪ লাখ ৬৯ হাজার ১৬ টাকা। ওই অর্থবছর দাখিলপত্রে দেখিয়েছে (ভ্যাট, রপ্তানি, অব্যাহতি ও ট্যারিফ পণ্যের প্রকৃত সরবরাহ মূল্যসহ মোট সরবরাহ মূল্য) ৫০ কোটি ৬২ লাখ ৮৯ হাজার ৭০৭ টাকা। দাখিলপত্রে বিক্রয় দেখানো হয়নি ১৪২ কোটি ৬৯ লাখ ৪৭ হাজার ১১৫ টাকা। এর ওপর অপরিশোধিত বা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ১৮ কোটি ৬১ লাখ ২৩ হাজার ৫৩৭ টাকা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৪৮ মাসে পণ্যের সরবরাহ মূল্য দেখিয়েছে ৬৪৪ কোটি ৩৮ লাখ ১৩ হাজার ১১৮ টাকা। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট অফিসে দাখিল করা দাখিলপত্রে দেখিয়েছে ৪৮ কোটি ৩৮ লাখ ৭৭ হাজার ৬৮৫ টাকা। তবে প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ ট্যারিফ মূল্যে দেখানো এবং সরবরাহ করা হয়। ট্যারিফ মূল্য অনুযায়ী সেই পণ্যের সরবরাহ নির্ধারণ করা হয়েছে। দাখিলপত্র অনুযায়ী, ৪৮ মাসে ভ্যাট, রপ্তানি, অব্যাহতি এবং ট্যারিফ পণ্যের প্রকৃত সরবরাহ মূল্যসহ মোট সরবরাহ মূল্য ১৫৬ কোটি ৮৯ লাখ ২৬ হাজার ৫৬৯ টাকা।

সে হিসাবে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী মোট সরবরাহ মূল্য ৬৪৪ কোটি ৩৮ লাখ ১৩ হাজার ১১৮ থেকে ১৫৬ কোটি ৮৯ লাখ ২৬ হাজার ৫৬৯ টাকা বাদ দিলে প্রতিষ্ঠানটির মোট বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ৪৮৭ কোটি ৪৮ লাখ ৮৬ হাজার ৫৪৯ টাকা। পণ্যের এ বিক্রয়মূল্য প্রতিষ্ঠানটি দাখিলপত্রে দেখানো বা প্রদর্শন করেনি। এর ওপর ১৫ শতাংশ হারে প্রযোজ্য ভ্যাট ৬৩ কোটি ৫৮ লাখ ৫৪ হাজার ৭৬৭ টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটি পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদ প্রযোজ্য। ফলে সুদ হিসাব করা হলে ফাঁকি শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

এ বিষয়ে ভ্যাট পশ্চিম কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ডেকো ফুডের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী ও প্রতিষ্ঠানের জমা দেওয়া দাখিলপত্র থেকে বিক্রয় হিসাব করা হয়েছে। প্রকৃত বিক্রয়ের ওপর ভ্যাট হিসাব করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মোট বিক্রয়ের ১০ ভাগের মাত্র ১ ভাগ দেখিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়ের আড়ালে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকিতে আমরাও হতবাক। আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছে। চূড়ান্ত দাবিনামা শেষে ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট পরিশোধ না করলে ব্যাংক হিসাব জব্দের বিধান রয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও সরবরাহে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ডেকো গ্রুপ দুই ভাগে বিভক্ত। ডেকো লিগ্যাসি দেখভাল করছেন শাহাদাত হোসেন কিরণ। ডেকো ইশো দেখভাল করছেন শাহীদ হোসেন। প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডেকো অ্যাপারেলস লিমিটেড, ডেকো রেডিওয়্যারস লিমিটেড, গ্লোবাস গার্মেন্টস, ডেকো গার্মেন্টস লিমিটেড, আগামী ফ্যাশনস লিমিটেড, আগামী ওয়াশিং লিমিটেড। এছাড়া রয়েছে রক্সি পেইন্টস।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..