প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

রাষ্ট্রীয় খরচে অপ্রয়োজনে বিদেশ সফর বন্ধ হোক

সরকারি কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশ ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণে পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা-৬ অধিশাখার জারি করা পরিপত্রে বলা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে পুনরাদেশ না দেয়া পর্যন্ত সব ধরনের এক্সপোজার ভিজিট, স্টাডি ট্যুর ও ইনোভেশনের আওতাভুক্ত ভ্রমণ ও ওয়ার্কশপ, সেমিনারে অংশ নেয়াসহ সব ধরনের বৈদেশিক ভ্রমণ বন্ধ থাকবে। অবশ্য আগের দিন সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিশেষ প্রয়োজনে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিদেশ যাবেন, অন্যথায় কেউ যেতে পারবেন না।

সাম্প্রতিক সময়ে এমন সব ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশ ভ্রমণ সফর করেছেন, যা ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। যেমন, গত ৬ মে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে সুবর্ণজয়ন্তীর কনসার্টে যোগ দেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, কর্মকর্তা ও স্বজনসহ ৫৫ জনের বহর। ওই কনসার্টের আয়োজক বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। ‘গোল্ডেন জুবিলি বাংলাদেশ কনসার্ট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট রোডশো’ শীর্ষক ওই অনুষ্ঠানে যারা গেছেন, কার কী দায়িত্ব, আয়োজক প্রতিষ্ঠান স্পষ্ট করে তা বলতে পারেনি। ফলে সরকারি টাকায় ব্যয়বহুল ভ্রমণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অথচ সরাকারি আদেশ (জিও) অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্রমণের পুরো সময় সরকারি দায়িত্ব পালন হিসেবে গণ্য হবে বলে উল্লেখ করা হয়।

তুচ্ছ কারণে সরকারি খরচে বিদেশে ভ্রমণের দৃষ্টান্ত এটিই প্রথম নয়। সাধারণত প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণে বিদেশে পাঠানো হয়, যাতে তারা দেশে ফিরে উন্নত দেশের প্রযুক্তি ও জ্ঞান কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের নামে বিদেশ সফরে কোনো নিয়মনীতিই মানা হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ করে ঢালাও বিদেশ ভ্রমণ ঠেকাতে একজন সরকারি কর্মকর্তা কতবার বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন, তা বেঁধে দেয়া আছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে তারা কোনো প্রতিবেদনও জমা দেন না। ফলে জানা যায় না, রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশ গিয়ে কী জ্ঞান-প্রশিক্ষণ অর্জিত হয়েছে।

আমাদের মনে আছে, এক হাজার সরকারি কর্মকর্তাকে খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশে পাঠাতে চেয়েছিল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণের জন্য তাদের বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়ে হাস্যরস সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাম-শহর কোথাও এমন কোনো মানুষ নেই, যিনি পুকুর চেনেন না। অথচ পুকুর খনন শিখতে বিদেশ যাওয়ার দৃষ্টান্তও আছে। সেই ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের অবহিতকরণকালে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছিলেন, সামান্য কারণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশ ভ্রমণ থেমে থাকেনি। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিশেষ প্রয়োজনে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিদেশ যাবেন। কিন্তু ‘বিশেষ প্রয়োজন’ কীভাব নির্ণয় করা হবে, তা বলেননি তিনি। কেন সাধারণ বিষয় বোঝার জন্য সরকারি অর্থ খরচ করে বিদেশ যেতে হবে! বিদেশের আমন্ত্রণ, ঋণের টাকায় বিদেশ সফর যা-ই হোক, সেটির খরচ সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপে। আমরা মনে করি, দেরিতে হলেও রাষ্ট্রীয় খরচে অকারণে বিদেশ সফরের প্রবণতা ঠেকাতে পরিপত্র জারি প্রশংসনীয়। এটি যাতে যথারীতি পরিপালিত হয়, সে বিষয়ে তদারকি বাড়াতে হবে। ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, যাতে উপযুক্ত ব্যক্তিরাই বিদেশ সফরে যেতে পারেন।