প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আমাদের অর্থনীতি

জাহিদ মুরাদ: বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ার দূরত্ব প্রায় চার হাজার ৩০০ কিলোমিটার এবং ইউক্রেনের দূরত্ব প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পূর্ব ইউক্রেনের দুটি অঞ্চল লুহ্যানস্ক ও দানইয়াস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেন এবং একই দিন ভোরে সেখানে স্থল, আকাশ ও জলপথে সামরিক অভিযান শুরু করেন। রাশিয়া যুদ্ধের কৌশল হিসেবে শুরুতেই ইউক্রেনের বড় সমুদ্রবন্দরগুলো ব্লক করে ফেলে। ফলে যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের বন্দরগুলোর কম-বেশি শতকরা ৮০ শতাংশ অবরুদ্ধ হয়ে আছে। ইউক্রেন থেকে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধে ইউক্রেন বাহিনীও তাদের প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইউক্রেনকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা। প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা তাদের দেশে থাকা রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করে। এর পাশাপাশি রাশিয়ার বিরুদ্ধে নানারকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, জাপান, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশ রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে অবরোধ করার লক্ষ্যে সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তারা সম্মিলিতভাবে রাশিয়ার প্রথম শ্রেণির কয়েকটি ব্যাংকের ওপর সুইফট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়। রাশিয়া প্রতিদিন কম-বেশি চার লাখ লেনদেন সম্পন্ন করে এই সুইফটের মাধ্যমে। এই সুইফট বা সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন হচ্ছে ২০০টিরও বেশি দেশে ব্যবহƒত একটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ম্যাসেজিং সিস্টেম, যা কোনো আন্তর্জাতিক লেনদেনের তথ্য ওই অর্থের প্রেরক ও প্রাপককে ম্যাসেজের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্রুততার সঙ্গে জানিয়ে দেয়। ফলে কার্যত রাশিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়ে। রুশ ব্যবসায়ীরাও পড়েন নিষেধাজ্ঞার আওতায়।

যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে ইউক্রেনকে আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে। কিন্তু এ অস্ত্র ব্যবহারে শর্ত দেয়া হয়েছে। শর্ত হলো যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল দিয়ে বিয়ন্ড বর্ডার রাশিয়াতে আক্রমণ করা যাবে না। ফলে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধটা ইউক্রেনের সীমানাতে সীমাবদ্ধ থাকছে, রাশিয়ার ভূখণ্ডে যুদ্ধ হচ্ছে না। অবকাঠামোসহ অন্যান্য সব ক্ষয়ক্ষতি ইউক্রেনে হচ্ছে। রাশিয়ার ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা চাচ্ছে যুদ্ধটা ইউক্রেনের সীমানায় সীমাবদ্ধ রাখতে। যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও মনে রাখা দরকার, জাতিসংঘ অদ্যাবধি কোনো যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি। এ যুদ্ধে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ দেশ জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। সাধারণত অক্টোবর থেকে ইউরোপে শীত শুরু হয়। বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা না হলে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে ইউরোপীয় দেশগুলোকে। এরই মধ্যে বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকি মুখে পড়েছে। বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সংস্থার গত জুনের তথ্য মোতাবেক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় দুই কোটি মানুষের খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে এ মহাদেশের বেশ কয়েকটি দেশে খাদ্য সরবরাহ করা না গেলে ওইসব দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। বিশেষ করে কেনিয়া ও ইথিওপিয়ায় জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সহায়তা পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে লাখ লাখ মানুষকে অনাহারে থাকতে হবে। তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে। এসব অঞ্চলে করোনা অতিমারি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্যাভাব শুরু হয়।

জিডিপির আকার বিবেচনা করলে রাশিয়া বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম দেশ। বিশ্বের এক- তৃতীয়াংশ গম ও তুলা সরবরাহ করে রাশিয়া। আর তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বের এক-দশমাংশ তেল উৎপাদন করে রাশিয়া। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি তেল এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়া। এছাড়া রাশিয়া সূর্যমুখী তেল ও ভুট্টা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে থাকে।

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন নানাভাবে আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য সহায়তা করেছিল। এছাড়া দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানাভাবে সহায়তা করেছে। তাই রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদুৎকেন্দ্র। আরও একটা বড় প্রকল্প হলো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২। এসব প্রকল্প রাশিয়ার সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ সামরিক সরঞ্জামসহ বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতি ও সার ক্রয় করে। এছাড়া বাংলাদেশ ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে গম, ভুট্টা ও তেলবীজ কিনে থাকে। বাংলাদেশের গমের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ এবং ভুট্টার এক-পঞ্চমাংশ আসে ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে। বিশ্বের সিংহভাগ সার রপ্তানি করে রাশিয়া ও বেলারুশ। রাশিয়ার ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে সার সংগ্রহে সমস্যা হবে। ফলে এ বছর কৃষিপণ্য উৎপাদনে সমস্যা না হলেও আগামীতে কৃষককে সময়মতো সার সরবরাহে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বর্তমান সরকার তাই এরই মধ্যে কিছু কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে।

বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের বিভিন্ন রকমের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর বিভিন্ন মাত্রায় নানাভাবে পড়বে, এটাই বাস্তবতা। যদিও রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ খুব বেশি নয়, তব্ওু হাজার হাজার মাইল দূরের দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বিদ্যমান অসম যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পড়ছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে অনেক এগিয়ে আছে। রাশিয়া থেকে যে পরিমাণ গম, সার, স্টিল বা অ্যালুমিনিয়াম বাংলাদেশ আমদানি করে, তার থেকে বেশি তৈরি পোশাক রাশিয়ায় রপ্তানি করে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে তৈরি পোশাকের পরিমাণ বেশি। আর আমদানি করা হয়েছে ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য, যার বেশিরভাগ খাদ্যপণ্য। বাংলাদেশের গমের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। ইউক্রেন থেকে বাংলাদেশ গম আমদানি করে এবং রপ্তানি করে তৈরি পোশাক। এর পরিমাণ খুব বেশি নয়। তবে এ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এ দুই দেশে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

কভিড-১৯ অতিমারি মোকাবিলায় ২০২০ সাল থেকে বিশ্ব অর্থনীতি ছিল টালমাটাল। দেশে দেশে লক ডাউনের কারণে সবকিছুই ছিল বন্ধ। সংক্রমণ যখন নিয়ন্ত্রণে এলো, সবকিছু যখন স্বাভাবিক হতে শুরু করল, মানুষ যখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, তখনই অপ্রত্যাশিতভাবে শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

বাংলাদেশ বিশ্ব থেকে বিছিন্ন নয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ থেকে রাশিয়া বছরে ৬৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি তৈরি পোশাক আমদানি করে। রাশিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংককে বৈশ্বিক আন্তঃব্যাংক লেনদেন-সংক্রান্ত সুইফট সিস্টেমে নিষিদ্ধ করায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হুমকির মুখে পড়েছে। যেসব তৈরি পোশাকের অর্ডার শিপমেন্ট হয়েছে, তার পেমেন্ট পাওয়াও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে তেল, গ্যাসসহ খাদ্যপণ্যের সরবরাহে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রভাব এরই মধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশে পড়েছে। অর্থনৈতিক মন্দাসহ মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। ডলারের তুলনায় বিশ্বের প্রায় সব দেশের মুদ্রার মান পড়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনও বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ভালো। বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে সাত শতাংশের কিছু বেশি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের ৭ দশমিক শূন্য ১, পাকিস্তানের ৩৮ ও নেপালের ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ৯ দশমিক ১, ইরানে ৩৯ দশমিক ৩, জার্মানিতে ৭ দশমিক ৯, কানাডায় ৬ দশমিক ৮, তুরস্কে ৭৩ দশমিক ৫ এবং ভেনেজুয়েলায় ২২২ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে। মার্কিন অর্থনীতিতে এখন ভাটার টান দেখা যাচ্ছে। বিশ্বমন্দার মধ্যেও অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো।

তবে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। ডলারের তুলনায় এরই মধ্যে টাকার মান কমে গেছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গেছে। তবে আশার কথা হলো আমাদের ফরেন রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। বাংলাদেশ আপাতদৃষ্টিতে ঝুঁকিমুক্ত মনে হলেও সরকার এরই মধ্যে দেশবাসীকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আমাদের দেশের সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জনগণের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করে তাদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। সরকার এরই মধ্যে বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করা, বিদেশ ভ্রমণ কমানো, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কম করে জ্বালানি সাশ্রয় করা, গাড়ির ব্যবহার সীমিত রাখাসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয় মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স সহজে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা পাচার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের এসব সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে এরই মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করেছে।

করোনা অতিমারি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে দেশবাসী। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনাকাক্সিক্ষত ও অপ্রত্যাশিত ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ নির্মাণ করা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ।

পিআইডি নিবন্ধ