পাঠকের চিঠি

রাস্তায় ময়লার ভাগাড়, অপরিচ্ছন্ন ড্রেন: ডেঙ্গু প্রতিরোধ কতটা সম্ভব?

গত কয়েক দিন একশ্রেণির কাণ্ডজ্ঞানহীন অতি-উৎসাহীদের হাতে ছেলেধরা সন্দেহে একাধিক নিরীহ মানুষের গণপিটুনিতে প্রাণ হারানোর ঘটনাগুলো বিস্মৃত হতে না হতেই আমাদের জাতীয় জীবনে নতুন করে বিপদ হয়ে ঘরের কড়া নাড়ছে ডেঙ্গুজ্বর।
এই ডেঙ্গুজ্বরের কবলে পড়েছে দেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিরাও। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে চিকিৎসকসহ সব শ্রেণির মানুষ। এরই মধ্যে অনেকে প্রাণ হারিয়েছে। ডেঙ্গুর আতঙ্ক এখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।
এখন মানুষ নিজের চেয়ে সন্তানদের নিয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এই ডেঙ্গু এসে কখন হানা দেবে তাদের কলিজার টুকরাকে, এই ভয়ে অনেকে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে, যাতে মশা যেন তাদের শরীর স্পর্শ না করতে পারে। কিন্তু এই অবস্থার শেষ কোথায়?
আমরা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জেনেছি একমাত্র এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গুর ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে। সেই মশার জন্ম হয় ডোবা-নর্দমায়। অথচ বাড়ি থেকে বের হলেই চোখে পড়ে আমাদের চারপাশ ডোবা আর নর্দমায় ভরা। আমাদের রাস্তার পাশে ময়লার ভাগাড়, পানি নিষ্কাশনের নালাগুলো ময়লায় ভরা। সেখানে প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে লাখ লাখ মশা। শুধু কি তা-ই, গ্রামের রাস্তাঘাটেও এখন ময়লা আর ময়লা। অথচ সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে আমরা খবরের মাধ্যমগুলো থেকে জানতে পারছি। মফস্বল শহরগুলোতে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা বিভিন্ন সভা-সেমিনার করছেন। কিন্তু বাড়ির পাশে, রাস্তার ধারে যে পানি নিষ্কাশনের নালাগুলোতে ময়লায় ভরা, তা পরিষ্কার করবে কে? এসব স্থান থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ মশা জন্ম নিচ্ছে। রাস্তায় ময়লার ভাগাড় আর অপরিচ্ছন্ন ড্রেন রেখে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কতটা সম্ভব।
আমাদের দেশে প্রতিটি জায়গায় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা ছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় প্রতিটি গ্রামে পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সেই ড্রেনগুলো যখন ময়লায় ভরে যায়, সেই ময়লা পরিষ্কার করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার ড্রেনগুলো মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করা হলেও ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় নির্মিত গ্রামের ড্রেনগুলো পরিষ্কার করা হয় না। ড্রেনগুলো ময়লায় ভরা থাকে, যার ফলে সেখানে মশার উপদ্রব বেশি হয়।
পানি নিষ্কাশনের ড্রেনগুলো যেমন শহরভেদে গ্রামে চলে এসেছে, তেমনি মশার বিস্তার গ্রামেও বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুধু সভা-সেমিনার করে মানুষকে মশার হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না, এ কথা আমার মতো সবাই জানে। মশার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে হলে আগে মশার উৎপত্তি বন্ধ করতে হবে। এ জন্য দরকার পরিকল্পিত পদক্ষেপ ও বাস্তবায়ন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সভা-সেমিনারে ব্যস্ত রয়েছে, কিন্তু রাস্তার পাশে থাকা ড্রেনগুলো পরিষ্কার করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। সেখান থেকে প্রতিদিন মশার উৎপত্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মশার উৎপত্তি বন্ধ করতে হলে, আমাদের দেশের যত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের মতো সেগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে পানি নিষ্কাশনের ড্রেনগুলো পরিষ্কার করার এবং সেগুলো যথাযথভাবে পরিষ্কার করা হলো কি না, তা তদারকি করতে হবে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। আর নতুন করে যাতে বাড়ির আশপাশে ময়লার স্তূপ না জমে, সেজন্য জনগণকেও সচেতনা বৃদ্ধিসহ তাদেরও কাজে লাগাতে হবে। তাহলে মশার জন্ম বন্ধ হবে। মশার জন্ম বন্ধ হলে ডেঙ্গুর বিস্তার কমে যাবে। এছাড়া মশা মারার স্প্রে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। আমি এখানে একটি উদাহরণ উল্লেখ করতে চাই একসময় আমাদের মাঠগুলো বর্ষাকালে দেশি মাছে ভরপুর ছিল, কিন্তু এখন আর সেই মাছ চোখে পড়ে না। কৃষকেরা পোকার হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে গিয়ে প্রতিটি ফসলে এমনভাবে কীটনাশক (বিষ) প্রয়োগ করে যে, ওইসব কীটনাশকে ফসলের পোকার সঙ্গে দেশি প্রজাতির মাছও মরে শেষ হয়ে গেছে। ফসলের জন্য বাজারে কীটনাশকের আমদানি বেশ জাঁকজমকপূর্ণ হলেও মানুষ বাঁচানোর জন্য মশা মারার তেমন স্প্রে বাজারে নেই। আর মশা তাড়ানোর জন্য যে স্প্রে বাজারে পাওয়া যায়, সেগুলোকেও ভেদ করে মশা চলে আসে। এখন দরকার মানুষ বাঁচানোর জন্য মশানিধনকারী স্প্রে ব্যবহার করা, যাতে ফসলের পোকার মতো মশাও মরে যায়।
এ তো গেল সরকারের দায়িত্ব। নাগরিক হিসেবে আমাদেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে নিজেকে রক্ষা করার। দেশের প্রতিটি মানুষ যদি নিজেকে রক্ষার জন্য কাজ করে, সেই কাজটি জাতির ও দেশের হয়ে যায়।
আমরা যদি আমাদের বাড়ির আশপাশের ঝাড়-জঙ্গল ও ডোবানালা নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করি এবং পরিষ্কার রাখি নিজের পরিবেশ, তাতে আমরা নিজেরা যেমন সুরক্ষিত থাকব, তেমনি আমাদের প্রতিবেশীরাও রক্ষা পাবে। এভাবে নিজ দায়িত্ব পালন করে আমরা গোটা জাতি সুরক্ষিত হতে পারব। আসুন আর দেরি নয়, আজ থেকে শুরু করি আমাদের চারপাশ পরিষ্কার করা। নিজে বাঁচি ও অন্যকেও বাঁচাই।

রজব আলী
গণমাধ্যমকর্মী
ফুলবাড়ী, দিনাজপুর

সর্বশেষ..