এসএমই

রাস পদ্ধতিতে পুকুর ছাড়াই মাছ চাষ

রিসারকুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম। সংক্ষেপে ‘রাস’ নামে পরিচিত। আধুনিক এ পদ্ধতিতে মূলত মাছ চাষ করা হয়। পুকুরের পরিবর্তে ইট-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি ট্যাংকে মাছ চাষ করার পদ্ধতিটিই রাস।

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার এক পল্লিতে শুরু হয়েছে রাস পদ্ধতিতে মাছ চাষ। অল্প জায়গা এমনকি বাড়ির ছাদেও এ পদ্ধতিতে মাছের চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব। উপজেলার বাঙালীপুর ইউনিয়নের মছে হাজীপাড়া গ্রামের এক বাড়ির উঠানে প্রকল্পটি চালু করা হয়েছে। আমাদের দেশে সম্পূর্ণ নতুন এ প্রকল্পটি গড়ে তুলেছেন মো. কামরুজ্জামান কনক। এরই মধ্যে নানা প্রজাতির মাছ চাষ করে সফলতার মুখ দেখতে শুরু করেছেন তিনি।

বাড়ির উঠানে চারটি ট্যাংকে মাছ চাষ করছেন কনক। প্রতিটি ট্যাংকে ১০ হাজার লিটার পানি ধারণক্ষমতা রয়েছে। তবে তিনি আট হাজার লিটার পানি ভর্তি করে ট্যাংকে ৮০০ কেজি মাছের পোনা ছেড়েছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তেলাপিয়া, শিং ও পাবদাসহ নানা প্রজাতির মাছ ছেড়েছেন এসব ট্যাংকে। এ পদ্ধতিটিতে বছরে তিনবার মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা।

কনক বলেন, রাস পদ্ধতির উদ্ভাবন হয়েছে চীনে। পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি ছড়িয়ে পড়ে। প্রকল্পটি লাভজনক হওয়ায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে। কয়েকজন উদ্যোক্তা এ পদ্বতিতে মাছ চাষে সাফল্য পেয়েছেন। তবে সৈয়দপুর তথা নীলফামারীতে আমিই প্রথম এমন উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি আরও জানান, রাস পদ্ধতি বেশ ব্যয়বহুল।

রাস পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, অল্প ঘনত্বে অধিক পরিমাণে মাছ উৎপাদন করা। এ পদ্ধতিতে একই পানি পুনরায় নানা যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে পরিশোধন করা হয়। মাছের ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয় এ পানি। ফলে পানি অপচয়ের সুযোগ নেই বললে চলে। এছাড়া মাছের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হয়। এজন্য প্রয়োজন সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। ফলে খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। তবে সৌরবিদ্যুৎ চালু করে কমিয়ে আনা সম্ভব বিদ্যুৎ খরচ। নিবিড় পরিচর্যার মধ্যে থাকায় অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা কোনো রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। এ পদ্ধতিতে অরগানিক খাবার খাওয়ানো হয়। ফলে পুকুরে চাষ করা মাছের তুলনায় এখানকার মাছ অপেক্ষাকৃত বেশি সুস্বাদু হয় বলে জানিয়েছে উদ্যোক্তা কনক। তাছাড়া পুকুরে মাছের জন্য দেওয়া খাবার বেশি অপচয় হয়। এখানে খাবার অপচয়ের সুযোগ নেই।

কনক বলেন, কাজটি শুরুর আগে পদ্ধতিটি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন।

হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নেওয়া জরুরি। পুকুরে যারা মাছ চাষ করেন, তারা এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাস পদ্ধতিটি সদ্ব্যবহার করতে পারেন। এ পদ্ধতিতে ছোট পোনা ছাড়া উচিত নয়। একটু বড় অর্থাৎ চাপের পোনা ছাড়লে কম সময়ে উৎপাদন বেশি হয়। ওই বড় পোনায় বছরে চারবার হারভেস্টিং করা সম্ভব। এতে প্রতি কেজি মাছের উৎপাদন খরচ পড়ে ২০০ টাকা। পাবদা, দেশি শিং ও মাগুর, গুলশা এবং টেংরা জাতের মাছ চাষ করলে লাভের পরিমাণ বেশি থাকে।

মছে হাজিপাড়ার মো. খালেকুজ্জামানের বড় ছেলে মো. কামরুজ্জামান কনক। তিনি পেশায় প্রকৌশলী। ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন। পরে চাকরি নিয়েছিলেন স্কয়ার ফার্মাসিটিউক্যাল লিমিটেডে, কিন্তু তার মন টেকেনি সেখানে। গ্রামে ফিরে রাস পদ্ধতিতে মাছ উৎপাদনের কাজে লেগে পড়েন। গড়ে তোলেন জামান অ্যাকুয়া ফিস ফার্ম।

তার মতে, বর্তমানে দেশে আবাদি জমির পরিমাণ কমে আসছে। মাছ চাষের জন্য অধিক হারে পুকুর খনন করা হলে আমাদের ফসলি জমি কমে যাবে। পুকুর না কেটে অল্প জমিতে এ পদ্ধতিতে পুকুরের চেয়ে ৩০ গুণ বেশি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব।

পুকুরে দুই কেজি খাবার দিয়ে মাত্র এক কেজি মাছ উৎপাদন করা যায়। রাস পদ্ধতিতে এক কেজি খাবার দিয়ে দেড় কেজি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দেশি শিং, দেশি-বিদেশি মাগুর, পাবদা, টেংরা, তেলাপিয়া, চিংড়িসহ নানা প্রজাতির মাছ চাষ করা যায়। তবে এ পদ্ধতিতে প্রাথমিক বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশসাশ্রয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী। সুদূরপ্রসারী চিন্তা করলে প্রচলিত অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় এটি বেশি লাভজনক।

চাকরি ছেড়ে এ কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু করে নিজের আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি প্রযুক্তিটি এলাকায় ছড়িয়ে দিতে চাই। আমি চাই, বেকার যুবকরা চাকরির পেছনে না ঘুরে এ কাজে মনোনিবেশ করে যেন আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে পারেন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, পদ্ধতিটি একেবারে নতুন হওয়ায় আমরা ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছি। প্রকল্প চালু করতে খরচ বেশি। তবে সফল হলে এ পদ্ধতিতে মাছ চাষে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

মিজানুর রহমান মিলন, সৈয়দপুর (নীলফামারী)

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..