রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাঙচুর করা ছাত্রদের কাজ নয়: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: সড়কে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যারা গাড়ি ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগ করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে শিক্ষার্থীদের তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে লেখাপড়ায় মন দিতে বলেছেন।

সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলার পরামর্শ দেয়ার পাশপাশি চালকদেরও সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে বলেছেন সরকারপ্রধান।

গতকাল গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুরাল উদ্বোধন এবং ধানমণ্ডিতে জয়িতা টাওয়ারের ভিত্তি স্থাপন অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে এ বিষয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘একটা গাড়িতে অ্যাকসিডেন্ট হয়ে একটা মানুষ মারা গেল বলে আরও ১৫টা গাড়ি ভাঙা, সেখানে আগুন দেয়া এবং সেই ভাঙার ফলে ও আগুন দেয়ার ফলে গাড়িতে যাত্রী, ড্রাইভার, তারা যারা আহত হয় অথবা নিহত হয়, সেই দায়িত্বটা কারা নেবে?’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভবিষ্যতে বাংলাদেশটাকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাঙচোরÑএটা ছাত্রদের কাজ নয়। এটা কেউ করবেন না দয়া করে। যার যার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যান। লেখাপড়া করেন।’

আন্দোলনের নামে যারা নাশকতায় জড়াচ্ছে, তাদের হুশিয়ার করেন সরকারপ্রধান। ‘গাড়ি ভাঙচুর, আগুন দেয়ার কাজ যারা করবে, তাদের খুঁজে বের করা হবে, তাদেরও শাস্তি দেয়া হবে। আর যে গাড়িতে আগুন দেবে, সেই গাড়িতে যদি কেউ মারা যায় বা কেউ আগুনে পোড়ে, তাহলে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে।’

সরকার বাসের ভাড়া বাড়ানোর পর থেকে শিক্ষার্থীরা অর্ধেক ভাড়া দেয়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। এর মধ্যে ২৪ নভেম্বর সিটি করপোরেশনের গাড়ির ধাক্কায় নটর ডেম কলেজ শিক্ষার্থী নাঈম হাসান ও ২৯ নভেম্বর রামপুরায় বাসচাপায় একারামুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়লের শিক্ষার্থী মাঈনউদ্দিনের মৃত্যু হলে আন্দোলন আরও জোর পায়।

মাঈনউদ্দিনের মৃত্যুর পর ওই সড়কে বেশ কয়েকটি বাসে আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা, ভাঙচুর করা হয় আরও কয়েকটি যানবাহন।

সড়ক দুর্ঘটনার পর মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে লাঠিসোঁটা হাতে কিছু মানুষের গাড়ি ভাঙচুর ও গাড়িতে আগুন দেয়া কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘এই যে আগুন দেয়া শুরু হলো, ওই গাড়িতে কি যাত্রী নেই? শিশু নেই? ওখানে কি ছাত্র-ছাত্রী নেই? ওই আগুনে যারা পুড়বে, আহত হবে বা মারাও যেতে পারে, তার দায়িত্বটা কে নেবে? খুব স্বাভাবিকভাবে যারা গাড়ি ভাঙচুর করছে, তাদের ওপর বর্তায়। তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে সেই ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।’

হতাহতের দায়ও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগকারীদের নিতে হবে বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘যদি আহত হয়, বা নিহত হয়, সেটার দায়িত্ব যারা ভাঙচুর করছে, তাদের। সে কারণে আমি বলব, আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না।’

সড়কে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী সিটি করপোরেশনের গাড়ি চাপায় প্রাণহানির ঘটনায় কারা দায়ী তা খুঁজে বের করারও নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন, ‘তখন ময়লার গাড়ি নিয়ে যে যাচ্ছিল, সেই গাড়ির সামনে দিয়ে কেউ হেঁটে যাবে কেন? সেটাও তো দেখতে হবে, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। আর গাড়ি যে চালাচ্ছিল, তার এই গাড়ি চালানোর মতো দক্ষতা আছে কি না, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। উভয় দিকেই দায়িত্বশীলতা কার কতটুকু আছে, সেটা আমাদের দেখতে হবে।’

গাড়ি চালকদের উদ্দেশে সরকারপ্রধান বলেন, ‘তাদের সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে হবে।’

জনবহুল এ দেশে আরও অনেক গাড়িচালক প্রয়োজন বলে জানিয়ে সরকারের নেয়া পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘সরকার যতগুলো মহাসড়ক করছে, সেখানে চালকদের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা রয়েছে।’

বেসরকারি বাসচালকদের জন্য প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়ে তাদের কর্মঘণ্টা বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সময় দেয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘রাস্তাঘাটে চলার সময় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ট্রাফিক রুলস মেনে চলতে হবে। রাস্তার যে কোনো জায়গা থেকে, যেখান থেকে সেখান থেকে রাস্তা পার হতে গেলে অ্যাক্সিডেন্ট হবেই। একটা চলমান গাড়ি চট করে ব্রেক করতে পারে না। সেটার ব্রেকটা কষতে সময় লাগে। প্রত্যেকটা রাস্তায় পারাপার করার জায়গা নির্দিষ্ট করা আছে। সেখান থেকেই রাস্তা পার হওয়া সমীচীন। হঠাৎ করে দৌড় দেবে আর অ্যাক্সিডেন্ট হবে, আর অ্যাক্সিডেন্ট হলেই রাস্তায় লোক নেমে গাড়ি ভাঙা, গাড়িতে আগুন দেয়া, গাড়ি পোড়ানোÑএটা কী ধরনের কথা?’

বাংলাদেশের অগ্রগতি ও অতীতের সঙ্গে দেশের মানুষের জীবনযাপনের পার্থক্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন যা দেখছে, আগে তা ছিল না, সেটাও শিক্ষার্থীদের বিবেচনায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, ‘কাজেই তাদের ভবিষ্যতে বাংলাদেশটাকে এই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।’

ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান লাকী ইনাম, জয়িতা ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফরোজা খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯১১৩  জন  

সর্বশেষ..