Print Date & Time : 23 June 2021 Wednesday 6:13 pm

রাজস্ব বাড়বে ৩৪০০ কোটি টাকা ব্যবহার কমবে ১ শতাংশ

প্রকাশ: April 17, 2021 সময়- 11:45 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে তামাক এমনিতে অত্যন্ত সস্তা। দেশে মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়লেও সে তুলনায় তামাকের দাম বাড়েনি, বরং কমেছে। যার ফলে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। এছাড়া বাংলাদেশে তামাকের কর কাঠামো অত্যন্ত জটিল। যার ফলে বছরে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেজন্য আগামী বাজেটে তামাকের কর কাঠামো পরিবর্তনসহ কয়েকটি প্রস্তাব ও সুপারিশ করেছে তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞা বলছে, প্রস্তাব ও সুপারিশগুলো বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হলে তামাক ব্যবহারকারী ১ শতাংশ কমে যাবে। এছাড়া বর্তমানের চেয়ে অন্তত ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব পাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

সূত্রমতে, দেশে সব তামাক পণ্যের ওপর মূল্যের শতাংশ হারে সম্পূরক শুল্ক ধার্য করা হয়। এছাড়া তামাক পণ্যের ধরন (সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুল), বৈশিষ্ট্য (ফিল্টার, নন ফিল্টার), ব্র্যান্ড (সিগারেটে ৪টি মূল্যস্তর যথা নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ এবং প্রিমিয়াম) ভেদে ভিত্তিমূল্য এবং করহার এ রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। সিগারেটে বহু স্তরবিশিষ্ট কর কাঠামো চালু থাকায় বাজারে অত্যন্ত সস্তা এবং সহজলভ্য সিগারেট বিদ্যমান। ধূমপান ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে ভোক্তা তুলনামূলকভাবে কম দামি সিগারেট বেছে নিতে পারছে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মাথাপিছু সিগারেট বিক্রি বিগত বছরগুলোতে প্রায় একই রকম রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিগারেটের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে প্রায় একই রকম রয়েছে। করের ভিত্তি এবং করহার খুবই কম হওয়ায় বিড়ি এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য (জর্দা ও গুল) অধিক সহজলভ্য থেকে যাচ্ছে।

প্রজ্ঞার প্রস্তাবে বলা হয়, সব সিগারেট ব্র্যান্ডে অভিন্ন করভারসহ (এক্সাইজ অংশ চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের ৬৫%) মূল্য স্তরভিত্তিক সুনির্দিষ্ট এক্সাইজ (সম্পূরক) শুল্ক প্রচলন করা। সিগারেটের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের নিম্ন স্তরে খুচরা মূল্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করে ৩২.৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা; মধ্যম স্তরে খুচরা মূল্য ৭০ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫.৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা; উচ্চ স্তরে খুচরা মূল্য ১১০ টাকা নির্ধারণ করে ৭১.৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক এবং প্রিমিয়াম স্তরে ১৪০ টাকা খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে ৯১ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা। এর ফলে সব মূল্যস্তরে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কের হার হবে চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের ৬৫ শতাংশ। সিগারেটের খুচরা মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল থাকবে।

বিড়ির ক্ষেত্রে ফিল্টারবিহীন ২৫ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করে ১১.২৫ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা; ফিল্টারযুক্ত ২০ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ২০ টাকা নির্ধারণ করে ৯.০০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা। এর ফলে উভয় ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কের হার হবে চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের ৪৫ শতাংশ। বিড়ির খুচরা মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল থাকবে। ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের (জর্দা ও গুল) ক্ষেত্রে প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার খুচরা মূল্য ৪৫ টাকা নির্ধারণ করে ২৭.০০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা; প্রতি ১০ গ্রাম গুলের খুচরা মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করে ১৫.০০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা। এর ফলে উভয় ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কের হার হবে চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের ৬০ শতাংশ। জর্দা ও গুলের খুচরা মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল থাকবে।

প্রস্তাবে বলা হয়, আগামী অর্থবছরে এ প্রস্তাব অনুযায়ী তামাকপণ্যের বিদ্যমান কর ব্যবস্থা সংস্কার করা হলে সিগারেটের ব্যবহার ১৫.১% থেকে হ্রাস পেয়ে ১৪.১% হবে। প্রায় ১১ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছেড়ে দিতে উৎসাহিত হবে এবং ৮ লাখ তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে ৩ লাখ ৯০ হাজার বর্তমান ধূমপায়ী এবং ৪ লাখ তরুণের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে। বর্তমান অর্থবছরের চেয়ে সম্পূরক শুল্ক, স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ এবং ভ্যাট বাবদ ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় অর্জিত হবে। অর্থাৎ প্রথম বছরে সিগারেট খাত থেকে ১২ শতাংশ বাড়তি রাজস্ব আয় হবে। নিম্নস্তরে সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি তুলনামূলক স্বল্প আয়ের মানুষকে ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত করবে। একইসঙ্গে উচ্চ স্তরে সিগারেটের দাম বাড়ানো হলে ধূমপায়ীদের সস্তা ব্র্যান্ডে স্থানান্তর হওয়ার সামর্থ্য সীমিত হবে। বিড়ি এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে এসব পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করবে। একইসঙ্গে ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনে অন্যতম কার্যকর উপায় হবে তামাকপণ্যে কর বৃদ্ধি। 

কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। তাহলো তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা হ্রাস করতে মূল্যস্ফীতি এবং আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক নিয়মিতভাবে বৃদ্ধি করতে হবে; করারোপ প্রক্রিয়া সহজ করতে তামাকপণ্যের মধ্যে বিদ্যমান বিভাজন (ফিল্টার/নন ফিল্টার বিড়ি, সিগারেটের মূল্যস্তর, জর্দা ও গুলের আলাদা খুচরা মূল্য প্রভৃতি) তুলে দিতে হবে; সব ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য উৎপাদনকারীকে করজালের আওতায় নিয়ে আসতে হবে; পর্যায়ক্রমে সকল তামাকপণ্য অভিন্ন পরিমাণে (শলাকা সংখ্যা এবং ওজন) প্যাকেট/কৌটায় বাজারজাত করা; একটি সহজ এবং কার্যকর তামাক কর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন (৫ বছর মেয়াদি) করা, যা তামাকের ব্যবহার হ্রাস এবং রাজস্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে; সকল প্রকার ই-সিগারেট এবং হিটেড (আইকিউওএস) তামাকপণ্যের উৎপাদন, আমদানি এবং বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা; কঠোর লাইসেন্সিং এবং ট্রেসিং ব্যবস্থাসহ তামাক কর প্রশাসন শক্তিশালী করা, কর ফাঁকির জন্য শাস্তিমূলক জরিমানার ব্যবস্থা করা; তামাকপণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক পুনর্বহাল করতে হবে।